হরমুজের দায়িত্বে থাকা ইরানের নৌপ্রধানকে হত্যার দাবি ইসরায়েলের
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যর দাবি করেছে ইসরায়েল।
বলা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ রাখার তিনিই ছিলেন প্রধান কারিগর। হরমুজ প্রণালির ধারে ইরানের বন্দর আব্বাস শহরে এক হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি। যদিও ইরান এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, “হরমুজ প্রণালিতে বোমা হামলা মতো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড এবং এই প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখার জন্য তাংরিসি সরাসরি দায়ী ছিলেন,” তাকে ‘উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’।
তাংরিসির পাশাপাশি ইরানের নৗবাহিনীর ঊর্ধবতন কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন বলে কাটজ দাবি করেছেন। তবে ইরান এখনও এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ় প্রণালি কার্যত ‘অবরুদ্ধ’ করে রেখেছে ইরান।
বাছাই করা কিছু দেশের জাহাজকে হরমুজ পার হওয়ার ‘ছাড়পত্র’ দিয়েছে তারা। এই প্রণালিকে ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখার দায়িত্ব ছিল তাংরিসির ওপর। এবার তাকেও হত্যা করার দাবি করল ইসরায়েল।
এ সপ্তাহে কোনও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন।
তাংসিরি নিহতের খবর সত্য হলে তা ইরানের সামরিক নেতৃত্বের জন্য বড় ধাক্কা হতে চলেছে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের নৌবাহিনীর কার্যক্রমে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত উপস্থিতিতে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
আলিরেজা তাংসিরি কে ছিলেন?
২০১৮ সালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি)- নৌ কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন আলিরেজা তাংসিরি। এর আগে ২০১০ সাল থেকে তিনি আইআরজিসি’র উপ কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপরই আইআরজিসি’র নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে ইরানের সামুদ্রিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। তাংসিরি গত ১০ মার্চ থেকে এক্স একাউন্টে সক্রিয় ছিলেন। তার পোস্টগুলোতে বেশ কয়েকবারই তাকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে কথা বলথে দেখা গেছে।
একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “আগ্রাসনকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনও জাহাজের হরমুজ পার হওয়ার অধিকার নেই।” তাংসিরি ছিলেন এক স্পষ্টভাষী কমান্ডার। অতীতেও তিনি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানা বিবৃতি দিয়েছিলেন।
২০১৯ সালে তিনি একবার ইরানের তেল রপ্তানি বিঘ্নিত হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন।
এই প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নজরদারি ড্রোন ইরান গুলি করে ভূপাতিত করার পর ২০১৯ সালে মার্কিন অর্থমন্ত্রণালয় তাংসিরিসহ অন্যান্য আইআরজিসি কমান্ডারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
তাংসিরির মৃত্যুতে কি খুলবে হরমুজ?
তাংসিরির মৃত্যুতে হরমুজ প্রণালি খুলবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে হরমুজ খোলার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তাংসিরির মৃত্যুর খবর সত্য হলে বলা যায়, এতে ইরানের নৌ বাহিনীর কমান্ডা কাঠামো ব্যাহত হতে পারে। তবে তা স্বল্প সময়ের জন্য। তাংসিরির অনুপস্থিতিতে হরমুজের দেখভাল কিভাবে হবে তা নিয়ে আপাতত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিন্তু ইরানের সামরিক নেতৃত্বে আছে বহুস্তরীয় ব্যবস্থা। তার মানে হচ্ছে, কোনও একজন কমান্ডারকে হারানোর ফলে নেতৃত্বে ধাক্কা লাগলেও, সামগ্রিকভাবে গোটা কমান্ড কাঠামো কার্যকরভাবেই চলমান থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন না থাকলে তার উত্তরসূরি এসে আগের নীতিই পরিচালনা করে। আর সেই নীতি বিদ্যমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আরও আগ্রাসীও হতে পারে।
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুললাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পরও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। এমনকি তার ডান হাত আলি লারিজানির মৃত্যুর পরও ইরান টিকে আছে।
দুইজনেরই উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং ইরানের পাল্টা হামলাও চলছে। লারিজানির মৃত্যুর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছিলেন, মৃত্যুতে ইরান যুদ্ধ থেকে পিছু হটবে না। ইরানের শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো আছে।