অসাধারণ মানুষের গুণাবলী, মর্যাদা ও জীবনাদর্শ
মানুষের সমাজে কেউ ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতির কারণে সম্মানিত হয়, আবার কেউ নীরবে ও অপ্রকাশ্যে জীবনযাপন করেও মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন। আল্লাহর এমন কিছু বিশেষ বান্দা আছেন, যারা ফরজ ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জন করেন এবং নিজেদের জীবনকে তার সন্তুষ্টির জন্য উত্সর্গ করেন। বাহ্যিকভাবে তারা সাধারণ মানুষ হলেও তাদের আনত্মরিকতা, আত্মত্যাগ, দানশীলতা, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি অগাধ নির্ভরতার কারণে তারা আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও অনুগ্রহ লাভ করে অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়ে থাকেন।
অসাধারণ মানুষের পরিচয় : আল্লাহর বিশেষ কিছু বান্দা এমন রয়েছেন যারা সমাজের সাধারণ মানুষ হলেও আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, নির্ভরতা ও আনুগত্যের ফলে মহান আল্লাহ তাদের বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন। ফলে তারা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করেন। এর অর্থ এই নয় যে, তারা স্বাধীনভাবে অলেৌকিক ক্ষমতার অধিকারী; বরং তারা ঈমান, ইখলাস এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার কারণে আল্লাহ তাদের দোয়া, আশা বা শপথকে কবুল করেন। এটি তাদের মর্যাদা ও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। আসলে মানুষের প্রকৃত সম্মান ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা বা সামাজিক প্রতিপত্তিতে নয়; বরং খাটি ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসে। যারা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উত্সর্গ করেন, তারাই প্রকৃত অর্থে অসাধারণ মানুষ এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দা। হাদিসে এসেছে আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছেন যে আল্লাহর নামে কোন কসম করলে তা পূরণ করেন। (বুখারি, হাদিস : ২৭০৩)
অর্থাত্ আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার কারণে এমন কিছু খাঁটি বান্দা রয়েছেন, যারা কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম বা শপথ করলে মহান আল্লাহ তাদের সম্মান রক্ষার্থে এবং তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে সেই কসম কবুল করেন ও পূর্ণ করে দেন। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মাথায় উস্কুখুস্কু চুল ও দেহে ধূলিমলিন দুই খানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন।' (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৫৪)
একজন অসাধারণ মানুষের গল্প : একটি হাদিসে এক অসাধারণ মানুষের গল্প বর্ণিত হয়েছে। তাতে তার মর্যাদা ও কর্মের বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি কোনো এক জঙ্গলে ভ্রমণ করছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাত্ মেঘখণ্ড থেকে তিনি এ আওয়াজ শুনতে পেলেন যে, অমুকের বাগানে পানি দাও। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মেঘখন্ডটি একদিকে যেতে লাগল। অতঃপর এক প্রস্তর পূর্ণ ভূমিতে বারিপাত করল। ওই স্থানের নালাসমূহের একটি নালা ঐ পানিতে সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তখন সে লোকটি পানির অনুসরণ করে চলল। যেতে যেতে সে এক ব্যক্তিকে তার বাগানে দণ্ডায়মান অবস্থায় কোদাল দিয়ে পানি ফিরাচ্ছে, দেখতে পেল। এ দেখে সে তাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কি? সে বলল, আমার নাম অমুক, যা সে মেঘ খ্লের মাঝে শুনতে পেয়েছে। অতঃপর বাগানের মালিক তাকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে কেন? জবাবে সে বলল, যে মেঘের এই পানি, এর মাঝে আমি এ আওয়াজ শুনতে পেয়েছি, তোমার নাম নিয়ে বলছে যে, অমুকের বাগানে পানি দাও। অতঃপর বলল, তুমি এ (বাগানের ব্যাপারে) কি আমল কর? মালিক বলল, যেহেতু তুমি জিজ্ঞেস করছ, (তাই বলছি) আমি এ বাগানের উত্পাদিত ফসলের প্রতি লক্ষ্য করি। অতঃপর এর এক-তৃতীয়াংশ সাদকা করি, এক তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার পরিজন আহার করি এবং এক তৃতীয়াংশ এতে ফিরিয়ে দিই (চাষাবাদ ও বাগানের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করি)। (মুসলিম, হাদিস : ৭২০৩)
যেভাবে অসাধারণ মানুষ হওয়া যায় : আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা সর্বপ্রথম ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করেন। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, পিতা-মাতার হক, মানুষের অধিকার এসব বিষয়ে তারা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। ফরজ অবহেলা করে কেবল নফল ইবাদতের মাধ্যমে কেউ আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে না। ফরজ পালনের পর তারা নফল আদায়ে সচষ্টে হয়ে থাকেন। প্রত্যেক ইবাদতের নফল আছে। যেমন নফল নামাজ, নফল রোজা, নফল দান-সাদকা, নফল হজ, নফল কোরবানি ইত্যাদিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এভাবেই তাদের হূদয় আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তারা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। এটি একজন মুমিনের সর্বোচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তার জীবন, চিন্তা ও কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়। এমন বান্দার ইন্দ্রীয় ও কর্ম আল্লাহর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। ফলে সে হারাম শোনা, দেখা, ধরা ও চলাফেরা থেকে বিরত থাকে। তার সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অর্থাত্ সে সত্য কথা শোনে ও গ্রহণ করে। সে কল্যাণকর বিষয় দেখে। তার হাত অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকে। তার পদক্ষেপ সত্কর্মের পথে পরিচালিত হয়। তাদের দোয়া কবুল হয়। কারণ তাদের অন্তর পবিত্র, উপার্জন হালাল এবং জীবন আল্লাহমুখী।
তারা আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানে থাকেন। বিপদ-আপদে আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন এবং ঈমানের ওপর অটল রাখেন। তারা মৃতু্যর পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর স্নেহ ও অনুগ্রহ লাভ করতে থাকেন। এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দার প্রতি তার বিশেষ দয়া ও ভালোবাসার পরিচায়ক। যেমন হাদিসে সবিসত্মারে বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা যে সমসত্ম ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ওই ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোন ইবাদত নেই যা আমি তার উপর ফরজ করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোন কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে কোন দ্বিধা করি-না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃতু্যকে অপছন্দ করে আর আমি তাকে কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি।' (বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)
পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর অসাধারণ বান্দারা কোনো অলেৌকিক ক্ষমতা বা পার্থিব প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে মহান নন; বরং তাদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি হলো খাটি ঈমান, তাকওয়া, ফরজ ইবাদতের প্রতি নিষ্ঠা, নফল আমলে অগ্রগামিতা, দানশীলতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা। তারা মানুষের কল্যাণে নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যয় করেন, হারাম থেকে দূরে থাকেন এবং সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সচষ্টে থাকেন। ফলে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, তাদের দোয়া কবুল করেন, বিপদে সাহায্য করেন এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করেন।