রোজাদারদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা
মানুষের জীবনে কিছু ইবাদত আছে, যা শুধু দুনিয়ার জীবনে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয় না; বরং আখিরাতে এনে দেয় বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান। সিয়াম বা রোজা তেমনই এক অনন্য ইবাদত। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে এই নীরব সংগ্রাম আসলে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য এবং তাকওয়ার গভীর প্রকাশ। কোরআন ও হাদিসে রোজার যে মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে, তার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো, রোজাদারদের জন্য জান্নাতে নির্ধারিত বিশেষ দরজা ‘রাইয়্যান’।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে রোজার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, রোজার লক্ষ্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি অর্জন। আর এই তাকওয়াই আখিরাতে বিশেষ সম্মানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
রোজাদারদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজার কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। সাহল ইবন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে ‘রাইয়্যান’ নামক একটি দরজা আছে। কিয়ামতের দিন রোজাদাররা এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। বলা হবে, রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তারা প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৮৯৬)
‘রাইয়্যান’ শব্দের অর্থ তৃপ্ত বা পরিপূর্ণ সিক্ত। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এই নামকরণের মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যারা দুনিয়ায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তৃষ্ণা সহ্য করেছে, আল্লাহ তাদের জন্য আখিরাতে তৃপ্তি ও প্রশান্তির বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছেন। (শরহু সহিহ মুসলিম, নববী)
ইবন হাজর আল-আসকালানী (রহ.) লিখেছেন, জান্নাতের প্রতিটি দরজা একটি বিশেষ আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘রাইয়্যান’ দরজা রোজার মর্যাদা ও এর বিশেষত্বের প্রমাণ। এটি বোঝায় যে, সিয়াম এমন একটি ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহ বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। (ফাতহুল বারী, ৪/১১১)
রোজার এই বিশেষ মর্যাদার আরেকটি কারণও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (বুখারি, হাদিস: ১৯০৪)
ওলামায়ে কিরাম বলেন, অন্যান্য ইবাদত মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়, কিন্তু রোজা একটি গোপন ইবাদত। মানুষ খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকে শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে। এই একান্ত ইখলাস বা আন্তরিকতার কারণেই রোজার প্রতিদান এত বড়।
পবিত্র কোরআন ধৈর্যশীলদের প্রতিদান সীমাহীন বলে ঘোষনা দিয়েছে। বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান পরিমাপ ছাড়া দেওয়া হবে।’ (সুরা যুমার, আযাত : ১০)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, রোজা ধৈর্যের সর্বোচ্চ রূপ। কারণ এতে খাদ্য, পানীয় এবং প্রবৃত্তি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাই রোজাদাররা এই আয়াতের বিশেষ অন্তর্ভুক্ত। (তাফসির কুরতুবী)
রাইয়্যান দরজার হাদিসে কিয়ামতের দিনের একটি সম্মানজনক দৃশ্য ফুটে ওঠে। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে ঘোষণা দেওয়া হবে, ‘রোজাদাররা কোথায়?’ এটি কেবল জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ নয়; বরং সম্মান ও পরিচয়ের এক বিশেষ মুহূর্ত। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষ তাদের আমলের ভিত্তিতেই পরিচিত হবে, আর রোজাদারদের এই বিশেষ আহ্বান তাদের মর্যাদারই প্রকাশ। (হাদিউল আরওয়াহ)
তবে এই মর্যাদা অর্জনের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিক রোজা যথেষ্ট নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেন, ‘অনেক রোজাদার আছে, যারা তাদের রোজা থেকে শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই পায় না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৯০)
অতএব, রোজা হতে হবে গুনাহ থেকে বিরত থাকার, চরিত্র সংশোধনের এবং তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম। মিথ্যা, গিবত, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে না পারলে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
রোজা শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ। এটি মানুষকে ধৈর্য, সংযম, সহানুভূতি এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি এই ইবাদতকে আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করে, তার জন্য আখিরাতে অপেক্ষা করছে এক বিশেষ সম্মান, জান্নাতের দরজা ‘রাইয়্যান’।
রমজান আমাদের সামনে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। আমরা যদি যথাযথ হক আদায় করে রোজা রাখতে পারি তাহলে কিয়ামতের দিন যখন আহ্বান করা হবে, ‘রোজাদাররা কোথায়?’ তখন সেই সৌভাগ্যবানদের কাতারে আমরাও দাঁড়াতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
মাহন আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন।