বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৮ ১৪৩২, ২৩ রমজান ১৪৪৭

ইসলাম

রব্বানার সুর শুনে ইফতার করে ইরানিরা

 প্রকাশিত: ১৫:৫৫, ১২ মার্চ ২০২৬

রব্বানার সুর শুনে ইফতার করে ইরানিরা

ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। মহানবী (সা.) ইফতারের সময় দোয়া করতে উত্সাহিত করেছেন। তাই মুসলিম সমাজে ইফতারের আগে দোয়া করার বিশেষ প্রচলন রয়েছে। ইরানি মুসলিমরা এই ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। কেননা ইফতারের আগে দোয়া করাকে সামাজিক রীতি বা অভ্যাসে উন্নীত করেছে। ইফতারের আগে ইরানের সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয় ‘রব্বানা’ খ্যাত বিখ্যাত মোনাজাত বা দোয়া। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সরকারি প্রচার মাধ্যমে ৩০ বছর দোয়াটি প্রচার করা হয়।

‘রব্বানা’ খ্যাত বিখ্যাত মোনাজাতটি মূলত পবিত্র কোরআনে বর্ণিত চারটি দোয়ার সম্মিলিত রূপ। ইরানের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী মুহাম্মদ রেজা শাজারিয়ান ১৯৭৯ সালে দোয়াটি রেকর্ড করেন। এরপর ৩০ যাবত রমজান মাসে ইফতারের আগে তা প্রচার করা হয়। ২০১৭ সালের মে মাসে ইরান সরকার রব্বানা মোনাজাতকে ইরানের বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। রব্বানা মোনাজাতে অন্তর্ভুক্ত চারটি আয়াত হলো : ১. সুরা আলে ইমরানের ৮ নং আয়াত, ২. সুরা মুমিনুনের ১০৯ নং আয়াত, ৩. সুরা কাহফের ১০ নং আয়াত, ৪. সুরা বাকারার ২৫০ নং আয়াত। দোয়াগুলোতে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর দয়া, অনুগ্রহ, ক্ষমা, সুপথ ও দ্বিনের ওপর দৃঢ়তা কামনা করা হয়েছে, তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে দ্বিনি বিচ্যূতি থেকে।

শিল্পী সাজারিয়ান মোনাজাত সম্পর্কে বলেন, মানুষ বহু আগ থেকে ইফতারের আগে সাইয়েদ জাভেদ জাবেহির (ইরানের বিখ্যাত শিল্পী, সুরকার ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব) রব্বানা মোনাজাতটি শুনত। আমি এর সঙ্গে কোরআনের আরো দুটি আয়াত যোগ করে নতুন করে তা রেকর্ড করি, রেডিও ইরানে এটি রেকর্ড হয়েছিল। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের দোয়াগুলো শেখানো। এই উদ্দেশ্যেই ইরানের জাতীয় রেডিও ও টিভিতে তা প্রচার করা হতো। শিশুদের জন্য রেকর্ড করা হলেও তা অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পায় এবং ইরানি জাতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। 

ইরানের ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সুর অনুকরণে তিলাওয়াতকৃত রব্বানা মোনাজাত এক অনন্য শিল্পকর্ম। এটি সঙ্গীতের চেয়েও বেশি কিছু, যা আধ্যাত্মিকতা এবং জাতীয় ঐক্যকে মূর্ত করে, তাদের বিশ্বাস নির্বিশেষে শ্রোতাদের সাথে গভীরভাবে অনুরণিত হয়। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি সাজারিয়ানের গাওয়া রব্বানা মোনাজাতের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। যেমন মিসরের বিখ্যাত কারি মোস্তাফা গালওয়াশ ইরান ভ্রমণের সময় শাজারিয়ানের রাব্বানা শুনেছিলেন। প্রথমে তিনি অনুপ্রেরণার জন্য এর একটি কপি রেখেছিলেন। পরে মন্তব্য করেছিলেন যে এটি আবৃত্তি করা কোনো গায়কের ক্ষমতার মধ্যে নেই।

ইরানি কবি হুশাং এবতেহাজ, রাব্বানাকে একটি অলৌকিক কাজ এবং শাজারিয়ানের মহান মৌলিক সৃষ্টি বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, কেউ—এমনকি শাজারিয়ান নিজেও এটি আবার একইভাবে পরিবেশন করতে পারবে না।

প্রকৃতপক্ষে ধর্মপ্রাণ ইরানিদের জন্য রব্বানা মোনাজাতটি তাদের বিশ্বাসের একটি নিখুঁত প্রতিফলন, যা রমজানের আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে উন্নত করে। ২০২০ সালে শিল্পী শাজারিয়ান মারা গেলেও, তার রব্বানা প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত এবং ঐক্যবদ্ধ করে চলেছে। আর ইরানের সীমানা অতিক্রম বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিয়েছে।