বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, চৈত্র ৪ ১৪৩২, ২৯ রমজান ১৪৪৭

ব্রেকিং

নীলসাগর এক্সপ্রেস বগুড়ায় লাইনচ্যুত, অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত তিন মাসের মধ্যে হেলথ কার্ড বিতরণ করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা অভিবাসী তাড়াতে এবার প্রণোদনার ঘোষণা ট্রাম্প প্রশাসনের ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ায় নিহত ১ ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের নৌপরিবহন নিয়ে জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘ সংস্থা প্রধান জামাত ঈদগাহে, বায়তুল মোকাররমে ৫ জামাত রোজার ঈদ কবে? চাঁদ দেখা কমিটি বসছে বৃহস্পতিবার ঈদ যাত্রা: অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে ট্রেন সৌদি আরবে মিসাইল হামলায় আহত বাংলাদেশির মৃত্যু ইরানে আটকে পড়া বাংলাদে‌শিদের ফেরানো হচ্ছে ইরান যুদ্ধে সাহায্য না করে নেটো বোকার মতো ভুল করছে: ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক

আলি লারিজানিকে মেরে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করল ইসরায়েল?

 প্রকাশিত: ১৯:০০, ১৮ মার্চ ২০২৬

আলি লারিজানিকে মেরে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করল ইসরায়েল?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের শুরু থেকে ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের অন্যতম কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন দেশটির শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ‘ডি ফ্যাক্টো’ নেতা আলি লারিজানি।

তাকে মেরে ফেলায় যুদ্ধের ইতি টানার যে কোনো ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টা জটিল হয়ে উঠতে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিএনএন লিখেছে, ৬৭ বছর বয়সে লারিজানি হয়ে উঠেছিলেন ইরানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের ধারাবহিকতার দৃশ্যমান প্রতীক। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েও দিনকয়েক আগে তিনি তেহরানে এক জনসমাবেশে অংশও নেন।

যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহজুড়ে লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিলেন ব্যাপক সরব; তিনি সমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে খুঁচিয়েছেন, এমনকি সোমবারও তিনি পারস্য উপসাগরের মুসলিমদের সতর্ক করে লেখেন, “তোমরা জানো তোমাদের প্রতি আমেরিকার কোনো আনুগত্য নেই এবং ইসরায়েল তোমাদের শত্রু। একটুখানি থামো, নিজেদের এবং এই অঞ্চলের ভবিষ্যতের কথা ভাবো।”

ইসরায়েলি বিমান হামলায় লারিজানির মৃত্যুতে ইরানি শাসকরা তাদের অন্যতম প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও প্রভাবশালী একটি কণ্ঠকে হারাল, একইসঙ্গে এটি যুদ্ধ বন্ধে কোনো আলোচনাকেও আরও কঠিন করে তুলল, বলছেন বিশ্লেষকরা।

সাম্প্রতিক অস্থির সপ্তাহগুলোতে, বিশেষ করে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনির মৃত্যুর পরের দিনগুলোতে লারিজানিই ছিলেন ইরানের ‘ডি ফ্যাক্টো’ নেতা, মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।

“তিনি ছিলেন খুবই আস্থাভাজন ব্যক্তি, যিনি এই শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে কয়েক দশক কাটিয়েছিলেন, যা তাকে শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে কেউ মারা গেলে তার স্থলাভিষিক্ত কাকে কীভাবে করা হবে তা ঠিক করাই থাকে, কিন্তু এমন বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির স্থলাভিষিক্ত পাওয়া সহজ হবে না,” বলেছেন জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিফি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি।

গত বছরের জুনে ও এবারের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় ইরান তাদের অনেক অভিজ্ঞ কমান্ডার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হারিয়েছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান লারিজানিকে হারানোটা অন্যরকম।

তিনি হয়তো সবসময় ‘টার্গেটে’ ছিলেন না। ব্যক্তিগত নানান পরিকল্পনা ও আলোচনার সম্বন্ধে অবগত একটি সূত্র গত বছরের সেপ্টেম্বরে সিএনএনকে বলেছিল, ইরানের শাসনক্ষমতার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে লারিজানিই তাদের সবচেয়ে পছন্দের প্রার্থী।

কিন্তু পরে ইরানে বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হুমকি ধামকি দেওয়া নেতাদের মধ্যে সামনের সারিতে চলে আসা এবং সশস্ত্র সামরিক পদক্ষেপের কৌশল নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এমন ধারণা থেকে ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শুরুর দিক থেকেই তাকে ‘লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত করে।

চলমান যুদ্ধ পরিচালনায় তার মৃত্যু খুব সীমিত প্রভাব ফেললেও রাজনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান ও তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দক্ষতার কারণে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ প্রভাব হবে জটিল, বলছেন আজিজি।

তার মতে, উদারপন্থি হিসেবে পরিচিত ইরানের এখনকার প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধের শুরু থেকেই মোটা দাগে সাইডলাইনে পড়ে আছেন, তার পক্ষে ক্ষমতাকাঠামোর বিভিন্ন অংশকে এক জায়গায় এনে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা শুরু করা অসম্ভব।

এমন কিছুর জন্য লাগবে লারিজানির মতো একজন, যিনি বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করে একটি সম্ভাব্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন, ভাষ্য আজিজির।

অর্ধশতক ধরে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সেবায়

প্রায় পাঁচ দশক ধরে লারিজানি প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা কমিটি, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সংসদে গুরুত্বপূর্ণ সব পদে ছিলেন।

ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ভূয়সী প্রশংসাও করেছে, তাকে এমন এক ব্যক্তিত্ব আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যিনি ‘জীবনের শেষ মুহূর্ত’ পর্যন্ত ইরানের অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করেছেন, বাইরের শত্রুর হুমকির মুখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গেছেন।

“ইসলামিক প্রজাতন্ত্রেও এই ধরনের পথচলা বেশ বিরল। তার দায়িত্ব পালনের তালিকায় যে একটিই পদের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেটি হল প্রেসিডেন্ট,” সিএনএনকে বলেছেন আজিজি।

লারিজানি ছিলেন পরিবর্তনশীল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনীতির একজন দক্ষ নাবিক, একজন ‘বাস্তববাদী রক্ষণশীল’, যিনি শাসনব্যবস্থার ভেতরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে কাজ করতে পারতেন, এবং একইসঙ্গে প্রজাতন্ত্রের প্রতিও ছিলেন সম্পূর্ণ অনুগত।

১৯৮০-র দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন আইআরজিসির একজন কমান্ডার। পরে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের প্রধানও হন।

এই শতকের প্রথম দশকে লারিজানি ছিলেন ইরানের পরমাণু বিষয়ক মুখ্য আলোচক। তার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া পশ্চিমা কূটনীতিকরাও তাকে ‘সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান’ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি আয়াতুল্লাহ খামেনির উপদেষ্টা হওয়ার পর ক্রমশ তিনি হয়ে ওঠেন নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার অন্যতম প্রধান সহচর।

২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর তিনি ছিলেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার, যা তার ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করে।

২০১৫ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সেসময়কার ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া চুক্তির প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, “এটা একে অপরের বিভিন্ন বিষয় আরও ভালোভাবে বোঝার সূচনা।”

 

রাশিয়ার সোচিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে আলি লারিজানি। ফাইল ছবি। ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ার সোচিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে আলি লারিজানি। ফাইল ছবি। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের সংঘাতের পর লারিজানিকে ফের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর তিনিই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হয়ে ওঠেন বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

একইসঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের মূল কণ্ঠস্বর, সাম্প্রতিক সময়ে তার মস্কো, বৈরুত, আবু ধাবি ও ওমান সফর এমনকি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।

তিনি জানুয়ারিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং ওমান সফরের পর পরমাণু চুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের শর্ত কী কী তা ঠিক করে দিয়েছিলেন। যুদ্ধের আগে ওমানই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল।

শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে লারিজানির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার আরেক কারণ ছিল তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড। তিনি এক সুপরিচিত আয়াতুল্লাহ-র মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। তার ভাই সাদেগাহ’ও একজন আয়াতুল্লাহ, একসময় ছিলেন ইরানের বিচারবিভাগের প্রধান। তার আরেক ভাই মোহাম্মদ জাভেদ লারিজানিও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায়ও লারিজানির সুখ্যাতি ছিল। শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ শেষে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন তিনি, জার্মান দার্শনিক এমানুয়েল কান্টের কাজ নিয়ে তার বিস্তৃত লেখা রয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লারিজানি বারবার বলেছেন, ইরান দীর্ঘ সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।

“ইরান দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের নেই,” ওয়াশিংটনের অভিযান শুরু হওয়ার পরপরই এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছিলেন লারিজানি।

এখন তার মৃত্যু ওই যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। সোমবারই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার, ৭১ বছর বয়সী মহসেন রেজায়ি অবসর ভেঙে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা হয়েছেন।

ইরানের নতুন নেতৃত্ব যে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত প্রজন্মের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন—রেজায়ির নিয়োগেই সে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মত আজিজির। এর অর্থ—ইরান আরও সামরিকায়নের দিকে ঝুঁকবে, যেখানে লারিজানির মতো বাস্তববাদী কণ্ঠস্বর ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যাবে।