মসজিদে নববী জিয়ারতের ফজিলত
মসজিদে নববীর সঙ্গে মুসলমানের সম্পর্ক আবেগ ও ভালোবাসার। কেননা এই মসজিদ থেকেই মুসলিম জাতির উত্থান হয় এবং এখানেই শুয়ে আছেন মহানবী (সা.)। আবেগ ও ভালোবাসার বাইরেও এই মসজিদের আছে অনন্য মর্যাদা, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাত্পর্য।
কোরআনে মসজিদে নববী
কোরআন গবেষকরা বলেন, পবিত্র কোরআনে পরোক্ষভাবে মসজিদে নববীর বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)
তাফসিরবিদরা বলেন, বায়তুল মুকাদ্দাসকে এই আয়াতে আকসা শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। যার অর্থ অধিক দূরবর্তী, যা কম দূরত্বের কোনো মসজিদের দিকে ইঙ্গিত করে। আর সেটাই মসজিদে নববী। সহিহ ইবনে হিব্বান ও মুসনাদে আহমদের বর্ণনা অনুসারে নিম্নোক্ত আয়াতটি মসজিদে নববীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই স্থাপিত হয়েছে তাকওয়ার ওপর, এটাই তোমার নামাজের জন্য অধিক যোগ্য।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১০৮)
তবে বেশির আলেমের মতে, উল্লিখিত আয়াতটি মসজিদে কোবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
মসজিদে নববী জিয়ারতের ফজিলত
একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা মসজিদে নববীর জিয়ারতের মর্যাদা ও পুরস্কার প্রমাণিত। যার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
১. ইবাদতের প্রতিদান বৃদ্ধি : মসজিদে নববীতে ইবাদত করলে আল্লাহ ইবাদতের প্রতিদান বৃদ্ধি করেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার এই মাসজিদে এক রাকাত নামাজ মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য কোনো মসজিদে এক হাজার রাকাত নামাজের চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩২৬৫)
২. জিয়ারতের মেলে সওয়াব : হাদিসে সওয়াবের নিয়তে তিনটি মসজিদ সফর বা জিয়ারত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তার একটি মসজিদে নববী। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের দিকে ভ্রমণ করা যাবে না। মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মসজিদে আকসা।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৭০০)
৩. রিয়াজুল জান্নাহ : আল্লাহ তাআলা মসজিদে নববীকে এমন এক অনন্য মর্যাদা দান করেছেন যা পৃথিবীর অন্য কোনো মসজিদকে দান করা হয়নি। তা হলো ‘রিয়াজুল জান্নাহ’-এর গৌরব। মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝের জায়গা জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান। আর আমার মিম্বর আমার হাওজের ওপর অবস্থিত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩৩৫)
৪. নিফাক থেকে মুক্তির উপায় : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদে নামাজ আদায় নিফাক বা কপটতা থেকে মুক্তির মাধ্যম। নবীজি (সা.) থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি আমার এই মসজিদে ৪০ রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং (মাঝে) কোনো ফরজ নামাজ ছুটবে না, তার জন্য লেখা হয় জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি, শাস্তি থেকে মুক্তি ও নিফাকি থেকে মুক্তি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১)
মসজিদে নববী জিয়ারতের আদব
আলেমরা মসজিদে নববী জিয়ারতের সময় নিম্নোক্ত আদবগুলো রক্ষার নির্দেশ দেন। তা হলো—
১. প্রথমে নিয়ত বিশুদ্ধ করে নেওয়া। মসজিদে নববী জিয়ারতের সময় আল্লাহর রহমত, নৈকট্য এবং নবীজি (সা.)-এর স্মৃতি ও সান্নিধ্যের বরকত লাভের নিয়ত করবে।
২. পবিত্র দেহ ও পোশাক পরিধান করে প্রবেশ করবে।
৩. অন্তরে নবীজি (সা.)-এর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা ও ভক্তি লালন করবে। নবী কারিম (সা.)-এর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করবে।
৪. মসজিদে প্রবেশের সুন্নতগুলো পালন করা। আর তা হলো, ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা, বিসমিল্লাহ পাঠ করা, মসজিদে প্রবেশের মাসনুন দোয়া পড়া এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা।
৫. মসজিদে প্রবেশের পর মাকরুহ বা নিষিদ্ধ সময় না হলে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করা।
৬. অতঃপর পূর্ণ আদব ও শিষ্টাচারের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করা।
৭. নামাজ ও জিয়ারত শেষে সুন্নত অনুসারে মসজিদ থেকে বের হওয়া। তা হলো, বাম দিয়ে বের হওয়া, নবীজি (সা.)-এর দরুদ পাঠ করা ও মাসনুন দোয়া পড়া।
৮. সবচেয়ে ব্যথিত ও ভগ্ন হূদয় নিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণ ত্যাগ করা। (আদাবুল মাসাজিদ, পৃষ্ঠা ৬৮)