গ্রিসে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস
গ্রিস আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পশ্চিমা দর্শনের সূতিকাগার। প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি এই দেশের দাপ্তরিক নাম হেলেনিক রিপাবলিক। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ গ্রিস বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এর উত্তর-পশ্চিমে আলবেনিয়া, উত্তরে উত্তর মাকিদনিয়া ও বুলগেরিয়া ও পূর্বে তুরস্ক।
প্রাকৃতিক বৈচিতর্্য, ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া এবং সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির গ্রিসের প্রধান বৈশষ্ট্যি। এর প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই পাহাড়ি ভূমি আর আছে তিন হাজারেরও বেশি দ্বীপ। পর্যটন, নৌপরিবহণ, কৃষি ও শিল্প দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক খাত। গ্রিসের মোট আয়তন এক লাখ ৩১ হাজার ৯৫৭ বর্গ কিলোমিটার।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মোট জনসংখ্যা এক কোটি তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৩৫ জন। যার বেশির ভাগ খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী। পিউ রিসার্চের তথ্য মতে, গ্রিসের দুই দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এথেন্স দেশটির সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী।
খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে গ্রিসে উন্নত মিনোয়ান সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর তা একাধিক সভ্যতা ও সাম্রাজ্যের অধীন হয়েছে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকে গ্রিসে উসমানীয়দের বিজয় অভিযান শুরু হয়, যা প্রায় এক শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১৮৩০ সালে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত উসমানীয়রা প্রায় চারশ বছর গ্রিস শাসন করে।
রাজনৈতিক গ্রিসে ইসলামের আগমন হয়েছিল উসমানীয়দের মাধ্যমে। তবে গ্রিসের সঙ্গে ইসলামের সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল তার বহু শতাব্দী আগে। হিজরি প্রথম শতাব্দীতে মুসলিম বাহিনী রোডস দ্বীপ (৬৫৪ খ্রি.) ও সাইপ্রাস (৬৫০ খ্রি.) জয় করে। তখন দ্বীপ দুটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধিবাসী হলেও এর বেশির ভাগ নাগরিক ছিল গ্রিক জাতিভুক্ত। তাই বলা যায়, তখন থেকেই গ্রিক জনগণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানের সংযোগ স্থাপিত হয়। পরবর্তী স্পেনের উমাইয়া শাসকরা ৮২৭ সালে ক্রিট দ্বীপ এবং ১০৩০ ফাতেমীয়রা সাইক্লেডস জয় করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রিসে উসমানীয় শাসন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত সেখানে ইসলামের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রসার ঘটেনি।
খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রিসের বাইজেন্টাইন অঞ্চলগুলোতে উসমানীয়দের বিজয় অভিযান শুরু হয়। তারা ১৩৫৪ সালে গ্যালিপোলি, ১৩৬১ সালে আদ্রিয়ানোপল (এদিরনে), ১৩৮৭ সালে থেসালোনিকি জয় করে। ২৯ মে ১৪৫৩ কনস্টান্টিনোপলের পতন হয় এবং ১৪৫৬ থেকে ১৪৫৮ সালের মধ্যে এথেন্স এবং ১৪৬০ সালের মধ্যে পেলোপনিসের পতন ঘটে, যার মাধ্যমে গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের ওপর উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
উসমানীয়রা গ্রিস জয় করার পর এখানে মুসলিম প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটে। ফলে গ্রিসে ইসলামের প্রচার ও ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরি হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। অবশ্য অনেকে রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি ও সুবিধা লাভের জন্যও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। উসমানীয়রা চার শ বছর গ্রিস শাসন করলেও সেখানে জনসংখ্যার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মুসলিম ছিল। এর দ্বারা প্রমাণ গ্রিসে উসমানীয়রা জোরপূর্বক ধর্মান্তর করেনি।
অবশ্য পেলোপনিস, ক্রিট, থেসালি, মেসিডোনিয়া, থ্রেস, রোডসের মতো প্রধান প্রধান নগরগুলোতে মুসলমানের সংখ্যা কিছুটা বেশি ছিল। এই শহরগুলো প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি অনেক মুসলিম কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীরা, আলেম ও ধর্মপ্রচারকরা আবাস গড়েছিলেন।
১৮২১ সালে গ্রিসে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮৩০ সালে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত গ্রিসে মুসলিমরা একাধিক গণহত্যার শিকার হয়। কথিত বিপ্লবীরা পেলোপনিস, অ্যাটিকা, মধ্য গ্রীস ইত্যাদি অঞ্চলে মুসলিম বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালায় এবং তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এর মধ্যে ১৮২১ সালের ত্রিপোলিৎস গণহত্যা বিশেষভাবে উলে্লখযোগ্য, যেখানে হাজার হাজার মুসলিম বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়েছিল।
স্বাধীন গ্রিস রাষ্ট্রও মুসলিম নিধন ও বিতাড়ন নীতি বহাল রাখে। তারা বহু সংখ্যক মুসলিম বাসিন্দাকে দেশত্যাগ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করে। তখন দেশত্যাগে উৎসাহিত করতে অসংখ্য মুসলিম সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৯১২-১৯১৩ সালে বলকান যুদ্ধের সময় গ্রিসের মুসলিমরা আবারও গণহত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয়। সংঘাতের মধ্যে লাখ লাখ মুসলমান পালিয়ে তুরস্কে চলে আসে। সর্বশেষ ১৯২৩ সালে গ্রিস-তুরস্ক নাগরিক বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমান তুরস্কে আশ্রয় নেয়। শুধু পশ্চিম থ্রেসে তুর্কি ও পোমাক জাতিভুক্ত এক লাখ ২০ হাজার মুসলিম গ্রিসে থেকে যায়। তারা লোজান চুক্তির অধীনে বিশেষ সুবিধা লাভ করেছিল, তাও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছিল।
আল জাজিরার তথ্য মতে, ২০০৮ সালে গ্রিসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মুসলিম ছিল। যারা ছিল মোট জনসংখ্যা তিন দশমিক এক শতাংশ। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। গ্রিসে ইসলাম রাষ্ট্র স্বীকৃত একটি ধর্ম এবং সাংবিধানে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে তারা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার। যার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এথেন্সের মসজিদ। মুসলিমরা কয়েক দশক চেষ্টা করার পর ২০২০ সালে সেখানে নামাজ পড়ার অনুমতি পেয়েছে।
গ্রিসের বেশির ভাগ মুসলিম পশ্চিম থ্রেসে বসবাস করে। সেখানে কয়েক শ মসজিদ, ইসলামী বিদ্যালয় ও ইসলামী পারিবারিক আদালত আছে। এই বাইরে অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিমরা ছোট ছোট নামাজ কক্ষে নামাজ আদায় করে থাকে। অভিবাসী মুসলিমদের বড় একটি অংশ রাজধানী এথেন্সে বসবাস করে।
গ্রিকরা তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ করে। অথচ চার শ বছর তুর্কিরা শাসন করার পরও সেখানে প্রায় ৯০ ভাগ খ্রিষ্টান নিজ ধর্মের ওপর টিকে ছিল। বিপরীতে ১৮৩০ সালে স্বাধীনতা লাভের পর মাত্র এক শতাব্দীর ভেতর জনসংখ্যায় মুসলমানদের হার ৯০ শতাংশ কমে গেছে।