মঙ্গলবার ১০ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৬ ১৪৩২, ২১ রমজান ১৪৪৭

ইসলাম

আরব আমিরাতের আভিজাত্য ইফতার তাবু

 প্রকাশিত: ১৫:৫১, ১০ মার্চ ২০২৬

আরব আমিরাতের আভিজাত্য ইফতার তাবু

রমজান মাস এলেই মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলো যেন নতুন এক আবহে সেজে ওঠে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহরগুলো জেগে ওঠে ধর্মীয় আভিজাত্যের দীপ্তিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজানের অন্যতম আকর্ষণ ইফতার তাবু (Iftar Tent)। মানুষের মিলনমেলা, খাবারের আয়োজন এবং ঐতিহ্যের সৌন্দর্যে ভরা এই তাবুগুলো শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং সংস্কৃতি, আতিথেয়তা এবং সামাজিকতার এক অনন্য প্রতীক।

ইফতার তাবুর ধারণা এসেছে আরবের প্রাচীন আতিথেয়তার সংস্কৃতি থেকে। মরুভূমির যাযাবর বেদুইন সমাজে অতিথিদের জন্য বড় তাবু খাটিয়ে খাবারের আয়োজন করার প্রচলন ছিল। এটা আরবের হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। রমজান মাসে সেই ঐতিহ্য নতুন মাত্রা পেত। ধনী পরিবারগুলো বা গোত্রপরিতরা মানুষের জন্য উন্মুক্ত তাবুতে ইফতারের ব্যবস্থা করতেন, যাতে পথিক ও দরিদ্র মানুষও সহজে ইফতার করতে পারে। বিশ শতকের শেষভাগে এই ঐতিহ্য আধুনিক শহুরে রূপ পেতে শুরু করে। বিশেষ করে দুবাইয়ের হোটেল ও রিসোর্টগুলো রমজান উপলক্ষে বড় আকারের ইফতার তাবুর আয়োজন শুরু করে। ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় বিলাসবহুল সামাজিক অনুষ্ঠানে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশ্রণে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতজুড়ে ইফতার তাবু একটি গুরুত্বপূর্ণ রমজান সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ কিংবা রাস আল খাইমাহ প্রায় সব বড় শহরের নামী হোটেল, কনভেনশন সেন্টার এবং খোলা প্রাঙ্গণে এই তাবুর দেখা মেলে। রমজানের শুরুতেই বিভিন্ন হোটেল তাদের বিশেষ ইফতার তাবুর ঘোষণা দেয়। কিছু তাবু এতটাই জনপ্রিয় যে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে ইফতার করতে আসেন। স্থানীয় পরিবার, প্রবাসী মুসলিম, পর্যটক সবাই মিলে তৈরি হয় বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। শুধু বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও মসজিদও বড় তাবু খাটিয়ে বিনামূল্যে ইফতার বিতরণ করে। ফলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এই আয়োজনের অংশ হতে পারে।

দুবাইয়ের ইফতার তাবুগুলোর আয়োজন সাধারণত খুবই সুপরিকল্পিত। সূর্যাস্তের আগেই অতিথিরা তাবুতে এসে বসেন। টেবিলে খেজুর, আরবি কফি, পানি ও নানা ধরনের জুস সাজিয়ে রাখা হয়। আজানের সঙ্গে সঙ্গে খেজুর ও পানির মাধ্যমে ইফতার শুরু হয়। এরপর পরিবেশন করা হয় আরবি ও আন্তর্জাতিক নানা খাবার। হুমুস, ফাত্তুশ, শাওয়ারমা, কাবাব, বিরিয়ানি, গ্রিলড মাংস, নানা ধরনের স্যুপ ও সালাদ সব মিলিয়ে বিশাল বুফে আয়োজন থাকে। পাশাপাশি মিষ্টান্ন হিসেবে উম্ম আলি, বাকলাভা, কুনাফা কিংবা খেজুরভিত্তিক নানা ডেজার্টও থাকে। অনেক তাবুতে ইফতারের পর তারাবির আগ পর্যন্ত চলতে থাকে সামাজিক আড্ডা ও আরবি সঙ্গীত। কিছু জায়গায় সুহুর বা সাহরির আয়োজনও করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইফতার তাবুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর নান্দনিক সাজসজ্জা। বিশাল কাপড়ের তাবুগুলো আরবি নকশা, ঝাড়বাতি, লণ্ঠন এবং রঙিন আলোয় সাজানো থাকে। অনেক তাবুর ভেতরে পারস্য কার্পেট, খোদাই করা কাঠের আসবাব এবং ঐতিহ্যবাহী আরবি অলংকার ব্যবহার করা হয়। এই সাজসজ্জা শুধু চোখের আরামই দেয় না, বরং অতীতের মরু সংস্কৃতি ও আধুনিক শহরের মিলনকে দৃশ্যমান করে। অনেক তাবুতে বাইরের খোলা আকাশের নিচে বসার ব্যবস্থা থাকে, যেখানে মরুভূমির হালকা বাতাস আর রমজানের শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য অনুভূতি।

ইফতার তাবু কেবল খাবারের আয়োজন নয়; এটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্যবসায়ী, বন্ধু, পরিবার কিংবা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে একত্রিত হন। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য বিশেষ ইফতার তাবু আয়োজন করে, যা কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে। একই সঙ্গে এটি ইসলামের দানশীলতা ও আতিথেয়তার মূল্যবোধকেও দৃশ্যমান করে। এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তার এক জীবন্ত প্রতীক। মরুভূমির প্রাচীন তাবু সংস্কৃতি থেকে শুরু হয়ে আধুনিক নগর জীবনের সঙ্গে মিশে এটি আজ এক অনন্য সামাজিক ও নান্দনিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।