ব্রেকিং:
করোনায় ৩৬ লাখ পরিবার পাবে প্রধানমন্ত্রীর `ঈদ উপহার` বিশ্বে কোভিড -১৯(করোনা ভাইরাসে) প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু। সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন আব্দুল মতিন খসরুর জানাজা সম্পন্ন, বাদ আসর দাফন কারিগরির আকস্মিক দুর্বিপাকে আন্তঃব্যাংক চেক লেনদেন বন্ধ সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুর দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন ভারতে ৫ কোটি স্পুটনিক টিকা সরবরাহ করবে রাশিয়া বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে ইরান ও ইসরায়েলের ছায়াযুদ্ধ টিকা কিনতে বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি সই

শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৪ ১৪২৮,   ০৪ রমজান ১৪৪২

সর্বশেষ:
প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শনিবার থেকে বিশেষ ফ্লাইট চালু
৪৩

দুর্যোগে আমাদের বিশ্বাস ও করণীয় ভাষা ও উপস্থাপনা

মাওলানা শিব্বীর আহমদ

প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২১  

করোনা ভাইরাস; যে ভাইরাসটির কারণে প্রতিদিন বহু মানুষের মৃত্যু  হচ্ছে— তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের অসহায়ত্বের স্বরূপ। পবিত্র কুরআনের বাণী—

وَ خُلِقَ الْاِنْسَانُ ضَعِیْفًا.

মানুষকে দুর্বল করেই সৃষ্টি করা হয়েছে। -সূরা নিসা (৪) : ২৮

এক.

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এ যুগেও মানুষ যে কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে, গত এক বছর আগেও তা কারও কল্পনায়ও আসেনি। অথচ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এ অসহায়ত্বই এখন চরম বাস্তবতা। বিশ্বজুড়ে দাপট দেখানো এ মহামারীর যে গতি ও প্রকৃতি, তা আমাদের অসহায়ত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পৃথিবীর সব দেশ সমানভাবে আক্রান্ত নয়। আবার অধিক আক্রান্ত দেশগুলোর তালিকায় ধনী ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো পিছিয়েও নয়। এ ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতদের মোট সংখ্যায় এ সময়ে প্রথম তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ভারত। অথচ তিন মহাদেশের এ তিন রাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশগুলোতেই এর প্রকোপ সে মাত্রায় নেই। ভারতের এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে তো করোনা নাই বললেই চলে। সরকারি জরিপে বাংলাদেশেও গতি আগের তুলনায় কমে এসেছে। অথচ আমাদের দেশের বাস্তবতা হল, গত মার্চ মাসের আট তারিখে যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, তখন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে অনেক কড়াকড়ি সিদ্ধান্ত এখানে বাস্তবায়িত হয়েছে। এক সপ্তাহের মাথায় দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দিয়ে দেয়া হয়। সবরকম যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হয়। বড় বড় মার্কেটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। খুবই সীমিত পরিসরে একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটার সামান্য সুযোগ ছিল মাত্র। নামাযের জন্যে মসজিদে যাতায়াতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আর এ অবস্থা শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই ছিল। কিন্তু এত কড়াকড়ি, এত সতর্কতা—করোনার গতি কতটুকু রোধ করতে পেরেছে? আমাদের ছোট এ দেশে এক দিনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা চার হাজারও ছাড়িয়ে যায়। এর বিপরীতে এখন যখন সবকিছুই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে, ‘স্বাস্থ্যবিধি’ ও ‘সামাজিক দূরত্বে’র কোনো বালাই আর নেই বললেই চলে, করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাও এখন আগের তুলনায় অনেক কম। মোটকথা, এ করোনা যে কখন কোথায় যাচ্ছে, তা বোঝার সাধ্য এখনও আমাদের হয়ে ওঠেনি। করোনার এ দুর্যোগ আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীসটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে—(হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে তিনি বলেছিলেন-)

يَا غُلاَمُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ، احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ، وَاعْلَمْ أَنّ الأُمّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلاّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلاّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلاَمُ وَجَفّتْ الصّحُفُ.

হে ছেলে! আমি তোমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দিচ্ছি—তুমি আল্লাহর (হকগুলো) সংরক্ষণ করো, তিনি তোমাকে সংরক্ষণ করবেন। তুমি আল্লাহর (হকগুলো) সংরক্ষণ করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনেই পাবে। কোনো কিছু যখন চাইবে তা আল্লাহর কাছেই চাও। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও। আর জেনে রেখো, পুরো উম্মত যদি একত্রিত হয়ে তোমার কোনো কল্যাণ সাধন করতে চায়, তারা ততটুকুই পারবে, যা তিনি তোমার জন্যে লিখে রেখেছেন। আর তারা যদি তোমার ক্ষতিসাধনের জন্যে একত্রিত হয়, তবুও তারা তোমার ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, তোমার যতটুকু ক্ষতির ফয়সালা তিনি করে রেখেছেন। (তাকদীর লেখার পর) কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, খাতাও শুকিয়ে গেছে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫১৬

করোনার দুর্যোগ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বেশ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে এর এত আলোচনা। বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে—পৃথিবীর নানা দেশে নানা সময় এরকম নানা দুর্যোগ আসে। আমাদের এ দেশের কথাই বলি—দুর্যোগ কখনো ডেঙ্গুর আকারে আসে, কখনো আসে জলোচ্ছাস-ঘূর্ণিঝড়ের আকারে, ভূমিকম্প-নদীভাঙ্গনের আকারে আসে, আসে বন্যা কিংবা অনাবৃষ্টির রূপেও। এসব আমাদের দেখা। আর বড়দের কাছ থেকে শোনা—কলেরা বসন্ত, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি নানা রোগও কখনো কখনো ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারিরূপে আমাদের এ দেশে। এটা আল্লাহ তাআলার এক চিরায়ত রীতি।

দুই.

জীবনে চলার পথে আমরা যেসব বিপদ ও সংকটের মুখোমুখি হই সেগুলো একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার কেন্দ্রিক যেমন হতে পারে, তাতে আক্রান্ত হতে পারে একটি পুরো সমাজ, একটি দেশ কিংবা আরও বিস্তৃত অঞ্চল। এ সংকট আবার মানুষ-সৃষ্ট কোনো কারণে যেমন হতে পারে, মানুষের ইচ্ছাকৃত কোনো অপরাধ এর পেছনে দায়ী হতে পারে, আবার বাহ্যত এমন কোনো কারণ নাও থাকতে পারে। এমন কোনো বিপদ যখন সমাজে ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটাকে আমরা ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে চিহ্নিত করে থাকি। বিপদ যে আকারেই আসুক, বিপদ বিপদই। বিপদের ভুক্তভোগী যে, সে-ই বোঝে এর ভয়াবহতা।

বিপদ যেমনই হোক, ছোট হোক বা বড়, মানবসৃষ্ট কোনো কারণ এর পেছনে দায়ী থাকুক আর নাই থাকুক, সবরকম বিপদে আমাদের একই কথা—সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়। আল্লাহবিশ্বাসী মুমিন যারা, তাদের বিশ্বাস এটিই—

وَ اِنْ یَّمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَ، وَ اِنْ یُّرِدْكَ بِخَیْرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضْلِهٖ، یُصِیْبُ بِهٖ مَنْ یَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖ،  وَ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِیْمُ.

আল্লাহ তোমাকে কোনো বিপদ দিলে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কোনো কল্যাণ চান তবে তাঁর অনুগ্রহ রদ করারও কেউ নেই। স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করেন। তিনিই মহাক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা ইউনুস (১০) : ১০৭

আমাদের জীবনে ভালো-মন্দ যা কিছুই ঘটে—এর কোনোটাই নিজ শক্তিতে হতে পারে না। সবকিছুর পেছনেই রয়েছে পরম করুণাময় মহাশক্তিধর রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তাআলার হুকুম। এটা আমাদের বিশ্বাস। এ বিশ্বাস আমাদের ঈমানের অংশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে—

أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ.

তুমি আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনবে এবং ঈমান আনবে তাকদীরের ভালোমন্দের ওপরও। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮

তাকদীরের ওপর ঈমানের বিষয়টি আরেক হাদীসে আরও বিস্তারিত বলা হয়েছে—

لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتّى يُؤْمِنَ بِالقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ ، حَتّى يَعْلَمَ أَنّ مَا أَصَابَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَهُ، وَأَنّ مَا أَخْطَأَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَهُ.

কোনো বান্দা ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ সে তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর ঈমান না আনে। তাকে এ বিশ্বাস করতে হবে—(ভালোমন্দ) যা কিছুই তার ভাগ্যে জুটেছে, তা ছুটে যাওয়ার মতো ছিল না আর যা ছুটে গেছে তা পাওয়ারও ছিল না। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২১৪৪

হাদীসের মর্ম তো দ্ব্যর্থহীন যে কোনো বিপদে আমরা পড়ি কিংবা যে কোনো কল্যাণ আমরা লাভ করি, তা আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে লিখে রেখেছেন বলেই হয়। যে বিপদের কথা আমাদের জন্যে লিখে রাখা হয়েছে, আমরা তা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারি না। একইভাবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কল্যাণকর যা কিছুর ফয়সালা আমাদের জন্যে করা হয়েছে, তাও আমাদের থেকে ছুটে যেতে পারে না কিছুতেই। আর যা আমাদের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত নয়, শত চেষ্টায়ও তা আমরা পেতে পারি না। যে বিপদ আমাদের ভাগ্যে লেখা নেই, তাতে আক্রান্ত হব না আমরা কখনোই। একজন মুমিন হিসেবে এ বিশ্বাস আমাদেরকে ধারণ করতেই হবে।

তাই বলে আবার দুনিয়ার উপকরণকে এড়িয়ে চলার কোনো সুযোগও নেই। দুনিয়াকে বলা হয় ‘দারুল আসবাব’ অর্থাৎ উপকরণের জগৎ। আমাদের জীবিকা, আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের চিকিৎসা ও সুস্থতা, আমাদের আরাম-আয়েশ, আমাদের সফলতা-ব্যর্থতা—সবকিছুতেই আমরা উপকরণ গ্রহণ করে থাকি এবং এটাই স্বাভাবিকতা। এটা ইসলামেরও শিক্ষা। তাকদীরের ফয়সালা যেহেতু অদৃশ্য, তাই এর ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সুযোগ নেই। দুনিয়ার স্বাভাবিকতা হিসেবে উপকরণ গ্রহণ করতে হবে। এরপর এর সফলতা-ব্যর্থতা ছেড়ে দিতে হবে আল্লাহর হাতে। বাস্তবে ঘটেও তাই। অনেকসময় দেখা যায়, শত চেষ্টার পরও আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফল হতে পারি না, আবার কখনো দেখা যায়, সামান্য কিছু চাইতেই বিশাল কিছু পাওয়া যায়। আসলে এ সবই তাকদীর।

দুনিয়াতে চলার পথে অনেকসময় বাহ্যত আমরা দেখি—বিপদে পড়তে পড়তেও যেন আমরা বেঁচে গেলাম, অল্প একটুর জন্যে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে—নানারকম বিপদ থেকে এভাবে আমাদের বেঁচে যাওয়াটাও আল্লাহ তাআলার অদৃশ্য এক বাহিনীর মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

لَهٗ مُعَقِّبٰتٌ مِّنْۢ بَیْنِ یَدَیْهِ وَ مِنْ خَلْفِهٖ یَحْفَظُوْنَهٗ مِنْ اَمْرِ اللهِ .

মানুষের জন্যে তার সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে, তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। -সূরা রা‘দ (১৩) : ১১

আসলে এ জগতের কোনোকিছুই আপন শক্তিতে ঘটে না। ছোট-বড় যত বিষয়, সবই মহান রাব্বুল আলামীনের হুকুমেরই প্রতিফলন। তাঁর আদেশেই সবকিছুর সৃষ্টি। তাঁর অনুমতিক্রমেই সবকিছুর গতি ও স্থিতি। অনেক কিছুকে বাহ্যত আমরা আকস্মিক মনে করি। কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিকট কোনোকিছুই অপরিকল্পিত নয়। তাঁর নিকট সবকিছুই পূর্ব নির্ধারিত, পূর্ব পরিকল্পিত। পবিত্র কুরআনে তিনি বলেছেন—

وَ عِنْدَهٗ مَفَاتِحُ الْغَیْبِ لَا یَعْلَمُهَاۤ اِلَّا هُوَ، وَ یَعْلَمُ مَا فِی الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ  وَ مَا تَسْقُطُ مِنْ وَّرَقَةٍ اِلَّا یَعْلَمُهَا وَ لَا حَبَّةٍ فِیْ ظُلُمٰتِ الْاَرْضِ وَ لَا رَطْبٍ وَّ لَا یَابِسٍ اِلَّا فِیْ كِتٰبٍ مُّبِیْنٍ

অদৃশ্যের চাবিসমূহ তাঁর কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া তা আর কেউ জানে না। জলে-স্থলে যা রয়েছে তা তিনি জানেন। আর এমন কোনো পাতা ঝরে পড়ে না এবং মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণা কিংবা আর্দ্র বা শুষ্ক এমন কিছু নেই, যা তিনি জানেন না, যা এক সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। -সূরা আনআম (৬) : ৫৯

ভাবা যায়—বাতাসের ঝাপটায় কিংবা কারও ঝাঁকুনিতে শীতকালে গাছের যে পাতাগুলো শুকিয়ে ঝরে পড়ে, সেগুলোর সংবাদও তিনি রাখেন, সেসবের কথা তিনি জানেন! এরপর আর বিষয়টি এড়িয়ে যাবার সুযোগ কোথায়—জগতের ভালোমন্দ ছোটবড় কোনোকিছুই আল্লাহর হুকুম ছাড়া সংঘটিত হতে পারে না? আসলে বিষয়টি আমরাও অস্বীকার করি না কখনোই। তবে আমাদের তা বুঝে আসে তখন, যখন আমাদের শত চেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ হতে থাকে। তখন অবচেতন মনেই আমরা স্বীকার করি—সবই আল্লাহর ইচ্ছা!

দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে বিপদ দেন। এটা এ দুনিয়ার একটি স্বাভাবিকতা। বিপদ নানারকমের হতে পারে। জান-মাল, সহায়সম্পদ, সন্তানাদি, পরিবারপরিজন, সম্মান-সম্ভ্রম ইত্যাদি নানা বিষয়ে মানুষ বিপদাক্রান্ত হয়। দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে বিপদে ফেলেন—এ কথা পবিত্র কুরআনেই বলা হয়েছে। বিপদ কেন দেন, বিপদে পড়লে কী করতে হবে—এসবও তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কয়েকটি আয়াত লক্ষ করুন—

وَ لَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَیْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَ الْجُوْعِ وَ نَقْصٍ مِّنَ الْاَمْوَالِ وَ الْاَنْفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ، وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیْنَ، الَّذِیْنَ اِذَاۤ اَصَابَتْهُمْ مُّصِیْبَةٌ ۙ قَالُوْۤا اِنَّا لِلهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیْهِ رٰجِعُوْنَ.

আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব সামান্য ভয় ও ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফসলের কিছুটা ক্ষতি দিয়ে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও—যারা কোনো বিপদাক্রান্ত হলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর আর অবশ্যই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। -সূরা বাকারা (২) : ১৫৫-১৫৬

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِی الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ اَیْدِی النَّاسِ لِیُذِیْقَهُمْ بَعْضَ الَّذِیْ عَمِلُوْا لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ.

মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যেন তিনি তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে। -সূরা রূম (৩০) : ৪১

وَ لَنُذِیْقَنَّهُمْ مِّنَ الْعَذَابِ الْاَدْنٰی دُوْنَ الْعَذَابِ الْاَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ.

গুরু শাস্তির পূর্বে তাদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন তারা ফিরে আসে। -সূরা সাজদা (৩২) : ২১

এমন আয়াত আরও আছে। এগুলো থেকে আমরা যে নির্দেশনা পাই তা সংক্ষেপে এমন—১. দুনিয়াতে নানারকম বিপদ দিয়ে আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। ২. সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ৩. বিপদে মুমিনের সান্ত¡না—ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিঊন অর্থাৎ আমরা আল্লাহর, তাঁর কাছেই আমরা ফিরে যাব। ৪. জগতের যত বিপর্যয়, যত ফ্যাসাদ ও বিশৃঙ্খলা, তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। ৫. আল্লাহ দুনিয়াতে মানুষকে শাস্তি দেন তাকে সতর্ক করার জন্যে, যেন সে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরে আসে—সে জন্যে। ৬. দুনিয়ার বিপদ যত বড়ই হোক, আখেরাতের শাস্তির তুলনায় তা খুবই সামান্য। আর এ সামান্য বিপদে পড়ে যদি কেউ বড় বিপদ ও শাস্তির বিষয়ে সতর্ক হয়ে যায়, নিজের কৃত ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে, তবে তার জন্যে এ প্রাপ্তি অসামান্য।

তিন.

কোনো ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ যখন আসে, তা বন্যা ঘূর্ণিঝড় করোনা ভূমিকম্প যে আকারেই হোক না কেন, এগুলো ঠেকানোর কোনো সাধ্য আমাদের থাকে না। দৃশ্যত যেসব বিপদ ও সংকটের পেছনে মানবসৃষ্ট কোনো কারণ দায়ী, সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করা যায়। দায়ী কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু এমন কোনো কারণ যেখানে দৃশ্যতও থাকে না, সেখানে তো তা ঠেকানোর সুযোগই নেই। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আমরা কোনো কোনো দুর্যোগের বিষয়ে আগাম একটা ধারণা পেতে পারি। বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় কোন্ দিকে যেতে পারে—আবহাওয়া অফিস থেকে তাও আমাদের জানিয়ে দেয়া হয়। সে ধারণা কখনো ঠিক হয়, কখনো হয় না। আগাম কোনো ধারণা পাই কিংবা না পাই, উভয়ক্ষেত্রেই আমরা দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। সে ব্যবস্থা হতে পারে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্যে, হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনকে স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনার জন্যে। কিন্তু কথা হল, এ ব্যবস্থা গ্রহণকে আমরা কোন্ শব্দে প্রকাশ করব? এক্ষেত্রে আমাদের ভাষা ও উপস্থাপনা কী হবে? সাধারণত ‘দুর্যোগ মোকাবেলা’ শব্দটি আমরা ব্যবহার করি। মোকাবেলা শব্দের আভিধানিক অর্থ যদিও এ ব্যবহারকে সমর্থন করে না, তবুও উপরোক্ত বিশ্বাস অটুট রেখে যদি কেউ কেবলই দুর্যোগকালীন বিভিন্ন পদক্ষেপকে মোকাবেলা শব্দে ব্যক্ত করে, তবে হয়তো তা মেনে নেয়া যাবে। কিন্তু অনেককেই দেখা যাচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে (বিশেষ করে করোনার ক্ষেত্রে) সরাসরি ‘শত্রু ’, ‘যুদ্ধ’, ‘লড়াই’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করছেন। করোনা কিংবা বন্যাকে যখন শত্রু বলা হবে আর সে শত্রু র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে আহবান জানানো হবে, তখন তো এ প্রশ্ন উঠবেই—বাহ্যত কোনো কারণ ছাড়াই যেখানে একটি দুর্যোগের মুখোমুখি আমরা হয়েছি, আমাদের বিশ্বাস—এর পেছনে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাই কার্যকর, সেখানে এ দুর্যোগকে শত্রু বলা আর এ শত্রু র বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক—একজন মুসলিমের জন্যে কতটা সমীচীন? আমাদের উচিত, সর্বত্রই আমাদের বিশ্বাস ও আদর্শকে ধারণ করে এমন শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা। আমাদের আকিদা-বিশ্বাস পরিপন্থী সকল কথা ও কাজ এড়িয়ে চলা। মহামারী করোনার নানামুখী রূপ থেকে এ শিক্ষাটাও আমাদের গ্রহণ করতে হবে।


আল কাউসার
অনলাইন নিউজ পোর্টাল
অনলাইন নিউজ পোর্টাল
এই বিভাগের আরো খবর