বৃহস্পতিবার ১১ জুন ২০২৬, জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩

ব্রেকিং

পাঁচ জেলায় দেওয়া হবে ‘ই-হেলথ কার্ড’: সংসদে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের উন্নয়নকাজ তদারকিতে বিএনপির নারী এমপি কেন? ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩০ বছর পর তোলা হবে সালমান শাহ’র লাশ, আদালতের অনুমতি বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ছয় শিশুর মৃত্যু: আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষের জবাব ‘সন্তোষজনক নয়’, বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামের উপসর্গ নিয়ে আরো আট শিশুর মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৯৪ আসছে বছরেই চতুর্থ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন বিষয় ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত ১২ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: প্রধানমন্ত্রী মার্কিন হামলার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে আক্রমণ ইরানের তালাক ছাড়াই অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে, নাসির-তামিমা খালাস নীলফামারীতে মাছ ধরতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত ২ হামের উপসর্গ: ওসমানী মেডিকেলে ৫ মাসের শিশুর মৃত্যু হাম: ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনছে সরকার

ইসলাম

ইসলামী আইনের চোখে হালালা সেন্টার ও হিলা বিয়ে

 প্রকাশিত: ১১:০৭, ১১ জুন ২০২৬

ইসলামী আইনের চোখে হালালা সেন্টার ও হিলা বিয়ে

হালালা বলতে আরবি ‘তাহলিল’কে বোঝানো হয়। ইসলামের এটি একটি বিশেষ বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা তিন তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পর তাদের পুনরায় একত্র হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জাহিলী যুগে পুরুষেরা স্ত্রীকে অগণিত তালাক দিতো, তালাক দেওয়ার পর আবার ফিরিয়ে নিতো, কিংবা দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখতো। এটি ছিল পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম এই অপব্যবহার রোধে তালাকের ক্ষেত্রে সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। পবিত্র কোরআনে ন্যূনতম দুই বারে তালাক প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তালাকের পর পারিবারিক পর্যায়ে ‘ইসলাহ’ (সংশোধন) ও ‘সুলহ’ (সমন্বয়) প্রচেষ্টার নীতি প্রদান করেছে। তিন তালাককে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য করেছে। এর মাধ্যমে বিবাহের দায়িত্বশীলতা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং পুরুষকে তালাক উচ্চারণে সতর্ক করা হয়েছে।

রাসূল (সা.) বলেছেন : ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক।’ (আবু দাউদ, আস-সুনান, ২১৭৮)

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘হালালা সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রচারণা এবং হালালার জন্য প্রার্থীদের সিভি আহ্বান করার মতো ঘটনাগুলো শরিয়ার এই বিধানকে ভয়াবহভাবে বিকৃত করেছে।

হালালা কী?

কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করে, তবে স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা পুনরায় একত্র হতে চাইলে স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ও প্রকৃত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। যদি দ্বিতীয় বিবাহ স্বাভাবিক কারণ্তেযেমন তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যম্তেশেষ হয়ে যায়, তবে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন মোহর ও নতুন আকদের মাধ্যমে পুনর্বিবাহ করা বৈধ হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দেয়, তবে তারা যদি মনে করে যে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তাহলে তাদের পুনরায় একত্র হওয়ার মধ্যে কোনো গুনাহ নেই।’ (আল-কোরআন, ২:২৩০)

কখন হালালার প্রসঙ্গ আসবে?

১. তিন তালাকের পর : প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। সেখানে হালালার কোনো প্রশ্নই আসে না। তিন তালাকের মাধ্যমে বায়িন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় সংসার করার প্রসঙ্গ আসলে হালালার বিষয় আসবে।

২. স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহ : দ্বিতীয় বিবাহটি বাস্তব ও স্বাভাবিক হতে হবে। কেবল প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নামমাত্র বিবাহ শরিয়াহসম্মত নয়।

৩. স্বাভাবিক দ্বিতীয়বার বিবাহ বিচ্ছেদ : দ্বিতীয় বিবাহ স্বাভাবিকভাবে স্বামীর মৃত্যু কিংবা তালাকের মাধ্যমে শেষ হতে হবে। পূর্বপরিকল্পিত বিচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. নতুন বিবাহ ও মোহর : প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহের জন্য নতুন আকদ ও মোহর আবশ্যক।

হালালা মেকানিজম : পরিকল্পিত হালালা কেন নিষিদ্ধ?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি দেখা যায়। ইসলামী শরিয়া হালালার জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়নি; বরং একটি স্বাভাবিক দ্বিতীয় বিবাহের পরিণতিতে যদি উপরোক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কেবল পুনর্বিবাহের অনুমতি দিয়েছে।

কিন্তু যদি শুরু থেকেই এই শর্ত আরোপ করা হয় যে দ্বিতীয় ব্যক্তি নারীকে বিয়ে করবে, মিলিত হবে এবং পরে তালাক দিয়ে দেবে যাতে সে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যায়, তাহলে এটি ‘নিকাহে তাহলিল’, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি হালালা করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়, উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত।’ (আত-তিরমিজি, আস-সুনান, ১১১৯)

অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন : ‘আমি কি তোমাদের ধার করা ষাঁড় সম্পর্কে জানাব না?’ সাহাবিরা বললেন : অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, ‘সে হলো হালালাকারী ব্যক্তি। আল্লাহ লানত করেছেন হালালা সম্পাদনকারী এবং যার জন্য তা করা হয়।’ (ইবন মাজাহ, আস-সুনান, ১৯৩৬)

অতএব, নারীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে এক রাত কিংবা কিছু দিন বা মাসের জন্য বিয়ে দেওয়া এবং পরে তালাকের ব্যবস্থা করা শরিয়ার দৃষ্টিতে জঘন্য প্রতারণা। এটি বিবাহের পবিত্রতাকে উপহাসে পরিণত করে। নবীজি (সা.)-এর ভাষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দৃষ্টান্ত ‘ধার করা ষাঁড়’।

পরিকল্পিত হালালা সম্পর্কে ফিকহি অবস্থান

চার মাজহাবের ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে পূর্বপরিকল্পিত হালালা হারাম।

ক. হানাফি মাজহাব : এ ধরনের শর্তযুক্ত বিবাহ নিকৃষ্ট ও গুনাহের কাজ। (ইবন হুমাম, ফাতহুল কাদির, ৩/২১০)

খ. মালিকি মাজহাব: উদ্দেশ্য যদি তাহলীল হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। (আশ-শাফিঈ, আল-উম্ম, ৫/১৫৫)

গ. শাফিয়ি মাজহাব : শর্তযুক্ত তাহলিল শরিয়ার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। (মালিক, মুয়াত্তা, ২/৫৮৫)

ঘ. হাম্বলি মাজহাব : পরিকল্পিত হালালা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৭/৩৪৫)

ফলে উপর্যুক্ত উদ্দেশ্য পূরণে শরিয়াহ হালালা নামক কোনো প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্র বা পেশাদার সেবা চালু করার অনুমতি প্রদান করে না। বরং এমন আয়োজন শরিয়ার বিধানকে বিকৃত করে এবং বিবাহকে খেলায় পরিণত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘হালালা সেন্টার’, ‘হালালার জন্য পাত্র প্রয়োজ’, কিংবা ‘সিভি জমা দিন’ ধরনের প্রচারণা ইসলামী শিক্ষার চরম অপব্যাখ্যা।

ইসলামী শরিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিন তালাককে ভয়াবহ পরিণতি উল্লেখ করে তালাকের বিষয়ে নিরুত্সাহিত করা; এটিকে পাশ কাটিয়ে ‘হালালা মেকানিজ’ তৈরি করা নয়। তাই তালাকের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অবলম্বন করা এবং ইসলামী শরিয়াকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।