যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতিতে ‘চাপ বাড়ছে’: মন্ত্রী আমির খসরু
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ‘চাপ বাড়বে’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, “এটা কঠিন সময়, আমাদেরকে স্বীকারই করতে হবে। একে তো অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। সাথে সাথে এই যে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে, সেটার কারণে অর্থনীতির উপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং এই যুদ্ধ যদি চলতে থাকে চাপটা আরো বাড়তে থাকবে।
“সেই ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তায় খুব সজাগ আছি। ইতোমধ্যে আমাদের জ্বালানি যে প্রকিউরমেন্ট—ভালো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এখনো অব্যাহত আছে; যাতে জ্বালানির অভাবে মিল-কারখানা, পাওয়ার সেক্টর বাধাগ্রস্ত না হয়। সেটা এখনো মোটামুটি স্থিতিশীল আছে।”
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগে নিজ বাসভবনে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এখনো পর্যন্ত ‘ব্যবস্থাপনার’ মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের চাপ সামাল দিতে চেষ্টা করছে সরকার। তবে ভবিষ্যতের চাপ সামলাতে জনগণকেও ‘সংযমী’ হতে হবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি এই ধারাটাকে অব্যাহত রাখার জন্য; যুদ্ধ যদি বেশিদিন অব্যাহত থাকে, চাপটা বাড়তে থাকবে। সেই চাপটা আল্টিমেটলি জনগণের উপর আসবে। যেভাবে বিশ্বব্যাপী আসছে; সেটা বাংলাদেশেও আসবে।
“এটার জন্য জনগণের সমর্থন, সহযোগিতা, সহানুভূতি লাগবে; সংযম লাগবে। সবাই মিলে তো সমাধান করতে হবে। সরকার সরকারের পক্ষ থেকে সবকিছু করছে। আমরা জনগণের সহযোগিতা ও সহানুভূতি চাই এবং সংযমও আমাদের মধ্যে থাকতে হবে। সংযমের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে।”
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, “যুদ্ধ তো আমাদের হাতে নাই; যু্দ্ধ হচ্ছে অন্য জায়গায়। এটার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশে। সবদেশে কম-বেশি। বাংলাদেশে বেশি কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের জ্বালানির মূল সোর্সটা। আমাদের উপর চাপটা অনেক বেশি।
“আমরা জ্বালানিতেও চেষ্টা করছি। অল্টারনেটিভ অনেকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা জ্বালানি আনার চেষ্টা করেছি। কিছু কিছু শুরুও হয়েছে। এই পর্যন্ত একটা ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে আমরা মোটামুটি ভালো জায়গায় আছি।”
তিনি বলেন, “অলটারনেটিভ ব্যবস্থা চেষ্টা করছি, বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকিউর করার জন্য। আশা করছি, একটা ভালো ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব। বিশ্ব প্রেক্ষাপট, যুদ্ধ তো আর পরিবর্তন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এটা চাপ আসবেই। এর মধ্যেই আমাদের এটার সমাধান সকলকে মিলে করতে হবে।
“আমাদের সবকিছু ব্যবহারে সংযমী হতে হবে। এটা কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। যুদ্ধের সমস্যার প্রতিফলন প্রত্যেকটা দেশে হচ্ছে। সবাই মিলে এটার সমাধান করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনায় সবদিকে চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দেশের মধ্যেও আমাদের অনেকটা স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করছি পুরো বিষয়টাকে একটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় কি না। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সবাই দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। এখানে হলি ডে বলে কিছু নেই।
“কিছু উদাহরণ সেট করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চলাফেরায় যে সিম্পলিসিটি। সাধারণ মানুষের কাছে কিছু বার্তা দেওয়া হচ্ছে, অপচয়-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে চলমান রাখতে হলে বিগত দিনে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেটা করতে দেওয়া যাবে না। অপচয় করতে দেওয়া যাবে না।”
নতুন সরকার যে অর্থনীতি পেয়েছে, তাতে সবকিছুর মানদণ্ড ‘নিম্নগতির’ মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “দারিদ্রতা বাড়ছে, চাকরি কমছে, বিনিয়োগ কমছে। সার্বিকভাবে যে অর্থনীতি আমরা হাতে পেয়েছি, এটা নিম্নগতির অর্থনীতি। খুবই নিম্ন পর্যায়ে এটা স্যাটেল করেছে।
“এবং তার উপরে এই যুদ্ধ। এটা আরো কঠিন হয়ে গেছে আমাদের জন্য। তার মধ্যে আমি মনে করি, আমরা এই পর্যন্ত যে ম্যানেজমেন্ট সবকিছু করা হয়েছে আপনারা লক্ষ্য করেছেন। এর মধ্যে তেলের দাম কিন্তু বাড়ানো হয়নি। অনেক দেশে কিন্তু তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যেহেতু স্কারসিটির কারণে।”
আমির খসরু বলেন, “আপনারা লক্ষ্য করবেন, এই ঈদের সময় তেলের সরবরাহ- যানবাহন, পরিবহন; তেলের কারণে কেউ আটকে ছিল না। সবাই যার যার গন্তব্যস্থলে সঠিক সময়ে, পরিবহন ব্যবস্থা সচল ছিল। তাদের তেলের কোনো সংকট হয় নাই।
“ভাড়াও কিন্তু বৃদ্ধি করতে পারে নাই। আমাদের কাছে এ পর্যন্ত কোনো রিপোর্ট নাই, যেখানে ভাড়া বৃদ্ধি হয়েছে। সেক্ষেত্রেও আমরা একটা ভালো অবস্থানে ছিলাম।
“প্রত্যেকবার রমজানের সময় ঈদের আগে, গার্মেন্টেসের কর্মীদের শ্রমিকদের বেতন ভাতা দিতে না পারার কারণে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ, সড়ক অবরোধ, মিল কারখানা ভাংচুর। এবার কিন্তু আগেভাগে শ্রমিকরা বেতন ভাতা যাতে পায়, সে ব্যবস্থা করেছি। কোনো জায়গায় গার্মেন্টেসের শ্রমিকদের বেতন-ভাতার সমস্যা এবার পাইনি।”
পরিবহন ব্যয় সারা পৃথিবীতে বেড়ে গেলেও দেশে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রয়েছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা মনে করি অর্থনীতি, জনগণের উপরে সেরকমের চাপ সৃষ্টি হয়নি। আমরা এখনো জনগণকে যেমন- তেলের মূল্য বৃদ্ধি করি নাই, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয় নাই, বাসের ভাড়া বৃদ্ধি হয় নাই, শ্রমিকদের বেতন ভাতা ইত্যাদি তারা সময়মত পেয়ে গেছে। মোটামুটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি এটাকে ধরে রাখার জন্য।
“সবাই ভালো ঈদ করছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সরকার আসার পরে সবার মনজগতে যে প্রত্যাশা ছিল, সেটা পূরণ হয়েছে। তাদের নির্বাচিত সংসদ-সরকার হয়েছে। এরকম সময়ে প্রথম ঈদটাও একটা মুক্ত অবস্থায় মনে হচ্ছে।”
এসময় চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জিয়াউদ্দীন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা উপস্থিত ছিলেন।