ফিনল্যান্ডের বন্ধ সীমান্তে রাশিয়া নয়, অর্থনীতিই বড় উদ্বেগ
রাশিয়ার নিয়িরালা সীমান্ত চৌকির কাছে একটি পরিত্যক্ত ক্যাফে ও পেট্রল স্টেশনটি যেন সময় থমকে থাকারই প্রতিচ্ছবি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার পর থেকেই এমন অবস্থা।
হেলসিঙ্কির অভিযোগ, প্রায় ১ হাজার ৩০০ অভিবাসীকে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকতে উসকানি দিয়ে মস্কো ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ চালিয়েছে। তবে ক্রেমলিন সে অভিযোগ অস্বীকার করে।
সীমান্তবর্তী নর্থ কারেলিয়া অঞ্চলে এএফপির সঙ্গে কথা বলা স্থানীয়দের কাছে সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রভাবই বড় উদ্বেগ। ফিনল্যান্ডের তোহমায়ারভি থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
এখান থেকে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জন্মশহর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে গাড়িতে যেতে সময় লাগত চার ঘণ্টা।
স্থানীয় প্রশাসন প্রধান মিক্কো লোপোনেন জানান, তোহমায়ারভি পৌরসভার অংশ নিয়িরালা সীমান্ত দিয়ে একসময় বছরে অন্তত ২০ লাখ মানুষ যাতায়াত করত।
তবে তিনি বলেন, যাতায়াত এখন শূন্য। যার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়। প্রতিষ্ঠানগুলো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।
৪২ বছর বয়সী লোপোনেন বলেন, তোহমায়ারভি অনেক বদলে গেছে। জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায়, যে সড়ক একসময় পর্যটক ও যাত্রীতে মুখর ছিল, এখন নীরব।
তিনি জানান, রাডার ও সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করায় বায়ু বিদ্যুৎ টারবাইন বসানোর পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে।
সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ করলেও ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণ স্থানীয়রা বোঝেন, বলেন তিনি।
১৯৪০ সালে রক্তক্ষয়ী শীতকালীন যুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্ট্যালিনের বাহিনী ফিনিশ কারেলিয়ার বড় অংশ দখল করে নেয়।
লোপোনেন বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে রাশিয়াকে আমরা সবসময় দেখেই এসেছি।’ প্রায় সব পুরুষ ও কিছু নারী ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত সামরিক রিজার্ভ সদস্য থাকেন।
নতুন সীমান্ত বেড়া টহলে দুই ফিনিশ রক্ষীর বরফে হাঁটার শব্দই শুধু নীরবতা ভাঙে।
জ্যেষ্ঠ সীমান্তরক্ষী ভিলে কুসেলা বলেন, ‘এ মুহূর্তে সীমান্ত খুব শান্ত। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি যে উত্তেজনাপূর্ণ, তা আমরা জানি।’
অস্ত্রায়িত অভিবাসন ঠেকাতে ফিনল্যান্ড কৌশলগত এলাকায় ৩৬২ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে ক্যামেরা ও সেন্সরসহ ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, একটি বেড়া নির্মাণ করছে।
এখন রক্ষীদের বেশি দেখা মেলে হরিণ, ভালুক কিংবা কৌতূহলী দর্শনার্থীর সঙ্গে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে, রাশিয়ার ইউক্রেন হামলার এক বছর পর, ফিনল্যান্ড দীর্ঘদিনের সামরিক নিরপেক্ষতা ত্যাগ করে ন্যাটোতে যোগ দেয়।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্টি এডভার্ড হাক্কানেন এএফপিকে বলেন, ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশ আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় সামরিক বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি বাড়ানো হয়েছে।
বাল্টিক সাগরে পানির নিচের তার নাশকতায় মস্কোর সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের পূর্ব সীমান্তের কাছে সামরিক ঘাঁটিও সম্প্রসারণ করেছে রাশিয়া।
হাক্কানেন বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা জোরদারে দ্রুত এগোতে হবে।’
তোহমায়ারভির শান্ত রাস্তায় কয়েকজন বয়স্ক নারী কিকস্লেডে করে স্থানীয় বাজারে আসেন।
কে মার্কেটের মালিক পিলভি পাসকিনেন বলেন, একসময় রুশ ক্রেতারা কফি, চা ও পনির কিনতে ভিড় করতেন। আর ফিনিশরা রাশিয়ায় যেতেন সস্তা পেট্রল, সিগারেট ও মদ কিনতে।
ফিনল্যান্ডে রাশিয়ান সীমান্তের কাছে খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টাভারাতোরি স্টোর, যেখানে ফিনিশ ও রুশ ভাষায় সাইনবোর্ড রয়েছে দোকানটি স্থানীয় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সেখানকার একজন কর্মী জানান, বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ফিনল্যান্ডের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্ব ছিল ফিনল্যান্ডে—১০ দশমিক ২ শতাংশ। তোহমায়ারভিতে এ হার ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।
তবে ফিনিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অর্থনীতিবিদ তোমি ক্রিস্টেরি বলেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সীমান্ত বন্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব আশঙ্কার তুলনায় কম।
তিনি বলেন, পর্যটন ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনের মতো কিছু খাত ও নির্দিষ্ট অঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উচ্চ বেকারত্বের মধ্যেও নির্মাণ, খাবার সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবায় শ্রমিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব খাতে বহু রুশ নাগরিক কাজ করতেন।
আঞ্চলিক রাজধানী জোয়েনসুর একটি কারিগরি বিদ্যালয়ের প্রধান এসা কারভিনেন জানান, ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে দুই সহস্রাদিক আবেদন এসেছিল। সেখানে ‘গত বছর ছিল দুই শতাধিকের কম।’
৪১ বছর বয়সী মোটেল মালিক আলেক্সান্ডার কুজনেতসভ বলেন, ‘তোহমায়ারভিতে কেউ থাকতে চায় না।
কাজ নেই।’ সীমান্ত বন্ধের পর স্থানীয় রুশ সম্প্রদায় আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘সীমান্ত বন্ধের আগে তার ১৪ কক্ষের মোটেল সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন পুরো বুকিং থাকত। সেখানে, এ মাসে মাত্র আটজন অতিথি পেয়েছি।’
৫১ বছর বয়সী রুশ বংশোদ্ভূত নার্স আঞ্জেলিকা হোভি, যিনি এক ফিনিশ নাগরিককে বিয়ে করেছেন। তিনি জানান তার বড় ছেলে কাজের খোঁজে চলে গেছে। কিছুদিন সীমান্ত বেড়া নির্মাণেও কাজ করেছে।
কুজনেতসভ বলেন, সীমান্তের ওপারে সোর্তাভালায় এক ঘণ্টার পথ দূরে স্ত্রী ও পরিবারের কাছে তিনি সপ্তাহে একবার যেতেন।
কিন্তু ১৫ মাস ধরে তাদের দেখা হয়নি। শেষবার এস্তোনিয়ার নারভা হয়ে যেতে ২৭ ঘণ্টা লেগেছিল। খরচ হয়েছে কয়েকশ ইউরো।
তিনি বলেন, ‘মানুষ যুদ্ধ চায় না। মানুষ ভালো, স্বাভাবিক জীবন চায়।’
তিনি বলেন, ‘টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে। হয়তো ছয় মাস, বা এক বছর টিকে থাকতে পারব।’