সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ফাল্গুন ১১ ১৪৩২, ০৬ রমজান ১৪৪৭

জাতীয়

পদ্মার ১৭ চরে নেই স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত হাজারো শিশু

 প্রকাশিত: ১১:১০, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পদ্মার ১৭ চরে নেই স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত হাজারো শিশু

নাটোরের লালপুরের পদ্মার চরের সাত বছর বয়সী সাবিনা ইয়াসমিনের দিন কাটে টুকটাক মায়ের কাজে সহায়তা করে আর খেলাধুলায়। আর দশটা বাচ্চার মত তার স্কুলে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই, নেই পড়াশোনার ব্যস্ততা।

শুনতে আনন্দময় শৈশবের কথা মনে হলেও বাস্তবতা তা নয়। কারণ চরের কঠিন রুক্ষ জীবনের চরম দ্রারিদ্র্যতার মাঝে স্কুলে গিয়ে পড়ালেখার চিন্তাই যেন বিলাসিতা ছোট্ট সাবিনার।

সংসারের কাজের ফাঁকে মেয়ের লেখাপড়ার জন্য মা জেসমিন খাতুন মাঝে মাঝে বকাঝকা করলেও লাভ হয় না, বাবা ঝন্টু প্রমাণিকের দিন কাটে ইটভাটার কাজে। তাদের পক্ষে সম্ভব নয় দূরের চরে মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়া করা। ফলে শিশুটির জীবন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ আর আসে না।

স্কুল যাও কিনা জানতে চাইলে ছোট্ট সাবিনা মন খারাপ করে বলে, “আমাদের স্কুল এখানে নেই। আমার বাবা-গরিব জন্যে দূরে কোথায় দিতে পারছে না। সমস্যাই আমাদের। আমরা এখানে স্কুল চাই, পড়ালেখা করতে চাই।”

শুধু সাবিনা নয়, স্কুল না থাকায় লালপুরের পদ্মার ১৭টি চরে হাজারো শিশু শিক্ষার মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।

তার মধ্যেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গত বছর একটি স্কুল হলেও সেটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই জায়গা এখন দখল করেছে প্রভাবশালীদের কোটি টাকার মহিষের বাথান।

প্রাণভয়ে চরবাসী স্কুল পোড়ানোর বিষয়ে কোনো অভিযোগও করতে পারেননি। আর অভিযোগ না দিলে তদন্তের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পদ্মার বুকে জেগে ওঠা রসূলপুর চরের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক শিশু-কিশোরের জন্য স্কুলটি গড়ে তুলেছিলেন ইটভাটা শ্রমিক ঝন্টু প্রমাণিক।

২০২৫ সালের মার্চে নিজের জমানো টাকায় বাঁশ-কাঠ আর টিনের ছাউনি দিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশেই স্কুল গড়েছিলেন তিনি। যদিও, তিন সপ্তাহ না যেতেই আগুনে সে স্কুল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

রাহুল, মিতা, জিসানসহ রসূলপুর চরের ১৫ থেকে ২০ জন শিশুর কাছে জানতে চাইলে তারা সবাই বলে- তাদের স্কুলটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

তারা স্কুলে যেতে চায়, পড়তে চায় কিন্তু তাদের স্কুল নেই। রাস্তাঘাটও ভালো না, বর্ষার সময় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো সুযোগই নেই।

এসব কথা জানাতে জানাতে বাচ্চারা তাদের পোড়া স্কুলটি দেখাতে নিয়ে যায়।

পোড়া স্কুলের জায়গায় এখন স্থানীয় গেরেস্তদের কোটি টাকার মহিষের বাথান জায়গা করে নিয়েছে। তবে রয়ে গেছে স্কুলের সঙ্গে গড়া ধ্বংসপ্রাপ্ত শহীদ মিনার।

ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই শহীদ মিনারে হাত রেখে আক্ষেপ করছিলেন স্কুলটির উদ্যোক্তা ঝন্টু প্রামাণিক।

তিনি বলছিলেন, “গেল বছর প্রথম রোজার দিন স্কুলডা পুড়াই দিছে। ছেলেপিলের কষ্ট দেখি, আমি খায়ে না খায়ে স্কুলডা করছিলাম। মানুষ শত্রুতা করি স্কুলডা পুড়ায় দিছে। পরে একটা রুমের মধ্যে স্কুলের ব্যবস্থা করতে যায়ে নিজের জান বাঁচানির মত অবস্থা ছিল না।

“কিসের সমস্যা দেশবাসী সব জানে। চিয়ারম্যান, মেম্বর, ইউএনও যদি উদ্যোগ লিতো তাহলে এই অবস্থাটা হত না। আর কারা বাধা দিছে আমিতো আর ওতো ভাঙ্গি বলতে পারবো না। মাননীয় সরকারের কাছে আবেদন একটু ভূমিকা লিওয়ার জন্য।”

অভিযোগ রয়েছে, মহিষের বাথানের মালিকেরাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গা ও ঘর দখল করতে স্কুল পুড়িয়েছে। তাদের ব্যবসার স্বার্থেই তারা চায় না এখানে বাচ্চাদের পড়ালেখা ও মানুষের সুন্দর বসতি হোক। তবে প্রাণের ভয়ে ক্যামেরার সামনে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চায় না চরের বাসিন্দারা। তাদের দাবি শুধু একটি স্কুলের।

সানজিদা খাতুন নামে চরের এক নারী বলেন, “শিশুরা যদি লেখাপড়া না করতে পারে, বড় হয়ে আমাদের মত কামলা খাটতে হবে। এখানে একটা স্কুলের খুব দরকার। সরকার যেন আমাদের এই দাবিটুকু পূরণ করে।”

জেসমিন খাতুন নামে আরেক নারী বলেন, “আমাদের মত গরিব মানুষের পক্ষে পাঁচ কিলোমিটার দূরে স্কুলে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? আমরা কাজ-কাম করব, নাকি ওদের নিয়ে স্কুলে যাব। আর না আছে এখানে রাস্তাঘাট, যাতায়াতের ব্যবস্থা।

“রসূলপুর চরেই দুইশ থেকে আড়াইশ বাচ্চা আছে। অন্যান্য চর মিলে হাজারের বেশি বাচ্চা আছে। আশপাশে স্কুল নাই, স্কুলের অভাবে বেকার হয়ে থাকে। স্কুল থাকলে বাচ্চারা লেখাপড়া করতে পারত, এখনতো মূর্খ হয়ে আছে,” বলেন স্থানীয় মোতালেব আলী।

আরেক বাসিন্দা রায়হান হোসেন বলেন, “এখানে ছালপালের লেখাপড়ার খুব সমস্যা। বর্ষায় নৌকাত পার হতে হয়, অনেক অসুবিধা। আর এখানে তো তেমন কর্ম নাই। যে যিডাই করুক উপরে যাতি হবি। একটু স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ কিছুই নাই। অনেক দূর যাতে হয়। বাচ্চাগুলো যার যার মত কষ্টে হালেই মানুষ হচ্ছে।”

চরের আরও প্রায় ২০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, স্কুলটা পুড়িয়ে দেওয়ার পরে আর ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। নদী ও বালুচরের কারণে দূরে গিয়ে বাচ্চাদের পড়ালেখা আর হয় না। একটা স্কুল হলে সবার জন্যই ভালো হবে।

চরবাসী বাচ্চাদের পড়ালেখার জন্য স্কুল চাইলেও প্রকাশ্যেই বাথান মালিকেরা বিরোধিতা করেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দখলের কথা স্বীকার করলেও ক্ষেপে যান স্কুলের কথা শুনে।

আরিফুল ইসলাম নামে এক বাথান মালিক তার আরও দুই সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে বলেন, “এখানে যারা আছে তাদের সবার ফ্ল্যাট আছে, বাড়ি আছে। আর এখানে এসে বলছে রাস্তার দরকার, স্কুলের দরকার।”

আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তিনি বলেন, “যাদের মহিষের পাল আছে, সবাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। এখানে আমাদের সরকারি বরাদ্দ বলতে, মানুষ আসি চলি চলি যায় সবতো উপরে বাড়ি আছে, এখানে থাকে না। এগুলো লিছে দখল করার মুতো। আমরাও ওইভাবেই থাকি।”

লালপুরের পদ্মায় চর রসূলপুর ছাড়াও বিলমাড়িয়া, আরাজি বাকনাই, নওশারা সুলতানপুর, চাকলা বিনোদপুর, দিয়ারশংকর, মোহরকয়া, চরজাজিরাসহ ১৭টি চরে আট শতাধিক পরিবারে রয়েছে হাজারেরও বেশি শিশু। অথচ কোনো চরে নেই শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা।

দুর্গম এসব চরের পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূরের চিত্র আবার ভিন্ন, সেখানে সরকারি স্কুলে নিয়মিত পড়ালেখা হয়। কিন্তু যোগাযোগ ও যানবাহন না থাকায় প্রতিদিন হেঁটে এত দূর থেকে সেসব স্কুলে গিয়ে পড়ালেখা দুষ্কর হয়ে পড়ে চরের শিশু-কিশোরদের। আর বর্ষায় চিত্রতো আরও করুণ।

সুলতানা খাতুন নামে এক গৃহবধূ বলেন, “বাচ্চারা অনেক কষ্টে মানুষ হয়। পানি থাকলে বিলমাড়িয়ার স্কুলে যাতেই পারে না। পানি শুকি গেলে নৌকাত পার হতে হয়। তখন একদিন যায় একদিন যায় না, এরকম হয়। এখানে স্কুল থাকলে বাচ্চারা পড়তে পারে।

“স্কুল নাই তাই সবাই কৃষি কাজ করি বেড়াচ্চে, বাড়ির কাজ, খেলাধুলা করি বেড়ায়, পড়তে পারে না। বিলমাড়ি একদিন গেলে আরেকদিন যায় না, এসব করি আর পড়তে পারে না। চরে স্কুল হলে বাচ্চাদেরও সুবিধা হয়, মা-বাপেরও সুবিধা হয়।”

তিনি বলেন, “ছেলেপিলে তিন-চার ঘণ্টা হাঁটি গিছে, হাঁটি আসিচ্চে। কত ছিলেপিলে এভাবে ঝড়ে পড়িচ্চে। চরে স্কুল হলে তো আধা ঘণ্টার মধ্যে যাতি পারে। স্কুল হলি ছেলিপিলে যাতি পারে, বাপ-মাও আরাম পায়।”

আর পড়ালেখার সুযোগ না পেয়ে কোমলমতি শিশুদের ধীরে ধীরে নেতিবাচক অভ্যাস ও আসক্তির কথা জানিয়ে দ্রুত প্রতিকারের প্রত্যাশা জানালেন পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা।

লালপুরের বাসিন্দা শিমুল আহমেদ বলেন, “লালপুরের কৃষি, অর্থনীতি পদ্মার চর থেকেই শুরু। চরের অধিকাংশ মানুষই কৃষির উপর নির্ভরশীল। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। তার চেয়ে খারাপ বিষয় হচ্ছে, এখানকার শিশু-কিশোরেরা তাদের মৌলিক অধিকার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

“চরের শিশুরা শিক্ষার আলো না পাওয়ায় বিভিন্ন অন্যায়, অপরাধ ও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। চরে জরুরিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা খুব দরকার। কর্তৃপক্ষ এগুলো নিয়ে ভাবলে এই পদ্মার চর দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।”

চরের শিক্ষার সুযোগ না থাকার কারণ হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা পতিত আওয়ামী সরকারের উপর দায় চাপালেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বছর খানেকের মধ্যেই চরে স্কুল করার।

আর ক্যামেরার সামনে কথা না বললেও অভিযোগ পেলে চরে স্কুল পোড়ানোর বিষয়ে তদন্ত করার কথা জানিয়েছেন লালপুর থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান।

লালপুরের বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মিস্টু বলেন, চরের বেশিরভাগ মানুষই গরিব। তাদের লেখাপড়ার সুযোগটা কম। বিগত সরকারের সময় জবাবদিহিতা না থাকার কারণে প্রান্তিক মানুষের তেমন উন্নয়ন হয়নি, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মত মৌলিক অধিকার থেকে মানুষ অনেকটাই বঞ্চিত হয়েছে।

“এ ছাড়া এই এলাকাটি বিএনপি অধ্যুষিত হওয়ার কারণে আরও নজর দেওয়া হয়নি। আমরা একটা উদ্যোগ নিয়েছি একটি পাঠদান কেন্দ্রের, সেখানে চরের শিশু-কিশোরেরা পড়ালেখা করতে পারবে।”

একই সুর উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারও। তবে, চরগুলো ঘুরে শিশু-কিশোরদের দ্রুতই শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের কথা জানালেন তিনি।

লালপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জুলহাস হাসান সৌরভ বলেন, “চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আপনার কাছে শুনলাম ওখানে স্কুল নাই। আমি আবার চরগুলোতে যাব, যদি স্কুল না থাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি কিছু করার থাকে সেগুলো করার চেষ্টা করব। চরে যারা বসবাস করেন, তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত আমাদেরই করতে হবে। তার জন্য যতটুকু দরকার, আমরা করব।”