শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ৩০ ১৪৩২, ২৫ রমজান ১৪৪৭

ইসলাম

সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষার আবশ্যকতা

 প্রকাশিত: ১৬:১২, ১৪ মার্চ ২০২৬

সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষার আবশ্যকতা

পরিবার মানবজীবনের প্রথম বিদ্যালয়, আর মা-বাবা সেই বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক। এখানে সন্তানরা শুধু ভাষা, আচরণ বা জীবনধারা শেখে না; তারা শেখে ন্যায়, ভালোবাসা ও নৈতিকতার মূল পাঠও। তাই সন্তানদের প্রতি মা-বাবার আচরণই তাদের মানসিক গঠনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করা কেবল নৈতিক সৌন্দর্য নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও আমানত।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণের নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০)। এই ন্যায়বিচারের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। মা-বাবা যদি নিজেদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তবে পরিবারে শান্তি ও ভালোবাসা স্থায়ী হয়।

এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে নুমান ইবনে বাশীর (রা.) বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিছে- তিনি বলেছেন, তাঁর পিতা তাকে একটি বিশেষ উপহার দিয়েছিলেন। তখন তাঁর মা বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী না করা পর্যন্ত আমি এতে সম্মত নই।’ পরে তাঁর পিতা বিষয়টি নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার সব সন্তানকে কি এভাবে দিয়েছ?’ তিনি বললেন, “না।” তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় কর এবং সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর।’ (বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭)

এই হাদিস আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, সন্তানদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব পরিবারে অশান্তির বীজ বপন করে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো সন্তান পড়াশোনায় ভালো বলে তাকে বেশি আদর করা হয়, আবার কেউ দুর্বল হলে তাকে অবহেলা করা হয়। কখনো বড় সন্তানকে বেশি দায়িত্বশীল মনে করে তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আবার ছোট সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত স্নেহ দেখানো হয়। এসব আচরণ অন্য সন্তানের মনে কষ্ট, হীনমন্যতা ও দূরত্ব তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে ঈদ, জন্মদিন বা অন্য আনন্দের উপলক্ষে এই পার্থক্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধরুন, ঈদের দিন বাবা বড় ছেলেকে দামি পোশাক বা মোবাইল কিনে দিলেন, কিন্তু ছোট ছেলেটির জন্য সাধারণ কিছু নিয়ে এলেন। বাহ্যিকভাবে বিষয়টি ছোট মনে হলেও শিশুর কোমল হূদয়ে এটি গভীর দাগ ফেলে। সে মনে করতে পারে—‘হয়তো আমি মা-বাবার কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নই।’ এই অনুভূতি ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গায় অভিমান জন্ম দেয়।

একইভাবে আদর-সোহাগের ক্ষেত্রেও সমতা জরুরি। কোনো সন্তানকে সবসময় প্রশংসা করা আর অন্যজনকে শুধু তিরস্কার করা ন্যায়সংগত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের প্রতি কোমলতা ও ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করতেন এবং বলতেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)

পড়াশোনা বা জীবনের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও সমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে অন্যজনকে অবহেলা করা, একজনের শিক্ষার জন্য সবরকম সহায়তা করা কিন্তু অন্যজনের স্বপ্নকে গুরুত্ব না দেওয়া; এসব আচরণ সন্তানের মনে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করে। অথচ প্রতিটি সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আমানত। তাদের প্রত্যেকেরই স্বপ্ন আছে, সম্ভাবনা আছে, এবং তারা সবার কাছ থেকেই সমান উত্সাহ ও সমর্থন পাওয়ার অধিকার রাখে।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, বাবা-মা যেন সন্তানদের মধ্যে ন্যায় ও ভারসাম্য বজায় রাখেন। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ক্ষেত্রে সবকিছু হুবহু সমান হবে; বরং মূল বিষয় হলো; কোনো সন্তান যেন অবহেলিত বা বঞ্চিত বোধ না করে। ভালোবাসা, দোয়া, মনোযোগ এবং সুযোগের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখাই প্রকৃত সমতা।

অতএব, একজন সচেতন মুসলিম অভিভাবকের উচিত নিজের আচরণে সবসময় সতর্ক থাকা। ঈদের উপহার, দৈনন্দিন আদর-সোহাগ, পড়াশোনার সুযোগ কিংবা জীবনের অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার বজায় রাখা। কারণ পরিবারে প্রতিষ্ঠিত এই ন্যায়ই ভবিষ্যতের সমাজকে ন্যায়পরায়ণ করে তোলে।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে যে, সন্তানরা শুধু আমাদের দুনিয়ার সুখ নয়, তারা আখিরাতের পরীক্ষাও। তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা মানে আল্লাহর নির্দেশ মানা এবং একটি শান্তিপূর্ণ, ভালোবাসায় ভরা পরিবার গড়ে তোলা। আর যে পরিবারে সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ঈদের আনন্দও হয় সত্যিকারের আনন্দ, ভালোবাসাও হয় নির্মল ও দীর্ঘস্থায়ী।

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষার তাওফিক দান করুন।