বাহরাইনে যুদ্ধাতঙ্ক: অনিশ্চয়তার মুখে বাংলাদেশি কর্মীরা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনে। আঞ্চলিক উত্তেজনা, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আকাশপথে অনিশ্চয়তার কারণে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
এরই মধ্যে অনেক নির্মাণাধীন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি।
রাজধানী মানামাসহ বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় কর্মরত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কোম্পানি তাদের কাজ সীমিত বা স্থগিত করেছে। বিশেষ করে দেশটির নির্মাণ খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে এই সংকটের চিত্র আরও জটিলতার দিকে এগোচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মো. স্বপন চৌধুরী দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বাহরাইনে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। তিনি নিজেই বিভিন্ন কোম্পানি থেকে ছোটখাটো কাজ ঠিকাদারি হিসেবে নিতেন।
স্বপন আক্ষেপ করে বলেন, “আজ ৯ দিন ধরে আমার হাতে কোনো কাজ নেই। কাজ না থাকলে এখানে টিকে থাকা কঠিন।”
একই চিত্র দেখা গেছে চাঁদপুর হাজীগঞ্জের মো. খোকনের ক্ষেত্রে। ৯ বছর ধরে বাহরাইনে কার্পেন্টার হিসেবে কর্মরত খোকন জানান, তিনি দেশটির লেবার মার্কেট রেগুলেটরি অথরিটি (এলএমআরএ) ভিসায় আছেন। প্রতি মাসে তাকে ১৫ দিনার ফি দিতে হয়।
খোকন বলেন, “সময়মতো এই ফি দিতে না পারলে আরও ৫ দিনার জরিমানা দিতে হয়। হাতে বর্তমানে কোনো কাজ নেই, চোখেমুখে শুধু অন্ধকার দেখছি।”
লক্ষ্মীপুর রামগঞ্জ উপজেলার মো. কামরুল জিপসাম সরবরাহের কাজ করেন বিভিন্ন কোম্পানিতে। আজ ১১ দিন ধরে তিনিও কর্মহীন। মাদারীপুর জেলার শাহ আলমের কণ্ঠেও ঝরেছে একই হাহাকার।
এদিকে স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজারে সাময়িক প্রভাব পড়লেও, বাহরাইন সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছে। বাহরাইন তাদের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে থাকে। যুদ্ধের ফলে পারস্য উপসাগরের শিপিং রুটে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবহন ও বীমা খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রাথমিক প্রভাব পণ্যের ওপর পড়তে শুরু করেছে।
এ অবস্থায় সীমিত আয়ের প্রবাসীদের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আসন্ন দিনগুলোতে বাড়তি হিমশিম খাওয়ার দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
দীর্ঘ ১১ বছর বাহরাইন প্রবাসী শাহ আলম বলেন, “এর আগে করোনাভাইরাস মহামারীর সময় এরকম একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম, দীর্ঘদিন কর্মহীন ছিলাম। এখন আবার এই যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। এই সংকট কখন শেষ হবে তা শুধু ওপরওয়ালাই জানেন।”
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, “আমি এলএমআরএ ভিসায় একটি ঠিকাদারি কোম্পানিতে কাজ করি। কিন্তু যুদ্ধের আশঙ্কায় মূল ঠিকাদার বর্তমান প্রকল্পের কাজ স্থগিত রেখেছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মূলত ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে বাহরাইনের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ। পারস্য উপসাগরের এই দেশটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর থাকায় এবং ইরানের খুব কাছে হওয়ায় যেকোনো আঞ্চলিক উত্তেজনায় দেশটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই অনিশ্চয়তার কারণেই দেশটির বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
শুধু সাধারণ শ্রমিক নন, প্রবাসী উদ্যোক্তারাও পড়েছেন চরম লোকসানে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন ‘মোমিন কাপতাই কনস্ট্রাকশন’-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মোমিন জানান, তার কোম্পানিতে অধিকাংশ শ্রমিকই বাংলাদেশি।
তিনি বলেন, “আমি বড় বড় আরব কোম্পানি থেকে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ নিই। কিন্তু বর্তমান উত্তেজনার কারণে সেই কাজগুলো স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে কর্মীদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।”
অন্যদিকে ‘মর্গান সাপ্লাই কনস্ট্রাকশন’ কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে ৬ বছর ধরে কর্মরত জিকু আহমেদ জানান, প্রতিদিন সকালে তার মাধ্যমে ২০ থেকে ৩০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন সাইটে কাজ করতে যেতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে কাজ না থাকায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাশাপাশি অনেক ভারতীয় ও পাকিস্তানি শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়েছেন।
কাজের সংকটের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে দেশে ফেরা বা বাহরাইনে আসা নিয়ে আকাশপথের অনিশ্চয়তা। ছুটিতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া মো. করিম বলেন, “ইরান থেকে থেমে থেমে ক্ষেপণাস্ত্র ও মিসাইল হামলার খবরের কারণে আকাশপথ এখন অনিরাপদ মনে হচ্ছে। প্রায়ই ফ্লাইট বাতিলের খবর পাচ্ছি। যারা জরুরি প্রয়োজনে দেশে যেতে চাইছেন, তারা যেমন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, তেমনি যারা ছুটিতে দেশে আছেন তারাও বাহরাইনে ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।”
এ বিষয়ে বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. রইস হাসান সরোয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, “কর্মহীন প্রবাসীর এই সমস্যা শুধু বাহরাইনে নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সবাই এখন এক ধরনের যুদ্ধাতঙ্কের মধ্যে আছে। দূতাবাস থেকে পরিস্থিতি সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো বিশেষ নির্দেশনা বা উদ্যোগ এলে তা দ্রুত প্রবাসীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।”
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী আছেন। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা অভিযোগ করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধ ও হামলার নানা গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক প্রবাসী এখন প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলছেন।
বাহরাইনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যে প্রবাসীদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। দূতাবাস বলছে, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বা বিপদে পড়লে সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই নিরাপত্তা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর বড় প্রভাব পড়বে প্রবাসী শ্রমবাজারে। তবে সংকটের মাঝেও অনেক প্রবাসী আশাবাদী যে, বাহরাইন সরকার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে এবং শিগগিরই কর্মক্ষেত্রগুলো আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।