মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এক মহীরুহের বিদায়
মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ সাইয়েদ মুহাম্মদ নকীব আল-আত্তাস ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তিনি গত ৮ মার্চ সন্ধ্যায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তার ইন্তেকালে সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগত্ একজন বিরলপ্রতিম মনীষীকে হারাল। আধুনিক যুগে ইসলামি দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব, সভ্যতা-চিন্তা ও শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন একজন অনন্য পথপ্রদর্শক।
১৯৩১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তত্কালীন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) জাভার বোগোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন নাকিব আল-আত্তাস। তার পরিবার ছিল ঐতিহ্যবাহী আলিম ও অভিজাত বংশের ধারক। শৈশব থেকেই তিনি ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও ক্লাসিক্যাল শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পরে তিনি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন-এ গবেষণা। সেখান থেকেই তিনি ইসলামী ইতিহাস ও মালয় সভ্যতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সম্পন্ন করেন।
নাকিব আল-আত্তাস ছিলেন বহুমাত্রিক চিন্তার অধিকারী। আকিদা, ইসলামী দর্শন, মেটাফিজিক্স, ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব ও সভ্যতা-বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই তার গভীর পাণ্ডিত্য ছিল।
বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প: জ্ঞানের ইসলামিকরণ আল-আত্তাসের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আধুনিক জ্ঞানব্যবস্থার সংকট বিশ্লেষণ। তার মতে, আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত জ্ঞানের অনেক কাঠামো পশ্চিমা সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্মিত। ফলে মুসলিম সমাজ যখন সেই জ্ঞানকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করে, তখন ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বদৃষ্টি, মূল্যবোধ ও চিন্তার কাঠামোও সেক্যুলার হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি ‘ইসলামাইজেশন অব নলেজ’ বা জ্ঞানের ইসলামীকরণ ধারণা সামনে আনেন। তার মতে, ইসলামী সভ্যতার নিজস্ব একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দু হলো তাওহিদ। সেই ভিত্তির আলোকে আধুনিক জ্ঞানকে পুনর্বিন্যাস ও পরিশোধন করা প্রয়োজন। অর্থাত্ জ্ঞানকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে তা মানুষের ঈমান, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক বিকাশকে শক্তিশালী করে।
এই ধারণা পরবর্তীতে মুসলিম বিশ্বে শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
‘আদব’ ধারণা: শিক্ষা সংকটের বিশ্লেষণ আল-আত্তাসের অন্যতম মৌলিক তত্ত্ব হলো ‘লস অব আদব’ বা আদবের ক্ষয়। তার মতে মুসলিম সমাজের বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের মূল কারণ হলো জ্ঞানের সঠিক স্থান ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলা।
তিনি বলেন, শিক্ষা কেবল তথ্য বা দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা মানুষের মধ্যে আদব সৃষ্টি করে—অর্থাত্ জ্ঞান, সত্য, শিক্ষক এবং আল্লাহর প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধ।
তার ভাষায়, যখন সমাজে আদবের সংকট তৈরি হয়, তখন ভুল মানুষ নেতৃত্বের স্থানে বসে এবং জ্ঞান তার যথার্থ মর্যাদা হারায়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কেবল দক্ষতা উত্পাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়।
ইসলামী শিক্ষা-দর্শন: আল-আত্তাস ইসলামী শিক্ষা-দর্শনকে একটি সমন্বিত ধারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে শিক্ষা মানুষের মন, শরীর এবং আত্মা—এই তিনটির সমন্বিত বিকাশ ঘটায়।
তিনি মনে করেন, ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো এমন মানুষ তৈরি করা, যারা জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকভাবে পরিপক্ব, আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন।
প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ: এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি ১৯৮৭ সালে কুয়ালালামপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট এন্ড সিভিলাইজেশ্যন (ISTAC)। এই প্রতিষ্ঠানটি খুব অল্প সময়েই মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এখানে ইসলামি দর্শন, ইতিহাস, সভ্যতা ও মানববিদ্যার উপর উচ্চমানের গবেষণা পরিচালিত হয়।
গবেষণা ও লেখালেখি: নাকিব আল-আত্তাস ছিলেন অত্যন্ত উর্বর লেখক। সুফিবাদ, অধিবিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস ও ইসলামী দর্শনের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রায় ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. ইসলাম এন্ড সেকুলারিজম
২. দ্যা কনসেপ্ট অব এডুকেশন ইন ইসলাম
৩. প্রোলিগোমিনা টু দ্য মেটাফিজিক্স অব ইসলাম
৪. ইসলাম এন্ড দ্য ফিলোসোফি অব সাইন্স
এই বইগুলোতে তিনি ইসলামের জ্ঞানতত্ত্ব, শিক্ষা-দর্শন এবং আধুনিক সেক্যুলার চিন্তার সমালোচনা গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে তাঁর ‘ইসলাম এন্ড সেকুলারিজম’ গ্রন্থটি আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
তার চিন্তার প্রভাব শুধু মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও তাঁর কাজ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বহু মুসলিম চিন্তাবিদ, গবেষক ও ছাত্র তার লেখালেখি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।