তানজিদের রেকর্ড-গড়া সেঞ্চুরিতে চট্টগ্রামকে গুঁড়িয়ে শিরোপা রাজশাহীর
গ্যালারির লড়াইয়ে ম্যাচের শুরু থেকেই দাপট রাজশাহীর। হাজার হাজার কমলা রংয়ের পতাকা আর কণ্ঠের গর্জনেই ছড়িয়ে যায় সেই বার্তা। যেন তাদেরই ঘরের মাঠ! তবে গ্যালারির জয় দিয়ে তার ম্যাচ জেতা যায় না। লড়াইটা তো ২২ গজে। সেখানেও সময় যত গড়াল, রাজশাহী ততই হয়ে উঠল অপ্রতিরোধ্য। তানজিদ হাসানের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরির পর বোলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে পাত্তাই পেল না চট্টগ্রাম।
বিপিএলের দ্বাদশ আসরের চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। একতরফা ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে হারাল তারা ৬৩ রানে।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে শুক্রবার রাজশাহীর জয়ের ভিত গড়া হয়ে যায় তানজিদের ব্যাটে। আগের ১২ ম্যাচে স্রেফ একটি ফিফটি করতে পেরেছিলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। ফাইনালে তিনিই উপহার দেন ৭ ছক্কায় ৬২ বলে ১০০ রানের ইনিংস।
বিপিএলে এটি তার তৃতীয় সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিপিএলে পেলেন তিন শতকের স্বাদ। বিপিএল ফাইনালে তিন অঙ্ক ছোঁয়া প্রথম ব্যাটসম্যানও তিনিই।
তার সেঞ্চুরির পরও অবশ্য বিশাল কোনো স্কোর রাজশাহী গড়তে পারেনি। ২০ ওভারে তোলে তারা ১৭৪। তবে চট্টগ্রাম পারেনি লড়াই জমাতে। গুটিয়ে যায় তারা মাত্র ১১১ রানে।
আসরজুড়ে দুর্দান্ত বোলিং করা বিনুরা ফার্নান্দো নিজেকে ছাপিয়ে যান এই ম্যাচে। আগের ম্যাচে ১৯ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেছিলেন তিনি। ফাইনালে ৪ উইকেট নেন তিনি মাত্র ৯ রানে!
ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে তিন উইকেট নেন হাসান মুরাদ।
রাজশাহী ওয়ারিয়র্স শিরোপা জিতল বিপিএল অভিষেকেই। তবে রাজশাহীর কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির এটি দ্বিতীয় শিরোপা।
চট্টগ্রামের ফ্র্যাঞ্চাইজির শিরোপা অধরা রয়ে গেল এবারও।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন মালিকানায় বদলের পর বিসিবির তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম দলের ফাইনালে উঠে আসাও কম কৃতিত্বের নয়। ফাইনালের আগে রাজশাহীর সঙ্গে তিন লড়াইয়ের দুটিই জিতেছিল তারা। কিন্তু আসল ম্যাচটিতেই জিতে গেল তারা।
চট্টগ্রামের মূল শক্তি বোলিং। তবে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ম্যাচটিতেই সেই বোলিং আক্রমণ ধার হারাল। বিশেষ করে, তানজিদের সামনে বোলাররা খেই হারিয়েছেন বারবার, তার শক্তির জায়গাতেই বল রেখে সহজ করে দিয়েছেন কাজ।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা রাজশাহীর শুরুটা খুব আগ্রাসী ছিল না। পাওয়ার প্লেতে কোনো উইকেট না হারালেও রান তোলে তারা ৪০।
দুটি করে চার ও ছক্কা মেরে তানজিদ অবশ্য আভাসটা ততক্ষণে দিয়ে রেখেছেন। সত্যিকার অর্থে বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন তিনি পাওয়ার প্লে শেষে। টানা দুটি ছক্কা মারেন শেখ মেহেদি হাসানকে, এক ওভারে দুটি মারেন মির্জা বেগকে। পঞ্চাশে পা রাখেন তিনি ২৯ বলেই।
১০ ওভারে ৮২ রান তোলে রাজশাহী। সেখানে তানজিদের রানই ছিল ৫১।
পরের ওভারেই থামে উদ্বোধনী জুটি। সাহিবজাদা ফারহান আউট হন ৩০ বলে ৩০ রান করে।
তানজিদ ছুটতে থাকেন নিজের স্কিল আর প্রতিপক্ষের সহায়তায়। ৫৪ রানে আমির জামালের বলে ক্যাচ দিয়েছিলেন স্কয়ার লেগে, সহজ সেই সুযোগ মুঠো থেকে ফেলে দেন মুকিদুল ইসলাম।
তানজিদের সঙ্গে কেন উইলিয়ামসনের জুটিতে আসে ৪৭ রান। শরিফুলের বলে চোখধাঁধানো এক শটের ছক্কা মারার পরের বলে আরেকটি ছয়ের চেষ্টায় নিউ জিল্যান্ডের গ্রেট আউট হয়ে যান ১৫ বলে ২৪ রানে।
তানজিদ ছুটতে থাকেন তিন অঙ্কের পথে। জামালের এক ওভারে তিনটি বাউন্ডারির পথে আরেক দফায় জীবন পান তিনি ৮৮ রানে। এবার ক্যাচ ছাড়েন আসিফ আলি।
৯১ থেকে শেখ মেহেদিকে ছক্কায় পৌঁছে যান তিনি শতরানের কাছে। পরের ওভারেই ধরা দেয় মাইলফলক।
আউট হয়ে যান তিনি পরের বলেই।
ইনিংসের শেষ বলে নাজমুল হোসেন শান্তকে আউট করে বিপিএলে এক আসরে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের কীর্তি গড়েন শরিফুল ইসলাম(২৬)। ছাড়িয়ে যান তিনি গত আসরে গড়া তাসকিন আহমেদের রেকর্ড (২৫)।
শেষ দিকে খুব বেশি রান তুলতে পারেনি রাজশাহী। রান তাই ১৭৫ স্পর্শ করেনি।
তবে সেটিই চট্টগ্রামের জন্য হয়ে ওঠে পাহাড় সমান। রান তাড়ায় তৃতীয় ওভারেই বিদায় নেন মোহাম্মাদ নাঈম শেখ ও মাহমুদুল হাসান জয়। একটি করে ছক্কা ও চার মেরে আউট হয়ে যান হাসান মুরাদ।
ওপেনার মির্জা বেগ কিছুটা লড়াইয়ের পর আউট হয়ে যান ৩৬ বলে ৩৯ রান করে। মিডল অর্ডারেও সেভাবে দাঁড়াতে পারেননি কেউ। আসিফ আলি করেন ১৬ বলে ২১।
শেষের অনেক আগেই কার্যত শেষ হয়ে যায় লড়াই। ধুঁকতে ধুঁকতে চট্টগ্রাম গুটিয়ে যায় ১৩ বল বাকি থাকতে। রাজশাহীর ক্রিকেটার ও স্টাফরা মেতে ওঠেন বাঁধনহারা উল্লাসে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: ২০ ওভারে ১৭৪/৪ (সাহিবজাদা ৩০, তানজিদ ১০০, উইলিয়ামসন ২৪, নিশাম ৭*, শান্ত ১১; শরিফুল ৪-০-৩৩-২, মুকিদুল ৪-০-২০-২, তানভির ৩-০-১৭-০, শেখ মেহেদি ৪-০-৪৮-০, মির্জা ১-০-১৩-০, জামাল ৪-০-৪৩-০)।
চট্টগ্রাম রয়্যালস: ১৭.৫ ওভারে ১১১ (মির্জা ৩৯, নাঈম ৯, জয় ০, নাওয়াজ ১১, জাহিদুজ্জামান ১১, শেখ মেহেদি ৪, আসিফ ২১, জামাল ৮, শরিফুল ০, তানভির ১*, মুকিদুল ১; বিনুরা ৩-০-৯-৪, নিশাম ৪-০-২৪-২, তানজিম ৩-০-৩৭-০, সাকলাইন ৩.৫-০-২৪-১, মুরাদ ৪-০-১৫-৩)
ফল: রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ৬৩ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: তানজিদ হাসান।