পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরে ২৫ ভবন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইল
অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের নূর শামস শরণার্থী শিবিরে বুধবার ফিলিস্তিনিদের বসবাসরত অন্তত ২৫টি ভবন ভাঙা শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি, সশস্ত্র গোষ্ঠী নির্মূলের অংশ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ধ্বংস করা ভবনগুলোতে প্রায় ১০০টি পরিবার বসবাস করত।
নূর শামস শিবিরটি দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ও ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘর্ষের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এএফপি’র এক সাংবাদিক জানান, বুধবার ভোরে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বুলডোজার ও ক্রেন দিয়ে ভবনগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়। এতে আকাশে ঘন ধুলোর কুণ্ডলি ছড়িয়ে পড়ে। বহু বাসিন্দা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেন।
নিজের ভবন ভাঙার সময় অনুভূতির কথা জানিয়ে মুতাজ মাহর বলেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি, পাড়া-প্রতিবেশী আর স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
তিনি আরও বলেন, ‘দখলদার বাহিনী সব উপায়ে আমাদের ক্লান্ত ও চাপে ফেলতে চাইছে।’
নূর শামস শিবিরের জনপ্রিয় কমিটির সদস্য নিহায়া আল-জেন্দি জানান, চলতি বছরের শুরুতেই সামরিক অভিযান শুরুর আগেই শত শত পরিবার তাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আজও শিবিরের দেড় হাজারের বেশি পরিবার নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেনি। এটি একটি বড় বিপর্যয়।’
নিহায়া আল-জেন্দি বলেন, বিশ্বের চোখের সামনে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য এটি এক ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ।
এদিকে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, নূর শামস এলাকায় চলমান ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানের অংশ হিসেবেই ভবনগুলো ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘উত্তর সামারিয়া অঞ্চলে ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকার ভেতর থেকেই সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
চলতি বছরের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনী পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের নূর শামস, তুলকারেম ও জেনিন শরণার্থী শিবিরে অভিযান শুরু করে।
ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দেওয়াই ছিল এই অভিযানগুলোর উদ্দেশ্য।
তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি করেছে যে অভিযানের এক বছর পরও এ সব এলাকা থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেন, নূর শামস, তুলকারেম ও জেনিনে পরিচালিত অভিযান ‘কার্যকর’ হয়েছে।
আর এই অভিযানে তিনি যাকে ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ বলেছেন, তা ৮০ শতাংশ কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইসরায়েল কাৎজ আরও বলেন, ইসরায়েলি সেনারা সেখানে অবস্থান করবে এবং ইসরাইলি জনগণ ও ‘সন্ত্রাসী উপাদান’-এর মধ্যে একটি ‘স্পষ্ট বাফার’ হিসেবে কাজ করবে, যাতে তাদের পুনর্গঠন ঠেকানো যায় ও হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
গত ডিসেম্বরে এএফপি জানায়, যে ভবনগুলোকে ইসরাইল গুড়িয়ে দিতে যাচ্ছে, সেখানকার বাসিন্দারা তাদের জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হন এবং অনেকেই জানান যে এই অবস্থায় আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা তাদের নেই।
এই ধ্বংসযজ্ঞ পশ্চিম তীরের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোর ভেতরে সামরিক যান চলাচল সহজ করতে ইসরাইলের বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরাইল ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর দখল করে রেখেছে।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় বাস্তুচ্যুত হওয়া লক্ষাধিক ফিলিস্তিনির জন্য নূর শামসসহ পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন এই সব শিবির ঘনবসতিপূর্ণ পাড়ায় পরিণত হয়েছে। এই শিবিরগুলোর বাসিন্দারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শরণার্থীর পরিচয় বহন করে চলেছেন।
অনেক বাসিন্দার বিশ্বাস, ইসরাইল শরণার্থী শিবিরগুলোর অস্তিত্বই মুছে ফেলতে চাইছে।