আমরা মুক্ত!’: নতুন ভোরের ইঙ্গিত দেখছে ভেনেজুয়েলাবাসী
রাজনৈতিক বন্দিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং কুখ্যাত একটি আটক কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তে ভেনেজুয়েলায় প্রায় এক চতুর্থাংশ শতাব্দীর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অবসান ঘটতে পারে এমন আশা জোরদার হয়েছে।
কারাকাস থেকে এএফপি জানায়, ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তার সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে সমালোচকদের ধারণার চেয়েও এক ধাপ এগিয়েছেন।
১৯৯৯ সালে মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক পথপ্রদর্শক হুগো শাভেজ ক্ষমতায় অসার পর থেকে আটক সব রাজনৈতিক বন্দির জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর কারাকাসের কাছে রোদেও-১ কারাগারের বাইরে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক বন্দিদের স্বজনরা শুক্রবার ‘আমরা মুক্ত!’ বলে স্লোগান দেন।
উল্লসিতদের মধ্যে ছিলেন ৬৪ বছর বয়সী জোরাইদা গনসালেস।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি অনুভব করেছি আমি মুক্ত, আর পুরো দেশটাই মুক্ত।’
গত কয়েক দিনে এমন সব লক্ষণ দেখা গেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, গত দুই দশক ধরে ভেনেজুয়েলার সমাজে যে ভয় ছড়িয়ে ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে।
বিরোধী কর্মী ডেলসা সোলোরসানো মঙ্গলবার ১৭ মাস আত্মগোপনে থাকার পর আবার প্রকাশ্যে আসেন।
৫৪ বছর বয়সী সাবেক এই আইনপ্রণেতা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ভেনেজুয়েলা এখন এক নতুন পর্যায়ে আছে, আর আমার মনে হয় পুরো দেশই সেটা অনুভব করছে।’
এক মাস আগেও যা কল্পনাতীত ছিল, এমন দৃশ্যও দেখা গেছে, একজন ছাত্র রাস্তায় বন্দিমুক্তির ধীরগতির বিষয়ে রদ্রিগেজের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
ছাত্রনেতা মিগুয়েলআঞ্জেল সুয়ারেজ ৮ জানুয়ারি সরকার বড় পরিসরে বন্দিমুক্তির পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও খুব অল্পসংখ্যক বন্দি ছাড়া পাওয়ায় ‘কারাগারের বাইরে পরিবারগুলোর যে দুর্ভোগ’ তা নিয়ে রদ্রিগেজকে ভর্ৎসনা করেন।
এদিকে বুধবার সরকারি সমর্থিত টেলিভিশনে সরাসরি বিরল এক দৃশ্যে বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ওয়াশিংটনে বৈঠকের পর রদ্রিগেজের সমালোচনা করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক মারিয়া ইসাবেল সেন্টেনো বলেন, ‘ভয় পরাজিত হয়েছে।’ তিনি ৩ জানুয়ারির আগে ও পরে এই ‘পরিবর্তনরেখা’র কথা উল্লেখ করেন।
সেন্টেনোর মতে, শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারগুলোই ‘এই ফাঁকটি তৈরি করেছেৃ যার ফলে আমরা কম ভীত হতে পেরেছি।’
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য টমাস গুয়ানিপা, যার এক ভাই কারাগারে এবং আরেক ভাই গৃহবন্দী, মাদুরোকে কারাকাসের একটি কম্পাউন্ড থেকে ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করার পর গত কয়েক সপ্তাহে যে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে, তা মেনে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে এএফপিকে বলেন, ‘এক মাস আগে কে ভেবেছিল আজ আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা দেখব?’
তিনি বলেন, ‘এটা যেন এমন এক প্রক্রিয়া হয়, যা আমাদের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাবে।’
রদ্রিগেজ মাদুরোঘনিষ্ঠদের বিরূপ না করে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পূরণের চেষ্টার কূটনৈতিক দড়ির ওপর হাঁটছেন।
এ পর্যন্ত নতুন নির্বাচনের পথে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাবলো কুইন্তেরোর মতে, সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ফলে রদ্রিগেজ প্রশাসনের জন্য ‘নির্যাতন ও কারাবাসের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করার মূল্য খুবই চড়া’, বলেছেন তিনি।
সাবেক বাসচালক মাদুরোর শাসনের শেষ বছরগুলো ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়ন ও সন্দেহপ্রবণতায় চিহ্নিত ছিল; ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচন, যা তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে জিতেছেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। এর পর দমন অভিযান চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।
গনসালেসের ছেলে ২০১৯ সালে মাদুরোর ওপর ড্রোন হামলার চেষ্টার অভিযোগে প্রেমিকার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন, তখন তার বয়স ছিল ২৩।
তিনি বলেন, ‘আমরা ২৫ বছর ধরে দমন-পীড়নের মধ্যে বেঁচে আছি। আমাদের নির্যাতন ও ভীত করা হয়েছেৃ আমার ছেলে নির্দোষ।’
কারাকাসের আরেক কারাগার জোনা-৭-এর বাইরে ৬৫ বছর বয়সী আলিসিয়া রোখাস, যার স্বামীকে নভেম্বর মাসে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আটক করা হয়, সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় আশাবাদী হন।
তবে তিনি বলেন, তার ভয় এখনো কাটেনি, কারণ ‘কখন যে প্রতিবেশী আপনাকে কর্তৃপক্ষের কাছে ধরিয়ে দেবে, বলা যায় না।’
তার পেছনে কারাগারের দেয়ালে আঁকা শাভেজের হুড পরা চোখের একটি দেয়ালচিত্র রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী ক্ষমতার স্মারক হয়ে ছিল।
দেয়ালচিত্রে লেখা ছিল, ‘অলিগার্করা কাঁপো! স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক।’