২৭তম রাত লাইলাতুল কদর বিষয়ে কিছু সূক্ষ্ম ইশারা
কিছু আলেম কুরআনের সূরা কদরের ভেতর থেকেও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত খুঁজে বের করেছেন। সূরা কদরে আল্লাহ তাআলা বলেন-
سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ
‘এটি শান্তিময়—ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।’
এখানে هِيَ শব্দটি সূরার গণনায় ২৭তম শব্দ হিসেবে আসে। এ থেকে কেউ কেউ ইঙ্গিত নিয়েছেন যে, শবে কদর ২৭ রমজান হতে পারে।
আরেকটি সুন্দর সূক্ষ্ম ইঙ্গিত কিছু আলেম উল্লেখ করেছেন—সূরা কদরে لَيْلَةُ الْقَدْرِ বাক্যটি তিনবার এসেছে। لَيْلَةُ الْقَدْرِ এই শব্দগুচ্ছে ৯টি অক্ষর। ৯*৩ = ২৭। এ হিসাব থেকেও কেউ কেউ ২৭ তারিখের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
তাফসিরে কুরতুবিতেও একটি সুন্দর ঘটনা আছে।
একদিন হযরত উমর রাযি. সাহাবাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘লাইলাতুল কদর কোন রাত?’
সবাই বললেন, والله أعلم ‘আল্লাহই ভালো জানেন।’
সেখানে তরুণ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি ‘সাত’ সংখ্যার মধ্যে একটি বিশেষ মিল দেখেছি। আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন—
— সাত আসমান
— সাত জমিন
— তাওয়াফ সাত চক্কর
— সাফা-মারওয়ার সাঈ সাত চক্কর
— রমিতে সাত কংকর
— সিজদার অঙ্গ সাতটি।
অনুরূপভাবে মানুষের সৃষ্টির ধাপগুলোও কুরআনে সাতভাবে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ
আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।
ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি।
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করেছি জমাট বাঁধা রক্তে।
فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً
অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করেছি মাংসপিন্ডে।
فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا
অতঃপর মাংসপিণ্ডকে পরিণত করেছি হাড্ডিতে।
فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا
অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করেছি মাংস দিয়ে।
ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ ۚ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
অবশেষে ওকে গড়ে তুলেছি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান। [সূরা মুমিনূন : ১২-১৪]
আলোচ্য আয়াতসমূহে মানব সৃষ্টির সাতটি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে।
— সর্বপ্রথম স্তর سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ মাটির সারাংশ।
— দ্বিতীয় نُطْفَةً বীর্য।
— তৃতীয় عَلَقَةً জমাট রক্ত,
— চতুর্থ مُضْغَةً মাংসপিণ্ড।
— পঞ্চম عِظَامًا হাড্ডি।
— ষষ্ঠ لَحْمًا অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণ।
— সপ্তম خَلْقًا آخَرَ সৃষ্টিটির পূর্ণত্ব অর্থাৎ রূহ সঞ্চারকরণ।
সূরা ‘আবাসা’-তেও খাদ্যের প্রসঙ্গে এসেছে
فَلْيَنْظُرِ الإِنْسَانُ إِلَى طَعَامِهِ. فَأَنبَتْنَا فِيهَا حَبًّا. وَعِنَبًا وَقَضْبًا. وَزَيْتُونًا وَنَخْلًا. وَحَدَائِقَ غُلْبًا. وَفَاكِهَةً وَأَبًّا
মানুষ তার খাদ্যের ব্যপারটাই ভেবে দেখুক না কেন। আমি প্রচুর পরিমাণে পানি বর্ষণ করি। তারপর যমীনকে বিদীর্ণ করে দেই। অতঃপর তাতে আমি উৎপন্ন করি-শস্য, আঙ্গুর ও শাক-সবজি, যায়তূন ও খেজুর, আর ঘন বৃক্ষ পরিপূর্ণ বাগবাগিচা, আর নানান জাতের ফল আর ঘাস-লতাপাতা। [সূরা ‘আবাসা : ২৪-৩০]
আলোচ্য আয়াতসমূহে খাদ্যের ব্যপারটা সাতটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে
১. حَبًّا শস্য,
২. عِنَبًا আঙ্গুর,
৩. قَضْبًا শাক-সবজি,
৪. زَيْتُونًا যায়তূন,
৫. نَخْلًا খেজুর,
৬. حَدَائِقَ غُلْبًا ঘন বৃক্ষ পরিপূর্ণ বাগবাগিচা,
৭. وَفَاكِهَةً وَأَبًّا নানান জাতের ফল ও ঘাস-লতাপাতা।
এই সব মিল দেখে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. বললেন, যেহেতু লাইলাতুল কদর শেষ দশকে, তাই সাতের হিসাবে ২৭তম রাত বেশি উপযুক্ত মনে হয়।
এ কথা শুনে হযরত উমর রাযি. প্রশংসা করে বললেন, তোমরা এই তরুণের মতো বিশ্লেষণও করতে পারলে না! [তাফসির কুরতুবী, সূরা মুমিনূন]
তবে মনে রাখতে হবে—এগুলো নিশ্চিত দলিল নয়; বরং ইশারা মাত্র। কুরআন বা সহীহ হাদিসে স্পষ্টভাবে ২৭ তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
লানা আশরাফ আলী থানভী রহ. একটি অত্যন্ত কার্যকর কথা বলেছেন—যে ব্যক্তি শবে কদরের নিয়তে রাত জেগে ইবাদত করবে, তার নিয়তের কারণে ইনশাআল্লাহ সে শবে কদরের সওয়াব পাবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। [সহীহ বুখারী : ১]
অর্থাৎ, যদি বান্দা আন্তরিকভাবে ধারণা করে—আজ হয়তো লাইলাতুল কদর। তারপর এ নিয়তে ইবাদত করে, তাহলে আল্লাহ তাঁর নিয়তের মর্যাদা দেবেন। একজন ফারসি কবি খুব সুন্দরভাবে বলেছেন
اے خواجہ! جوئی ز شب قدر نشانی
هر شب، شب قدر است اگر قدر بدانی
হে বন্ধু! তুমি কেন শবে কদরের আলামত খুঁজে বেড়াও?
তুমি যদি কদর করতে জানো—তবে প্রতিটি রাতই তোমার জন্য শবে কদর।