দুই এমপির পাশাপাশি নিজের বক্তব্যও বাদ দিলেন স্পিকার
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে দুই সংসদ সদস্যের আংশিক বক্তব্যের পাশাপাশি নিজের একটি মন্তব্যও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার ঘো জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রোববার তার সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হলে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ দাবি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের বিএনপির এমপি জালাল উদ্দীন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, গত ১৪ জুন বাজেট আলোচনায় নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজেকে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ বলে দাবি করেছিলেন, যা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, ওই সংসদ সদস্যের বাবা এখনও জীবিত আছেন। অথচ বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
জবাবে স্পিকার বলেন, বিষয়টি তার নজরে আনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য তার সঙ্গে দেখা করে বক্তব্যটি ভুলক্রমে এসেছে বলে জানিয়েছেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “তিনি আমার চেম্বারে এসে বলেছেন যে ভুলক্রমে তার মুখ থেকে এ কথা বেরিয়ে গেছে। তার পিতা এখনও জীবিত আছেন।
“উক্ত মাননীয় সদস্য নিজেও বক্তব্য দিয়ে তার ভুল স্বীকার করেছেন। এটা স্লিপ অব টাং বা অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল।”
স্পিকার বলেন, বক্তব্যের ওই অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে স্পিকার আরেকটি বক্তব্যও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক সম্পর্কে কথিত পরকীয়া সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, যেটি অনভিপ্রেত।
স্পিকার বলেন, “যেহেতু যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা উচিত নয়। সেই কারণে আবু আশফাক সাহেবের বক্তব্য আমি এক্সপাঞ্জ করেছি।”
তিনি বলেন, ওই বিতর্কের সময় সভাপতির আসন থেকে দেওয়া তার নিজের একটি মন্তব্যও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
“সেখানে আমি একজন ব্যক্তির অন্ধকার জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় সম্পর্কে একটি বক্তব্য দিয়েছিলাম। সেটিকেও এক্সপাঞ্জ করা হলো।”
ভবিষ্যতে সংসদ সদস্যদের এ ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে সংসদের সভাপিতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের বাইরে থাকা এমন কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা উচিত নয়, যার পক্ষে সংসদে এসে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
এরপর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে স্পিকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ইসলামে গীবত বা কারও অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে আলোচনা নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা গীবতের শামিল, আর অসত্য কিছু বলা হলে তা তহমত বা অপবাদ হিসেবে গণ্য হয়।
রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর বলেন, “ইসলামের দিক থেকে আপনি ১০০ শতাংশ সঠিক কথা বলেছেন। আল্লাহতালা আপনার এই সিদ্ধান্তের জন্য আপনাকে বরকত দিন।”
এরপর স্পিকার বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু করার জন্য সদস্যদের আহ্বান জানান।
মুনতাকিমের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
গত ১৪ জুন সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম বলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই—চারজন মুক্তিযোদ্ধা; আমার দাদারা ১৯ জনের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা।”
ওই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। কারণ নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। ফলে তার বাবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন—এমন দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিতর্কের মুখে পরে সংসদ সদস্য মুনতাকিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার বাবা জীবিত আছেন। তিনি আসলে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তাদের পরিবারে যুদ্ধশহীদ রয়েছেন।
“আমার বাবা এখনও আছেন। আমার দাদা যুদ্ধ শহীদ। তিনি আমার বাবার চাচা। আমি বোঝাতে চেয়েছি আমার বাবা-দাদাদের মধ্যে যুদ্ধে শহীদ আছেন। আমি আক্ষরিকভাবে আমার বাবা যুদ্ধে শহীদ তা বোঝাইনি।”
মামুনুল হককে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর গত বৃহস্পতিবার সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে নিয়ে ২০২১ সালের একটি আলোচিত ঘটনার প্রসঙ্গ তোলেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “মাওলানা মামুনুল হক অনেক বড় বড় কথা বলছেন। বাজেট নিয়ে সরকারের পতন ঘটাবেন, অনেক কিছু ঘটাবেন। কিন্তু তিনি যে গাজীপুরে একটি নারীসহ ধরা পড়লেন, মুতা বিয়ের নামে, সেটা আসলে কী ছিল?”
তখনই স্পিকার তাকে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় না তোলার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, “একজন রাজনৈতিক নেতার পরকীয়া সম্পর্কে আপনি মন্তব্য করেছেন। সাধারণত যার এখানে এসে জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলা সংসদে সমীচীন নয়।”
পরে বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ওই বক্তব্যকে ‘ভুল তথ্য’ আখ্যা দিয়ে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও অসংসদীয় অংশ বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর স্পিকার বলেন, “মাওলানা মামুনুল হকের এ বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই।”
তিনি এও বলেছিলেন, “এখনও কিন্তু তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক, সেটা চাই না।”
২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে এই নারীকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন মামুনুল হক। সেখানে তাদের আটকে রাখার পাশাপাশি হামলা-ভাঙচুর, বিক্ষোভের মতো ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাচক্রে কারাগারেও যেতে হয়েছিল মামুনুল হককে।
স্পিকার তার বক্তব্যে মামুনুল হকের ঘটনকে ‘জীবনের অন্ধকার অংশ’ বলায় আপত্তি তুলে পরে বিক্ষোভ দেখায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এর মধ্যে শনিবার দীর্ঘ ফেইসবুক পোস্টে পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনা নিয়ে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন মামুনুল হক।
তিনি দাবি করেন, ওই ঘটনা ছিল তার ‘চরিত্র হননের ঘৃণ্য প্রয়াস’।
হেফাজত নেতা মামুনুল হকের ভাষ্য, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) নেতৃত্বে তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, দলটির আইনজীবী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আদালতেও তাকে ‘হেনস্তা’ করেছে।