যমুনায় বাড়ছে পানি ভাঙছে পাড়, বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি
সিরাজগঞ্জে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগ্রাসী হয়ে উঠছে যমুনা নদী। আর এতে নদীর পূর্বপাড়ে কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের দুটি ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন।
এর মধ্যে এসব এলাকার প্রায় শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে নদীতীরের মানুষজন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
ভাঙন ঠেকাতে নদীতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলের কথা জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান।
কাজিপুরের চরগিরিশি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, চরগিরিশ চরে এক সময় ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদী ভাঙনের কারণে ১৫০টি পরিবার আগেই অন্যত্র চলে গেছে। গেল ১০ দিনে অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে আরও শতাধিক পরিবারের ভিটেমাটি যেকোনো সময় নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো আব্দুল মোমিন বলেন, “এই চরে বাবা-দাদার ভিটা ছিল। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের ব্যবধানে সব নদীতে চলে গেছে। এখন অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছি।”
নদীতে ঘরবাড়ি হারানো আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “চোখের সামনে সব কিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার পরিজন নিয়ে কোথায় যাব, কি খাবো, সব মিলিয়ে বড় চিন্তায় আছি।”
ভুক্তভোগী কোহিনুর খাতুন বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। এখন যদি সরকার সাহায্য না করে, তাহলে পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে।”
ভিটেমাটি হারিয়ে আক্ষেপ করে রেজাউল করিম বলেন, নদী শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, তাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। নিজ দেশে একরকম উদ্বাস্তু হয়ে আছেন তারা।
জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের পূর্ব পুরুষদের কবর ও মসজিদ নদীতে চলে গেছে। নিজের মানুষদের কবর হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
চরগিরিশ চরের ষাটোর্ধ্ব রশিদ মিয়া বলেন, “জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি। আমরা এখন কোথায় যাব, ভেটুয়া ও চরগিরিশ চরের শত শত মানুষজন এখন দিশেহারা।”
অপরদিকে চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গেল ১০ থেকে ১৫ দিনের ভাঙনে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, বেসরকারি স্কুল ও দোকানপাটসহ অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে নদীতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেললেও তা কোনো কাজে আসছে না। তবে নদী তীরের বাসিন্দারা ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
ভাঙন এলাকা পরিদর্শনের কথা জানিয়ে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুল আমিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে।
এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীর ও চরাঞ্চলের বসতিদের মধ্যে ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর মধ্যে এসব অঞ্চলের আবাদি জমির ফসল নদীতে তলিয়ে গেছে। মানুষজন নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারছে না।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে নয় সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৫১ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে সাত সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৯৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এর মধ্যে সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা এলাকায় নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধের ৩০ মিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ভাঙনরোধে চৌহালী উপজেলার একটি স্থানে এবং সিরাজগঞ্জ সদরের বাহুকা এলাকায় কাজ চলছে।
চরাঞ্চলে ভাঙন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, যমুনা নদীর বিশাল এলাকজুড়ে চরাঞ্চল। এসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিলে আসলে কিছু করার থাকে না।
তবে সরকার যদি চরাঞ্চল রক্ষায় উদ্যোগী হয়, তাহলে সমীক্ষা করে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।