চট্টগ্রাম-৪: নতুন ভোট, নাকি নিকটতম প্রার্থীর জয়? আদালতে তাকিয়ে ইসি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের চট্টগ্রাম-৪ আসন নিয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।
আদেশের কপি পেলে তা পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বলেন, “আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবেন, আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নেবো। আদালত যদি নতুন করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করার নির্দেশ দেন তাহলে এ আসনে নতুন করে নির্বাচন হবে।
“আর যদি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেন, তাহলে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির অপেক্ষায় রয়েছে ইসি। রায়ের কপির পেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় বসে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
ভোটের নির্দেশনা এলে এ আসনে উপ নির্বাচন হবে না, বরং নতুন তফসিল দিতে হবে বলে জানান এ নির্বাচন কমিশনার।
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে যোগ দিলেও মাত্র দুজন (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪) এখনও শপথ নিতে পারেননি।
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির সরোয়ার আলমগীর ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা চার মাস ধরে আইনি জটিলতায় আটকে থাকে।
সবশেষ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিষয়ে আপিল বিভাগ রায় দেন। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-২ আসনের বিষয়ে হাইকোর্টে শুনানির কথা রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে কি নতুন ভোট
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে প্রার্থী ছিলেন বিএনপির আসলাম চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মো. আনোয়ার ছিদ্দিক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মো. মছিউদদৌলা, গণঅধিকার পরিষদের এটিএম পারভেজ, গণসংহতি আন্দোলনের জাহিদুল আলম, নেজামে ইসলামী পার্টির মো. জাকারিয়া খালেদ, ইসলামী আন্দোলনের দিদারুল মাওলা, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপির শহীদুল ইসলাম চৌধুরী ও ইসলামী ফ্রন্টের সিরাজুদ্দৌলা।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে ধানের শীষ প্রতীকে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পান। বেসরকারিভাবে জয়লাভ করলেও আদালতের আদেশে তার ফলাফল স্থগিত রাখে নির্বাচন কমিশন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট।
ভোটে জিতলেও ‘ঋণ খেলাপি হওয়ায়’ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে সর্বোচ্চ আদালত।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে বিএনপি প্রার্থী আসলাম আর চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচিত এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এখন ওই আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি সেখানে নতুন করে নির্বাচন হবে, আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে তা স্পষ্ট হয়নি।
ইসি মাছউদ বলেন, “আদালতের আদেশে নির্বাচনের কথা বললে তাহলে আমরা নতুন করে তফসিল ঘোষণা করবো। সেক্ষেত্রে নির্বাচনে যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারবে।”
তিনি জানান, নির্বাচনে অযোগ্যতার বিষয়টি এ প্রার্থীর (ঋণখেলাপি হিসেবে আসলাম চৌধুরী) বহাল থাকলে নির্বাচন করতে পারবেন না; আর অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠলে অন্যদের মতো অংশ নিতে পারবেন।
চট্টগ্রাম-২ আসনের বিষয়েও আদালতের যে নির্দেশনা আসবে সেভাবে অনুসরণ করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
যা বলছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবি
আদালতের রায়ের পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, "প্রথম কথা হচ্ছে যে, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়টি না দেখে এর পরিণতি কী হবে, তা বলা উচিত হবে না।”
এই আসনে উপনির্বাচন হতে পারে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "হতে পারে।”
নতুন করে নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরী আবারও অংশ নিতে পারবেন কিনা, এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠলে তার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই।
রায়ের পর আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “প্রচলিত নিয়মে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে পরের জন নির্বাচিত ঘোষিত হয়। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে এবং নির্বাচন কমিশন তা নিষ্পত্তি করবে।”
যেভাবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বাদ আসলাম চৌধুরী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির পক্ষে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আসলাম চৌধুরী এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আনোয়ার সিদ্দিকী নির্বাচন করেছিলেন।
গেল বছর ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমার শেষ দিন ছিল।
আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে প্রথমে গত ৩ জানুয়রি রিটার্নিং অফিসারের কাছে বাছাইয়ে আপত্তি জানালেও মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
এরপর নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হলে সেবারও কমিশন মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে এই যুক্তিতে যে, তিনি মূল ঋণগ্রহীতা নন, বরং ঋণের জামিনদার।
১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানির জন্য আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীর উদ্দেশে বলেছিলেন, “মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা (ঋণটা) দিয়ে দিয়েন। টাকাটা না দিলে কিন্তু জনরোষ তৈরি হবে। মানুষ হিসেবে এটা আপনাকে বললাম।”
এরপর গত ২৭ জানুয়ারি ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে রিট আবেদন করা হয়। হাই কোর্ট দুটি রিট আবেদনই খারিজ করে। ফলে আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান ।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ ওই লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদেশে জানায়, আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সফল হলে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে। এই আদেশের ফলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও তার ফলাফল স্থগিত ছিল।
লিভ টু আপিল মঞ্জুর হওয়ার পর গত ৩১ মার্চ আনোয়ার সিদ্দিকী পৃথক আপিল করেন এবং ২৮ এপ্রিল চেম্বার আদালত তা নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন।
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি এবং যমুনা ব্যাংক পিএলসিও পৃথক আবেদন করে।
গত ১০ জুন আপিল শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয় আপিল বিভাগ।
গত ১৫ জুন শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ৩০ জুন ধার্য করা হয়। ।