রমজানে শয়তান বন্দী থাকার প্রভাব
শয়তান দুই ধরনের—জিন শয়তান ও মানব শয়তান। রমজানে জিন শয়তান বন্দী হয়, ফলে মানুষের মধ্যকার শয়তানিও অবদমিত হয়। কয়েকটি দিক পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়, রমজানে শয়তান বন্দী থাকে। অর্থাত্ শয়তান রমজান মাসে বন্দী থাকার প্রভাব সমাজে দেখা যায়। যেমন—
ভোররাতে ঘুম থেকে ওঠা
সাহরি খাওয়ার জন্য ওঠার মধ্যে যেমন ঈমানি শক্তির প্রকাশ লক্ষণীয়, তেমনই শয়তান বন্দী ও অবদমিত হবার দিকটি প্রমাণিত। মোবাইল ও মসজিদের মাইকে ডাকাডাকির কারণেই যে ভোররাতে জেগে ওঠা হচ্ছে ব্যাপরটা শুধুই এমন নয়। অন্য মাসে ভোররাতে ঘুম ভাঙলেও অনেকে মোচড়া মোচড়ি করে ঘুমিয়ে পড়েন, মোবাইলের এলার্মও কাজে আসে না। কেননা, ওই সময় বুখারি শরিফের ভাষায় ভোররাতে শয়তান মানুষের গা-ম্যাসেজ করে আর বলে ‘ঘুমাও রাত এখনো অনেক দীর্ঘ... ’ রমজানে এমন হয় না, বরং সাহরি খেয়ে সবাই ছুটেন মসজিদে—এক অসাধারণ সুধাময় সুর মূর্চ্ছনায় :
‘দূর আজানের মধুর ধ্বনি বাজে বাজে মসজিদেরই মিনারে।
এ কী খুশির অধীর তরঙ্গ উঠলো জেগে প্রাণের কিনারে।’
—কাজী নজরুল ইসলাম
মসজিদে মুসল্লি সমাগম
রমজানে মুসল্লিদের ভীড়েভরা মসজিদের বারান্দা ও ছাদ, আকুল-ব্যাকুল হয় মহান আল্লাহর তুষ্টির ব্যস্ততায়। বন্দী শয়তানের সাধ্য নেই মুসল্লি সমাগম ঠেকিয়ে দেওয়ার। কেননা, ঘোষিত হয়—‘হে ভালোর অন্বেষী অগ্রসর হও মন্দেও অন্বেষী থামো।’ (তিরমিজি) এখানেই আত্মার তাগিদ :
‘ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর
তখনো জাগিনি যখন জোহর
হেলায় ফেলায় কেটেছে আসর
মাগরেবের ওই শুনি আজান
নামাজে শামিল হওরে এশাতে
এশার জামাতে আছে স্থান।’
—কাজী নজরুল ইসলাম
কোরআন তিলাওয়াতের আগ্রহ
রমজানে কুরআন ‘খতমে’র আগ্রহ বাড়ে। অন্য সময়ে তিলাওয়াতে অলসতা আসে, ঘুম পায়। অথচ শয়তান বন্দীত্বে ঘটে ঈমানি যোগ্যতার প্রকাশ—‘মুমিন তো তারা, আল্লাহকে স্মরণ করার সময় যখন তাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াত পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে...।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ০২)
দানের আগ্রহ, জাকাত আদায়
হাদিসের ভাষায় রমজানে প্রিয় নবী (সা.) দানের ক্ষেত্রে ‘প্রবাহমান বায়ুর ন্যায় প্রবল হতেন’। রমজানে শয়তান বন্দীত্বে মানুষের আগ্রহ বাড়ে দানের, জাকাত আদায় করেন সবাই। কেননা, ‘যারা সোনা-রুপা সঞ্চয় করে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি...।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩৪, ৩৫)
ইফতার মহফিল, বিতরণ
রমজানে মানুষের মধ্যে সামাজিকতা বেড়ে যায়। সবই পরষ্পরকে ইফতার করাতে ব্যস্ত হয়। কারণ, শয়তান বন্দী।
রমজানে আত্মশুদ্ধি ও ধর্মভীরুতায় ‘সিফাতে রব্বানি’ বা আল্লাহর গুণে গুনান্বিত হয় মুমিনবান্দা, জেগে ওঠে আল্লাহর ভালবাসা। কিন্তু অভিশপ্ত শয়তান অন্যসময়ে পৃথিবীর আনচে-কানাচে ‘মানব-দানব’ দুই রূপেই থাকে সদাতত্পর। মহান আল্লাহর সতর্কবাণী—‘বলো, আমি আশ্রয় চাচ্ছি... আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ঠ থেকে, যে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়...।’ (সুরা নাস, আয়াত : ০১- ০৬)
‘শয়তান’ মানুষকে ধাপে ধাপে বিভ্রান্ত, পাপগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত করে জাহান্নামি বানায়। ইমাম ইবনু কাইয়্যুম জাওজিয়াহ (রহ.)-এর মতে শয়তানের অপকৌশল ছয়টি : (ক) মানুষকে শিরক ও কুফরে লিপ্ত করা (খ) বিদআতে (ধর্মীয় নতুনত্বে) জড়িয়ে দেওয়া (গ) কবিরা গুনাহে আকৃষ্ট করা (ঘ) নূনঃতম হলেও সগিরা গুনাহে উদ্বুদ্ধ করা (ঙ) ‘মুবাহ’ তথা করলে ছওয়াব নেই, না করলে গুনাহ নেই এমন কাজে ব্যস্ত রাখা এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ইবাদতকে গৌণভাবে দেখানো (চ) ফরজ ছেড়ে সুন্নাত নিয়ে ব্যস্ত রাখা এবং অধিক পূণ্যময় আমলের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ তত্পরতায় মানুষকে ক্লান্ত করা।
শয়তান থেকে বাঁচার উপায় : (ক) তিলাওয়াত, (খ) তাসবিহ-তাহলিল, (গ) নামাজের মধ্যে ওয়াসওয়াসা দানকারী ‘খিনজাব’ নামক শয়তান সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা, (ঘ) কারো প্রতি অস্ত্র দ্বারা ইশারা না করা (ঙ) দলগত-সুসংহত জীবনযাপন, (চ) শরিয়া ও সুন্নাহ মেনে চলা, (ছ) শয়তানপ্রতিরোধী দোয়া-কালাম পড়া।