মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২১ ১৪৩২, ১৫ শা'বান ১৪৪৭

রাজনীতি

খাগড়াছড়ি: ১৭ বছর নিষ্ক্রিয় সমীরণকে ঘিরে ‘বিতর্ক’

 প্রকাশিত: ১১:১৫, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

খাগড়াছড়ি: ১৭ বছর নিষ্ক্রিয় সমীরণকে ঘিরে ‘বিতর্ক’

২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় মাঠের রাজনীতিতে অনুপস্থিত সমীরণ দেওয়ান দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে খাগড়াছড়ি বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ চোখে পড়েনি।

খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। তার বিপরীতে সমীরণ বিএনপির ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।

সমীরণকে ঘিরে খাগড়াছড়ির বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে সমীরণ দেওয়ান বিএনপির ‘ভোট ব্যাংকে’ বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়া জয়ী হবেন।

খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আরিফ মোহাম্মদ জাহিদ বলেন, “আমরা যারা নতুন প্রজন্মের কর্মী তারা কখনোই সমীরণ দেওয়ানকে মাঠের রাজনীতিতে দেখি নাই। তিনি এখন হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। তার মূল মিশন হলো ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে ঠেকানো। কিন্ত সেটা কখনোই সম্ভব হবে না।

“এবারের নির্বাচনে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি-বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষ ওয়াদুদ ভূইয়াকে নির্বাচনে বিজয়ী করতে একাট্টা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী ওয়াদুদ ভূইয়া বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।”

বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, শেখ হাসিনার তিন মেয়াদের শাসন আমলে খাগড়াছড়িতে জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভুঁইয়াসহ নেতাকর্মীরা জেল-জুলুমের শিকার হলেও সমীরণ ছিলেন অধরা। খাগড়াছড়ি ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। এমনকি শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি কোনো মামলার আসামিও হননি।

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান সমীরণ দেওয়ান। যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা নৌকা প্রতীকে পান ১ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ ভোট; সমীরণ পান ৬৩ হাজার ৪৮।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমীরণ দেওয়ান বিএনপির বিদ্রোহী হলেও ধানের শীষের জন্য খুব একটা ‘বিপদজনক নন’। ১৭ বছরের দূরত্বের কারণে তিনি বিএনপির ‘ভোট ব্যাংকে’ ভাগ বসাতে পারবেন না।

তবে পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক সংগঠনের সর্মথন পাওয়ায় তিনি মূলত ভাগ বসাবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমার ‘ঘোড়া’ মার্কায়। ধর্মজ্যোতি এর আগে সবশেষ উপজেলা নির্বাচনে দীঘিনালা উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। এবারই প্রথম তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার বলেন, “দলের মনোনয়ন না পেয়ে সমীরণ এখন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন। তিনি গত ১৭ বছর খাগড়াছড়িতেই ছিলেন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গে উনার কোনো সর্ম্পক নেই।

“২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজয়ের পর তিনি খাগড়াছড়ি ছাড়েন। নির্বাচনের সময় আসলে ‘বসন্তের কোকিল’ হয়ে আসেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাদের মন্ত্রী-এমপিদের সুসর্ম্পক রেখে চলতেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে অবগত করেছি।”

তিনি বলেন, “ওয়াদুদ ভূইয়া কারাগারে থাকার কারণে সমীরণ দেওয়ান ২০০৮ সালে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এর থেকে তাকে আর বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি।”

নির্বাচনে জনসংহতি সমিতির সমর্থনে বিষয়ে জানতে চাইলে সমীরণ দেওয়ান বলেন, “ওয়াদুদ ঠেকাও এটা আমার কোনো মিশন না। ওয়াদুদ আমরা ভাই, আমরা একসময় এক দল করতাম। এখনো দলে আছি।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন এর খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নির্মল কান্তি দাশ বলছেন, “গত ১৭ বছরে সমীরণে দেওয়ানের জনসম্পৃক্ততার বিষয় নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে জনগণের সুখে-দুখে উনার বিচরণ একটু কম ছিল। সেটাই সাধারণভাবে আমাদের ভাবনা।

“২৪-এর গণঅভ্যুথানে উনার কোনো ভূমিকা ছিল না। ১৯৮৯ সালে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় (সমীরণ দেওয়ান) উনি স্থানীয় সরকার পরিষদের (বর্তমানে পার্বত্য জেলা পরিষদ) চেয়ারম্যান হয়েছেন। উনি কোনো জনসর্মথনের উপর নির্ভর করে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হননি।

“উনার মেয়াদকালে জনস্বার্থে উনি কাজ করতে পারেন নাই। সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে উনি কোনো কাজ করেননি।”

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অনিমেষ চাকমা রিংকু বলেন, “সমীরণ দেওয়ান মূলত এরশাদের হাত ধরে ১৯৮৯ সালে জাতীয় পার্টি করার কারণে তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।

“তবে সে নামমাত্র বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিল। গত ১৭ বছর তিনি আওয়ামী লীগের নেতা উঠাবসা করেছেন।”