অভিযোগ নেওয়া হচ্ছে বলেই ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বেড়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
থানায় অভিযোগ নিতে বাধা না থাকায় ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তার ভাষ্য, আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ধর্ষণের শিকার অনেকেই মামলা করতে থানায় যেতে পারতেন না বা গেলেও অভিযোগ করতে পারতেন না।
“এখন থানায় গেলে মামলা রেকর্ড করা হচ্ছে; অনলাইনেও জিডি ও এফআইআর করার সুযোগ রয়েছে।”
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা মঞ্জুরির প্রস্তাব করেন তিনি।
এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ছাঁটাই প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্যে গণমাধ্যমের খবর উদ্ধৃত করে মার্চ ও এপ্রিল মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “পুরো বাজেটের সবটাই যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া হয় বা এই মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তারপরও কতটুকু উন্নয়ন হবে, তা আমরা জানি না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতার প্রশংসা করে রুমিন বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দেন, সারাদেশ মুগ্ধ হয়ে শুনে। আমি একজন আইনের শিক্ষার্থী, আমিও উনার ডিবেট মুগ্ধ হয়ে শুনি। কিন্তু উনার এই মুগ্ধতা যদি উনি উনার মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে দিতে পারতেন এবং তার মন্ত্রণালয়ের কাজের মাধ্যমে, তাহলে এটি ছাঁটাই করে এক টাকা করার প্রস্তাব আমি রাখতাম না।”
রুমিনের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর আগেও তিনি সংসদে তথ্যসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির চিত্র তুলে ধরেছেন।
খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ডাকাতির মাসওয়ারি তথ্য সংসদে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বেশির ভাগ সূচকে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে।
সালাহউদ্দিন বলেন, “একটা ক্ষেত্রে আমরা একটু পিছিয়ে আছি, সেটা হলো ধর্ষণের কেস রেকর্ডের ক্ষেত্রে। আমরা একটু বেশি ধর্ষণের চিত্র পেয়েছি।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আগে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিরা রেকর্ড করতে থানায় যেতেন না বা যেতে পারতেন না, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে। এখন থানায় গেলেই অথবা অনলাইনে জিডিসহ অন্যান্য কিছু দায়ের করতে পারেন। এফআইআর দাখিল করতে পারেন। এখানে কোনো ইন্টারফেয়ারেন্স নেই। যার কারণে সংখ্যাটা একটু বেড়েছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ধর্ষণের ঘটনা যেখানেই ঘটুক, ভুক্তভোগী শিশু হোক বা নারী, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র দেওয়া, সাক্ষী উপস্থাপন এবং বিচার প্রক্রিয়ায় সহায়তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে।
রামিসা হত্যা মামলার বিচার ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটা বাংলাদেশের রেকর্ড।”
তনু হত্যা মামলার আসামিদের ডিএনএ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হওয়ার কথাও বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন বলেন, পুলিশ দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘গ্রেপ্তার করছে না’; অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের কোনো নেতাকর্মী অপরাধে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট দলও সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ জন্য তিনি বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়কে আমরা কখনও প্রাধান্য দেব না।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে জনগণের সহযোগিতা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের শান্তি, উন্নয়ন, অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকা দরকার।
সালাহউদ্দিন বলেন, “গ্রাম পুলিশ থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত সবাই কাজ করে। কিন্তু জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয় না।”
সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, সংসদে যেভাবে আলোচনার মাধ্যমে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে, সংসদের বাইরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সেই সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সংসদে দুটি আইন আনার কথাও বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মাদকের ভয়াল থাবা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। জুয়ার অপ্রতিরোধ্য গতি থামাতে হবে। যুবসমাজকে রক্ষা করতেই সরকার এসব উদ্যোগ নিয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অধিদপ্তরকে ডগ স্কোয়াড দেওয়া হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্রসহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আসামিদের সাময়িকভাবে রাখার জন্য হাজতখানার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য পরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সব জেলায় ল্যাব করার উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সশস্ত্র দল থাকে। তাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিরস্ত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকির মধ্যে পাঠানো যায় না।
তিনি বলেন, তাদের আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তিসম্পন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে।
জুয়া প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও আধুনিক আইন ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অনলাইন, অফলাইন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সাইবার স্পেসে জুয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধ মোকাবেলায় প্রযুক্তিসম্পন্ন লোকবল ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সালাহউদ্দিন বলেন, “পৃথিবী কোথায় চলে গেছে, আর আমরা ১৮৬৭ সালের জুয়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ওপর ছিলাম।”
নতুন আইনের মাধ্যমে জুয়া, বেটিংসহ আধুনিক ধরনের জুয়া প্রতিরোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর সাতক্ষীরা-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল খালেকও বক্তব্য দেন। তিনি মাদক দমনে গ্রাম পুলিশকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গ্রাম পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব স্তর মাদক, দুর্নীতি, জুয়া ও সামাজিক অপরাধ দমনে ভূমিকা রাখতে পারে।
পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে সেগুলো নাকচ হয়।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খাতে ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা মঞ্জুরির প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।