ভোটের লড়াইয়ে ৭৬ নারী প্রার্থী, হিজড়া একজন
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন ৭৬ জন নারী ও একজন হিজড়া। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী রয়েছে ৬১ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে ১৬ জন।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী বিএনপিতে নারী প্রার্থী রয়েছেন ১০ জন। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলে-মার্কসবাদী ১০ জন, জাতীয় পার্টিতে ছয়জন এবং এনসিপিতে রয়েছেন দুইজন।
এর বাইরে গণফোরামে দুইজন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ একজন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলে-বাসদ চারজন, গণসংহতি আন্দোলন তিনজন, গণঅধিকার পরিষদে-জিওপি তিনজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ছয়জন, নাগরিক ঐক্যে একজন, বাংলাদেশের রিপাবলিকান পার্টিতে একজন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিতে দুইজন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে-সিপিবি একজন, আমজনতার দলে একজন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশে একজন, এনপিপিতে একজন, ইনসানিয়াত বিপ্লবে চারজন, এবি পার্টিতে একজন ও বাংলাদেশ লেবার পার্টিতে একজন নারী প্রার্থী হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। যাতে চূড়ান্ত প্রার্থী ১ হাজার ৯৮১ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৩২ জন ও স্বতন্ত্র রয়েছেন ২৪৯ জন।
মোট দলীয় প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৬১ জন নারী বা প্রায় ৩.৫ শতাংশ ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপরদিকে স্বতন্ত্র ২৪৯ জনের মধ্যে ১৬ জন স্বতন্ত্র নারী ভোটের মাঠে নেমেছেন, যা মোট স্বতন্ত্রের প্রায় ৭ শতাংশ।
এবার নারী প্রার্থী রয়েছে ২০টি দলের। বাকি ৩১টি দল কোনো নারী প্রার্থীও দেয়নি।
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী কমায় হতাশা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলেছে, প্রতিবারের মত এবার নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের হার নগণ্য এবং জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রার্থীতা ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ ইসলামপন্থি দলের একজনও নারী প্রার্থী নেই। সার্বিকভাবে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারীদের হার মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, অথচ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশ।
“নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে দলগুলোর ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্মান্ধতার মত রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। এ সব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই এমন মন্তব্য করা মোটেও অমূলক হবে না- নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ ও সংসদের নারী প্রতিনিধিত্বের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতিকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে।”
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গত ১২টি নির্বাচনের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নারী প্রার্থী রয়েছে এবারের ভোটে। সবশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৯৪ জন ভোটে ছিলেন নারী প্রার্থী। তাতে ১৯ জন জিতেছিলেন।
এবার কতজন নারী সরাসরি ভোটে জেতে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।
একমাত্র হিজড়া প্রার্থীর ‘লড়াই ও উদ্বেগ’
ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী দ্বিতীয়বারের মত সংসদ নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে ঈগল প্রতীকে ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এ স্বতন্ত্র প্রার্থী লড়ছেন হরিণ প্রতীকে।
ভোটের প্রচারের মধ্যে শুক্রবার আনোয়ারা ইসলাম রানী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মুঠোফোনে বলেন, “এবার বিজয়ী হওয়ার প্রত্যাশা করি। সঠিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থাকলে ও ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক দুর হলে বিজয়ী হতে পারব।
“মানুষের ভেতরে আতঙ্ক বিরাজ করছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী একটা হুমকির মধ্যে রয়েছে। সবাই নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে এলে শতভাগ বিজয়ী হবো আশা করি।”
তিনি বলেন, এবার ভোটে আসার প্রস্তুতি ছিল না তার; আর্থিকভাবে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ভোটারদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এবারের ভোটের মাঠে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি আসতে চাইনি, তারপরও আমার ভোটাররা বলছেন আপা আপনি আসেন। তাদের কথায় আমার শক্তি এসেছে। ভোটারদের ভালোবাসায় ভোটে রয়েছি, সবাই খুশি।
“নারী প্রার্থী সীমিত। এ নির্বাচনটা বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। যেহেতু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখানে দেশে একটা বেহাল দশা, যখন তখন দেশে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে, গণ্ডগোল তৈরি হচ্ছে। এখানে পেশিশক্তি দেখতে পাচ্ছি।”
নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যারা নারী আছি, আমি আছি। আমরা আসলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, স্বাচ্ছন্দে নির্ভয়ে মাঠে কাজ করব, অনেক রাতে দুরান্তে যাব…। আগেরবার নির্ভয়ে করেছি, এবার সবসময় ভয় থাকছে। কিন্তু লোকজন দেখতে চাচ্ছে, সবখানে ডাকছে। প্রার্থীকে দেখতে চায়।”
এখন পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আক্রমণের শিকার না হলেও অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হওয়ার কথা বলছেন হিজড়া সম্প্রদায়ের এই একমাত্র প্রার্থী।
তার ভাষ্য, “অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে। অপপ্রচার করছে, খারাপ খারাপ শব্দ ব্যবহার করছে। আমরা লড়াইটা কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে নয়। লড়াইটা আমাদের অনেকগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছি। সবসময় নিজের দেশে মানুষের হেয় প্রতিপন্নতার শিকার হয়ে আসছি।”
বর্তমানে দেশে পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ১২০ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন।
ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আনোয়ারা বলেন, “গতবারও আমাদের হিজড়া জনগোষ্ঠী থেকে একাই ছিলাম। এবারও একজনই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।”
নির্বাচনে নারী প্রার্থী চিত্র
>> প্রথম সংসদ নির্বাচনে দুজন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কেউ জেতেনি।
>> ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ (খান এ সবুর) থেকে প্রথম নারী এমপি নির্বাচিত হয়।
>> দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন ১২ নারী। একজন নারী নির্বাচিত হন খুলনা-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে। তিনি হলেন- সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ।
>> ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনজন (পাঁচ আসনে) নারী এমপি নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা তিন আসনে জেতেন। সেবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৩ জন নারী।
>> ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে তিনজন নারী নির্বাচিত হন।
>> ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে ৩৯ জন নারী প্রার্থী অংশ নেন, এর মধ্যে পাঁচজন জয়ী হয়ে সংসদে যান। খালেদা জিয়া পাঁচ আসনে নির্বাচিত হন।
>> ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের তিনজন নির্বাচিত হন।
>> সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে ৩৬ নারীর প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন জয় পান।
>> অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৩৮ নারী প্রার্থীর ছয়জন জয় পান।
>> নবম সংসদ নির্বাচনে ৫৯ নারীর মধ্যে ১৯ জন এমপি হন।
>> দশম সংসদ নির্বাচনে ২৯ নারী প্রার্থীর ১৮ জন নির্বাচিত হন।
>> একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৯ আসনে জনপ্রতিনিধি হতে লড়েন ৬৮ নারী, তাদের মধ্যে রেকর্ড ২২ জন সরাসরি নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান।
>> সবশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৯৪ জন নারী প্রার্থী। এর মধ্যে ২৬ জন লড়াই করেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এ নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দল মনোনয়ন দিয়েছিল ৬৮ নারীকে।
সে নির্বাচনে জয় পাওয়া ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগের, বাকিরা ছিলেন স্বতন্ত্র।