মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ফাল্গুন ৫ ১৪৩২, ২৯ শা'বান ১৪৪৭

ইসলাম

ইসলামের চোখে মিথ্যা সংবাদ ও অপপ্রচার

 প্রকাশিত: ১৫:৫০, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইসলামের চোখে মিথ্যা সংবাদ ও অপপ্রচার

সমাজে বসবাসের জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান অপরিহার্য। কিন্তু এই তথ্য সত্যনিষ্ঠ না হয়ে মিথ্যা, গুজব বা অপপ্রচারে পরিণত হলে তা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বর্তমান যুগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে মিথ্যা সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যা সামাজিক অস্থিরতা, বিভ্রান্ত ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তথ্য গ্রহণ, যাচাই ও প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

সংবাদ যাচাইয়ে কোরআনি নির্দেশনা : প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা সংবাদের সয়লাব প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। অনেকের ভেতর নিজের বিশ্বাস প্রচারের এমন প্রবণতা দেখা যায় যে প্রচারিত কোনো সংবাদ নিজের মত বা মতবাদের অনুকূলে হলে তা যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করে না। অথচ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সংবাদ গ্রহণ বা প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষত সংবাদদাতার চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সংবাদ যাচাইয়ের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন 'হে মুমিনরা! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো; নতুবা অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।' (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)

সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় না জেনে অনুসরণ নয় : সমাজে শানি্ত ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয় অসত্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যের দ্রুত বিস্তার। প্রযুক্তির এই যুগে মিথ্যা তথ্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এক্ষেত্রে ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দেয়। কেবল শোনা কথার ভিত্তিতে বা ফেসবুকের কোনো পোষ্ট দেখেই সদ্ধিান্ত গ্রহণ বা প্রচার করার ব্যাপারে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। প্রতিটি মানুষকে তার শোনা, দেখা ও বিশ্বাস করার বিষয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন 'যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।' (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)

মিথ্যা সংবাদ ও অপপ্রচারের ভয়াবহতা : যাচাই না করে সংবাদ প্রচার করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত, যদিও প্রচারকারী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলতে চায় না বা বলে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা প্রচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথষ্টে যে, সে কোনো কথা শোনামাত্রই (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)

গিবত ও দোষচর্চার নিষেধাজ্ঞা : মিথ্যা সংবাদ ও অপপ্রচার অনেক সময় গিবত, অপবাদ ও চরিত্রহননের রূপ নেয়। পবিত্র কোরআনে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করে এর জঘন্যতা তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন 'তোমরা একে অপরের দোষ অনুসন্ধান করো না এবং গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করো।' (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)

দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা : অনির্ভরযোগ্য প্রচারের পরিবর্তে দায়িত্বশীল ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সত্য যাচাই করাই ইসলামের আদর্শ। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ পেলে তা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ বলেন 'যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা ভয়ের কোনো সংবাদ আসে, তারা তা প্রচার করে দেয়। যদি তারা তা রাসুল (সা.) বা দায়িত্বশীলদের কাছে পেশ করত, তবে অনুসন্ধানকারীরা তার সত্যতা নির্ণয় করতে পারত।' (সুরা নিসা, আয়াত : ৮৩)

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম মিথ্যা সংবাদ, গুজব ও অপপ্রচারের বিরম্নদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। সংবাদ যাচাই, জ্ঞানভিত্তিক সদ্ধিান্ত, দায়িত্বশীল আচরণ ও নৈতিকতা এসব ইসলামের মেৌলিক শিক্ষা। ব্যক্তি ও সমাজকে নিরাপদ ও শানি্তপূর্ণ রাখতে এই নির্দেশনাগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা অপরিহার্য। বিশেষ করে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মুসলমানদের উচিত আরও বেশি সচেতন, সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্ববান হওয়া, যাতে মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।