সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ৬ ১৪৩২, ৩০ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

সাভারে পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে ফের মিললো দুই পোড়া লাশ গুলশান থেকে তরুণীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার ক্ষমতায় গেলে জুলাই শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে আলাদা বিভাগ হবে: তারেক রহমান ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সহিংসতায় নিহত বেড়ে ৫০০০ ওসমানী হাসপাতালের ইন্টার্নদের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয়: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আর্টেমিস-২ মিশন: ৫০ বছর পর চাঁদে মানুষ পাঠাতে প্রস্তুত নাসা ইসির সামনে রাত পর্যন্ত অবস্থানের ঘোষণা ছাত্রদলের ‘প্লট দুর্নীতি’: হাসিনা, টিউলিপ, ববির মামলার রায় ২ ফেব্রুয়ারি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিরোধিতা: ইউরোপের ৮ দেশে শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ‘অগ্রহণযোগ্য’: ইউরোপীয় নেতারা ফেসবুকে শীর্ষদের তালিকায় ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে তারেক রহমান

পর্যটন

রূপকথায় ভরা নীলসাগর

 প্রকাশিত: ১৮:২৩, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

রূপকথায় ভরা নীলসাগর

নীলে ভরা না হলেও খোলা আকাশের রঙ মিশিয়ে সেখানে জলের রঙ নীলাকৃতি। উত্তাল ঢেউ না থাকলেও বিশাল জলরাশি যেন সাগর আকৃতি। অপরূপ সৌন্দর্যের বিশাল আকৃতির এই দিঘীর নাম নীলসাগর।

নীলফামারী জেলা শহরের থেকে উত্তর-পশ্চিমে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার দূরে গোড়গ্রাম ইউনিয়নে এর অবস্থান। পাকা সড়কে সেখানে যাতায়াত করা যায় যেকোনো যানবাহনে।

এ দিঘি ঘিরে রয়েছে অনেক রূপকথার পল্প। জেলার ইতিহাস থেকে জানা গেছে, আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীর কোনো এক সময় বিরাট রাজা খনন করেছিলেন এটি। রাজার কন্যা বিন্নাবতির নামানুসারে নামকরণ হয় ‘বিন্নাদিঘি’। অনেকের মতে, অষ্টম শতাব্দীতে পা-বরা কৌরবদের চক্রান্তের শিকার হয়ে ১২ বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হন। বিরাট রাজার এ স্থানটিতে ছদ্মবেশে বসবাস শুরু করেন তারা। সে সময়ে নির্বাসিত পা-বদের পানির চাহিদা মেটাতে দিঘিটি খনন করেছিলেন রাজা।

আবার অনেকে মনে করেন, রাজা বিরাটের ওই স্থানে ছিল গো-গৃহ। বিশাল গরুর পালের পানির সংস্থান করতে ওই সেখানে দিঘিটি খনন করেছিলেন।

এ বিষয়ে ছমির উদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজী বিভাগের প্রভাষক সত্যেন্দ্র নাথ রায় বলেন, নীলসাগরের প্রাচীন নাম বিন্নদিঘি। এটি পৌরাণিক কাহিনী থেকে নেওয়া। পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে অনেক তত্ত্ব আছে, যেমন বিরাট রাজা ছিলেন, বিরাট রাজার কন্যা ছিলেন বিন্নাবতি। তার (বিন্নাবতি) নামানুসারে এই দিঘিটির নামকরণ হয়েছে বিন্নাদিঘি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, নীলসাগর দিঘিটি নীলফামারীর একটি অন্যতম ঐতিহ্য। জনশ্রুতি আছে, রাজা বিরাট তার গরুর পালকে পানি খাওয়ানোর জন্য এই দিঘিটি খনন করেছিলেন। এটি খননের প্রাক্কালে রাজা বিরাট তার কন্যা বিন্নাবতির নামে এই দিঘির নামকরণ করেন বিন্নাদিঘি। পরবর্তীতে নীলফামারীর নামের সঙ্গে মিউটেশন হয়ে নীলসাগর নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ৫৬ একর জায়গা জুড়ে এই দিঘিটি রয়েছে। অসাধারণ মনোরম দৃশ্যের এই দিঘিটি।

প্রত্নতত্ত্ব সূত্র মতে, এ বিরাট জলাশয়ের কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। লোকে বলে ‘বিন্না রাজার দিঘি’। কিন্তু এই অদ্ভুত নামধারী নৃপতি কে ছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

‘কোচ বিহারের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে খান চৌধুরী আমানত উল্লাহ আহমদ বলেন, “ডোমারের কাছে ‘বিন্নার দিঘি নামক’ যে বৃহৎ দিঘি আছে তাহা হব চন্দ্রের অধীনে বিন্না নামক কোনো সামন্তের খনিত বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। ঐ দিঘি দৈর্ঘ্য সাতশ গজের নূন্য নহে।”

‘বাংলাদেশ প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া বিন্না দিঘি সম্পর্কে উল্লেখ করেন, স্থানীয় লোকেরা বলেন যে, দিঘির চার পাড়ের সমুদয় কাকচরই ইট বাঁধান।

এ সমন্ধে সঠিকভাবে কিছু বলা না গেলেও তাদের কথা অসত্য মনে হয় না। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের দিকে আমরা এ দিঘি দেখতে গিয়েছিলাম। দিঘির সারা কাকচর বা বকচর জলজ উদ্ভিদে ভরা ছিল। দক্ষিণ পাড়ের পূর্বভাগে খানকিটা ফাঁকা স্থান দেখে আমি দিঘিতে নেমে দেখলাম যে, সে স্থানটি ছিল ইট বাঁধান এবং তা উভয় দিকে আরও প্রসারিত ছিল। যেখানে নেমেছিলাম সে স্থানের দু’পাশেও অনেকদূর পর্যন্ত কাকচরটি ইট বাঁধান দেখেছিলাম।

২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এ স্থান জরিপ করে প্রাথমিকভাবে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে শনাক্ত করে। পরবর্তীতে এই দিঘির পূর্ব পাড়ের মাঝামাঝি খনন করে প্রাচীন ইটের নির্মিত ঘাটের উত্তর দিকে একটি বাহু ও মেঝে উন্মোচন করে। যার দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ১০ মিটার এবং প্রস্থ সাড়ে ১৫ মিটার।

ইটের আকার আকৃতি দেখে প্রত্নততত্ত্ব বিভাগের ধারণা দিঘির এই ঘাটটি দশম থেকে একাদশ শতাব্দিতে নির্মিত।

১৯৮০ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসন প্রথম সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহন করে। ১৯৯৮ সালে এটিকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। হরেক প্রজাতির গাছপালায় পাখির কিচি-মিচি শব্দে ভরা। রয়েছে পুরো এলাকার পাকা বাউন্ডারি। চারিদিকে পরিভ্রমণে পাকা রাস্তাসহ অতিথিশালা, শিশুদের বিনোদনের সরঞ্জামসহ রয়েছে পিকনিক স্পট।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাইদুল ইসলাম কলেন, এর ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে দেবার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলজিইডি থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া জেলা পরিষদ থেকে কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, নীলসাগরকে ঢেলে সাজানোর দীর্ঘমেয়াদী যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হলে এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।