ছোট্ট পুস্তিকাটি নিয়ে বড় মুগ্ধতা
ডেস্কে বসে কাজ করছি। পেটে ক্ষুধা। তবু খেতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বাইরে ভীষণ গরম। দুপুরের তপ্ত রোদে বাতাস যেন সিদ্ধ হয়ে আছে। উঁনুন ঘরের গরম হাওয়ার মতো। গায়ে লাগলেই কামড়ে ধরে। বাইরে বেরিয়ে ছিলাম ঘণ্টা-দুয়েক আগে। মনে হয়েছিল—মরুর দেশের লু-হাওয়া পথভুলে চলে এসেছে আমাদের দেশে। সেই গরম এখন দ্বিগুণ। ইট-পাথরের দালানে বসেও রোদের তাপদাহ বৃদ্ধি ভালোই টের পাচ্ছি। উপরে ঘুরছে তিন পাখার ফ্যান। স্বস্থির বদলে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে যেন ফ্যানটা।
সম্পাদক (আওয়ার ইসলাম) সাহেব অফিসে ঢুকলেন। হাতে একগাদা বই। প্রথম দেখায় মনে হলো—ম্যাগাজিন হবে হয়তো। সাইজটা মাসিক ম্যাগাজিনের মতোই। অনেকটা আমাদের পরিচিত নবধ্বনির সাইজ। খেয়াল করে বুঝলাম—ম্যগাজিন নয়; ছোট কলেবরের বই। বইয়ের ওপরে রক্তের ছবি। বড় আকারের একফোঁটা রক্ত। বইয়ের ঠিক মাঝখানে সাঁটানো ছবিটা। শুধু প্রচ্ছদ দেখে ডাক্তারি বই ভাবা—অসম্ভব নয়।
সম্পাদক সাহেব আমাকে তার রুমে ডাকলেন। কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন তখন। কথার ফাঁকেই একটা বই এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। চোখের ইশারায় বোঝালেন—এটা তোমার হাদিয়া। বাজারে নতুন এসেছে। পড়ে জানাও কেমন হলো। চক্ষুশরায় ভালোই পটু তিনি। এ-অভিজ্ঞতা নতুন নয়। প্রায় তিন মাসের। এই তিন মাসে চোখের ইশারায় কাজ পেয়েছি অনেকবার। তাই এখন আর বুঝতে অতটা অসুবিধা হয় না।
এবার আসি বই আলাপে—লেখক, আমাদের সেই পরিচিত মুখ, আওয়ার ইসলামের সম্পাদক, মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব। বইয়ের কলেবর ছোট। মাত্র ৪০ পৃষ্ঠা। মনোযোগ দিলে ২০-২৫ মিনিট যথেষ্ট—বইয়ের আদ্যোপান্ত পড়ার জন্য।
লেখক পুরো বইটা সাজিয়েছেন ১৭টি অধ্যায়ে। ২-৩ পৃষ্ঠার ছোট ছোট অধ্যায়। একেকটি অধ্যায়ে সুন্দর ও সহজভাবে তুলে ধরেছেন—রক্তদানের সঙ্গে ইসলাম ও মানবতার নানা দিক। শরিয়তের মাসয়ালা-মাসায়েল। না-জানা অনেক কথা। বইয়ের পরতে পরতে লেখকের পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট। তথ্যসূত্র দেখে বোঝা যায়—বইটা সাজাতে বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি।
লেখক রক্ত দেওয়া নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা ভাঙিছেন—শেষের কয়েকটি অধ্যায়ে। যা আমার মন কেড়েছে। রক্ত দেওয়া নিয়ে আমার কখনোই ভয়-ভীতি ছিল না। একাধিকবার দেওয়াও হয়েছে আমার। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবদের রক্ত দিতে উৎসাহিত করলে নানা প্রশ্ন করতো তারা। সেই প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর পেয়েছি শেষের অধ্যায়গুলোয়।
লেখকের গদ্যের মান নিয়ে যদি বলি—অসাধারণ। ঝরঝরে, মুচমুচে। তার লেখা আরেকটা বই পূর্বে পড়েছিলাম। ‘শায়খুল কুরআন আল্লামা কারী বেলায়েত হুসাইন রহ. জীবনকর্ম ও সাধনা।’ সে অনেক আগের কথা। শরহে বেকায়া বা জালালাইনের বছর। আজ থেকে প্রায় তিন-চার বছর আগে। তখন আমার লেখালেখির ভূমিষ্ঠকাল। বই পড়ার আগ্রহ ছিল; কিন্তু টানা পড়তে পারার অভ্যাস ছিল না। এক শুক্রবারের জুমার পর বইটা নিয়ে বিছানা পেতে বসেছি। ইচ্ছা—বসে বসে দুই পৃষ্ঠা পড়বো, শুয়ে এক পৃষ্ঠা। চোখে ঘুমপাখি উড়ে এসে জুড়ে বসবে। ঘুমিয়ে যাব।
পড়া শুরু করার পর তিন পৃষ্ঠাতে থামতে পারিনি। ১০৪ পৃষ্ঠার বই। শেষ করেছিলাম সে দিনই। লেখকের গদ্য আমায় টেনে নিয়ে ছিল বইয়ের শেষ অবধি। একবারও আটকাতে হয়নি। বইয়ের শব্দে-শব্দে কদম ফেলেছি কোনো জড়তা ছাড়াই।
এই বইটাও তেমন। ছোট ছোট বাক্য। সুন্দর, সাবলীল গদ্য। আকর্ষণীয় শব্দ চয়ন। পাঠক মাত্রই তার গদ্যে আকর্ষিত হবেন। মাঝেমধ্যেই মনে হবে—এই কথাটাও আলাদা আলাদা বাক্যে, এতো সুন্দর করে লেখা যায়! না পড়লে জানা হতো না! বইটা সবার পড়া উচিত। সংগ্রহে রাখা উচিত। রক্ত দিতে ভয় পায়—এমন বন্ধুদের পড়তে উৎসাহিত করা উচিত। প্রয়োজনে উপহার দেওয়া যেতে পারে।
আমার মনে হয় রক্তদান সম্পর্কিত আলেমদের লেখা এটাই প্রথম বই। ডাক্তারদের লেখা থাকতে পারে। সেটা তাদের পেশার সঙ্গে জড়িত। বলছি আলেম লেখকদের কথা। যারা পড়াশোনা করেছেন—মানবদেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ আদান-প্রদান বা বিক্রির জায়েজ না-জায়েজ নিয়ে। ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জেনেছেন—মানবজীবনের কঠিন ও জটিল অধ্যায়ে ইসলামের মতামত। নববী ও সাহাবা ওয়ালা আদর্শ। এই বিষয়ে তাদের লেখা বই খুব কম। একেবারে নেই বললেই চলে। আলেম লেখকদের মানবজীবনের প্রতিটি অধ্যায় নিয়ে লেখালেখি আরও বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি।
শেষ কথা—বইটা ভালো লেগেছে। উত্তম বদলা আল্লাহ দেবেন। লেখকের এই বইসহ ছোট-বড় সকল কাজ আল্লাহ কবুল করুন, এই কামনা।