গাঙের ঢেউয়ের মতো
স্কুলের পাঠ্য বাংলা বইগুলো ছিল আমার সাহিত্যপাঠের প্রথম জোগান। সম্ভবত অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইটিতে প্রথম পড়েছিলাম কবি আল মাহমুদের ‘নোলক’ কবিতাটি—
“আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
হাত দিয়ো না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।”
এত ঘোর লাগা কবিতা এটি, এখনো এর পাঠবিহ্বলতা হৃদয়ে লেগে আছে। কিন্তু তখনো কবিকে সেভাবে চিনে উঠিনি। তখন তিনি অন্য লেখকদের মতোই আমার চেনাভুবনের বাইরের কেউ।
এ সময়ে তার আরও বেশকিছু কবিতা পড়ে যায়। সবিশেষ মনে পড়ে, সাহিত্যের ক্লাস বইটিতে উদ্ধৃত ‘কবিতা এমন’ কবিতাটির কথা—
“কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাইবোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি–রাবেয়া রাবেয়া–
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!”
এ কবিতাটি পড়ে সম্যকভাবে চিনতে পারি কবিকে। সেসময়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে কবির ‘ওগো বনহংসিনী আমার’ উপন্যাসটি। এটি পড়তাম নিয়মিতভাবে। কিছুদিন পর এটি বইঘর থেকে বই আকারে প্রকাশিতও হয়।
কবিকে হৃদয় দিয়ে চিনেছি—বরং হৃদয়ে ধারণ করে নিয়েছি যে বইটির মাধ্যমে, সেটি তার আলোড়িত আত্মজীবনী ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ পড়ে। পাশাপাশি পড়া হয়ে যায় ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ বইটিও। সেইসাথে তার বেশ কটি উপন্যাস আর দুই খণ্ডের গল্পসমগ্র পড়ে নিই।
‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’, ‘নীল নাকফুল’, ‘নীলক্ষ্যার চর’ গল্পগুলোর স্বাদ এখনো মনে লেগে আছে। তার ‘একটি চুম্বনের জন্য প্রার্থনা’ গল্পটি পড়ে কোনো লেখা দ্বিতীয়বার পড়ার অভ্যাসটি রপ্ত করি। কোনো লেখা এক বসায় কয়েকবার পড়ার এটিই ছিল প্রথম।
ততদিনে আল মাহমুদ ‘কবিতমেষু’ হয়ে আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। শুনতে পেলাম, তিনি ঢাকার মগবাজারে থাকেন। আমার বয়সী অনেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরেছে। শুনে আমার ভেতরেও কবিকে দেখার আকাঙ্ক্ষা জাগে। কিন্তু কীভাবে যাব তার কাছে! কোনো পথ না পেয়ে সেই আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে জিইয়ে বসে থাকি।
দিনটি ছিল ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ফেসবুকের বরাতে জানতে পারি কবির মৃত্যুর সংবাদ। আমি তখন গাঙের পাড় ধরে হাঁটছিলাম। দেখি, সমস্ত নিসর্গটা হয়ে গেছে ‘আল মাহমুদময়’।
ভাটি বাংলা থেকে উঠে গিয়ে কবি জয় করেছিলেন রাজধানীকে। সঙ্গে যে তোরঙ্গ নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে বের করে সবাইকে দেখিয়েছিলেন ভাটিয়ালি নিসর্গের জাদু। যে গাঙের পাড় ধরে হাঁটছিলাম, এমন একটি গাঙও তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন সেই তোরঙ্গে করে।
ভাবতে থাকি, তার তোরঙ্গের ভেতরে কী কী ছিল?
ছিল তেরোশত নদীর কল্লোল আর চারশো পঞ্চাশ প্রজাতির পাখির কলরব—লুকায়িত বাংলাদেশ। ছিল ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের কর্মমুখর জীবনচাঞ্চল্য। ছিল বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি; ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনা, ধর্মবিশ্বাস। ছিল স্বদেশের মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সম্পদের সুষম বণ্টনের স্পৃহা; মেহনতি মানুষের প্রতি পক্ষপাত, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা। আর ছিল নরনারীর মধ্যকার চিরন্তন প্রেম-বিরহ এবং সম্পর্ক ও অসম্পর্কের আখ্যান।
এই যে সমগ্রতা নিয়ে আল মাহমুদ আবির্ভূত হলেন, আমরা তার কাছ থেকে কী পেলাম?
আমরা পেলাম কাঁঠালচাঁপার গন্ধ—এটা বাংলা কবিতায় ছিল না, ক্ষীরের মতন গাঢ় নরম মাটি, মক্তবের মেয়ে এবং ফাবি আয়্যি আলায়ি রাব্বিকুমা তুকায্যিবান—আল মাহমুদের আগে এটাও কেউ বাংলা কবিতায় আনেননি। পেলাম পালক-ডানার প্রতিবাদ, ঠান্ডা ধানের বাতাস, গাঙের ঢেউয়ের মতো কবুল, ছাপানো শাড়িতে নদীর নাম, উঠানে ধানের কাছে নুয়ে থাকা পূর্ণস্তনী ঘর্মাক্ত যুবতী, নীল মসজিদের ইমাম, বখতিয়ারের ঘোড়া, গিফারির শেষ দৃশ্য, বৃক্ষের নালিশ, এক লায়লার কাহিনি এবং ডাবের মতো গোলগাল চাঁদ।
এসবের ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ যে বাংলাদেশ সংস্থাপন করেছেন, সেই বাংলাদেশ আমরা আর কোথাও পাই না!
এভাবে তাকে ভাবতে ভাবতে চলে এলাম গুদারাঘাটে। ভেজা বালিতে হেঁটে হেঁটে, গাঙের পানিতে পা ডুবিয়ে অনেকক্ষণ ভাবলাম কবির কথা। তারপর চরের নরম বালিতে শামুকের কড়ি দিয়ে লিখে রাখলাম—আল মাহমদু!
ছেলেবেলায় একবার পরিবারের সাথে নদীপথে বেড়াতে গিয়েছিলেন কবি। তখন তাদের নৌকা একটি চরে নোঙর করেছিল। সেখানে এক খেলার সাথি পেয়ে তার সাথে চরের বালিতে কবি নিজের নামটি লিখেছিলেন। আমিও তার চলে যাওয়ার দিনে বালিতে লিখে রাখলাম তার নামটি।
গুদারায় উঠে যাওয়ার পর দেখি, গাঙের ঢেউ এসে মুছে নিয়ে যায় শামুকের কড়ি দিয়ে লেখা কবির নামটি। সেই ঢেউটি যখন ধাক্কা খেয়ে গাঙে ফেরত আসে, তখন দেখি সমস্ত গাঙটাই হয়ে গেছে আল মাহমুদময়!
আল্লাহ তার ওপর অবারিত রহমতের শিশিরধারা বর্ষণ করুন!