বুধবার ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৯ ১৪৩২, ২৩ শা'বান ১৪৪৭

ইসলাম

রমজানের আগে যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি

 প্রকাশিত: ১৯:১৭, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রমজানের আগে যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি

বছর পরিক্রমায় রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আবারও আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে মহিমান্বিত রমজান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) থেকে শুরু হতে পারে এ বছরের প্রথম রোজা।

অফুরন্ত বরকতের এই মাসে মুমিন-মুসলমান সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও প্রবৃত্তি সংযমের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির অনুশীলনে আত্মনিয়োগ করেন। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—

كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ، الْحَسَنَةُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ، قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: إِلَّا الصَّوْمَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ، يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي

অর্থ: মানুষের প্রত্যেক আমলের সওয়াব বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, কিন্তু রোজা ব্যতিক্রম। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য, আর আমিই তার প্রতিদান দেব। বান্দা শুধু আমার জন্য তার প্রবৃত্তি ও পানাহার পরিত্যাগ করে।

(বুখারি: ১৯০৪, মুসলিম: ১১৫১, মুসনাদে আহমদ: ৯৭১৪)

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রমজানের আগমনের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। তারা ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন—যেন তিনি তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আবার রমজান শেষে পরবর্তী ছয় মাস দোয়া করতেন—যেন আল্লাহ তাঁদের রোজা ও ইবাদত কবুল করেন। ফলে তাঁদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই রমজানের প্রভাব প্রতিফলিত হতো।

(আসরারুল মুহিব্বিন ফি রামাজান: ৪২)

অতএব, একজন সচেতন মুমিনের জন্য রমজানের অফুরন্ত কল্যাণ অর্জনে এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা অপরিহার্য। কারণ, যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের উত্তম প্রস্তুতিই সেই কাজের অর্ধেক সফলতা। তাই রমজান আসার আগে যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

১. দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ

রমজান শুরুর আগেই অন্তরে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে হবে—এই রমজান হবে জীবনের মোড় ঘোরানো এক অধ্যায়। অতীতের সব গুনাহ ও ভুল থেকে ফিরে এসে মহান আল্লাহ তাআলার পূর্ণ ক্ষমা ও সর্বোচ্চ সাওয়াব অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

২. তাওবাহ ও ইসতেগফারে অভ্যস্ত হওয়া

বছরজুড়ে সংঘটিত সব ভুল-ত্রুটির জন্য আন্তরিক তাওবাহ ও ইসতেগফার করা জরুরি। ‘রমজান এলেই সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে’—এমন ভুল ধারণা পরিহার করতে হবে। বরং আগেভাগে তাওবাহ করে নিজেকে প্রস্তুত করলেই রমজানের কল্যাণ পূর্ণভাবে লাভ করা সম্ভব। এ জন্য বেশি বেশি পড়তে হবে—

اَللَّهُمَّ اغْفِرْلِي

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলি

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন।

৩. কাজা রোজা আদায় করে নেওয়া

পূর্ববর্তী রমজানের কোনো রোজা কাজা হয়ে থাকলে রমজান শুরুর আগেই তা আদায় করে নেওয়া উত্তম। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে কাজা রোজা থাকার সম্ভাবনা বেশি। তাই শাবান মাসেই এসব রোজা পূর্ণ করে নেওয়া শ্রেয়।

৪. রমজানের ফজিলত ও উপকারিতা জানা

রমজান সম্পর্কে কোরআন ও সুন্নায় বর্ণিত ফজিলত, মর্যাদা ও উপকারিতা আগে থেকেই জেনে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এসব কল্যাণ অর্জনে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমলের মানসিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে হবে। এ সময় এ দোয়া বেশি বেশি পড়া উচিত—

اَللَّهُمَّ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।

৫. সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন

রমজানে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তবে এই সাধারণ ক্ষমা সবার জন্য নয়। এ জন্য বিশেষভাবে দুটি মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে হবে—

শিরক থেকে মুক্ত থাকা: ছোট-বড় সব ধরনের শিরক থেকে আন্তরিক তাওবাহ করা।

হিংসা পরিহার করা: হিংসা নেক আমল ধ্বংস করে দেয়, যেমন আগুন কাঠ পুড়িয়ে দেয়।

৬. ফরজ রোজার মাসআলা-মাসায়েল জানা

রমজান শুরুর আগে রোজা সংক্রান্ত ফরজ, ওয়াজিব, মাকরুহ ও রোজা ভঙ্গের কারণগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। এতে ভুলের আশঙ্কা কমে এবং ইবাদত হয় বিশুদ্ধ।

৭. শাবান মাসে রমজানের মহড়া দেওয়া

শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, তাওবাহ-ইসতেগফার ও দান-সদকার মাধ্যমে রমজানের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এতে রমজানে ইবাদতের গভীরতা ও ধারাবাহিকতা বৃদ্ধি পায়।

৮.পূর্ববর্তী রমজানের ঘাটতি চিহ্নিত করা

আগের রমজানে যেসব আমলে ঘাটতি ছিল—তা চিহ্নিত করা জরুরি। যেমন—

নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত না করা

তারাবিহ আদায় না করা

দান-সহযোগিতা ও ইতেকাফে অবহেলা

রোজাদারকে ইফতার করাতে না পারা

এসব ঘাটতি পূরণে আগেভাগেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

৯. রমজানের ২৪ ঘণ্টার সম্ভাব্য রুটিন তৈরি

রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয় হবে—তার একটি বাস্তবসম্মত রুটিন আগে থেকেই নির্ধারণ করা উপকারী। এতে দুনিয়াবি ব্যস্ততার মাঝেও ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

১০. রমজানের চাঁদ অনুসন্ধানে সুন্নাত জীবিত করা

শাবান মাসের ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় রমজানের চাঁদ অনুসন্ধান করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে চাঁদ দেখতেন এবং সাহাবিদেরও দেখতে উৎসাহিত করতেন। নতুন চাঁদ দেখলে তিনি এ দোয়া পড়তেন—

اَللهُ اَكْبَرُ، اَللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالْإِيْمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ وَالتَّوْفِيقِ لِمَا تُحِبُّ وَتَرْضَى، رَبُّنَا وَرَبُّكَ الله

অর্থ: আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ! এ নতুন চাঁদকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদয় কর। আর যে কাজে তুমি সন্তুষ্ট ও যা তুমি ভালোবাস—সে কাজের তৌফিক দাও। আমাদের ও তোমার রব একমাত্র আল্লাহ।