সাহাবায়ে কেরামের ঈদ: যে আদর্শে কাটত তাঁদের উৎসবের দিনগুলো
‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আনন্দ বা উৎসব। মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরে এই আনন্দের দিন দুটি উপহার হিসেবে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। ইসলামের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়গুলোতে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতার সঙ্গে এই দিনগুলো উদযাপন করতেন। তাদের ঈদ উদযাপনে যেমন ছিল বিনোদন, তেমনি ছিল মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
মদিনায় হিজরতের পর বিশ্বনবী (সা.) দেখলেন, মদিনাবাসীরা বছরে দুটি নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ উৎসব পালন করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের এই উৎসবের ভিত্তি জানতে চাইলে তারা একে প্রাচীন রীতিনীতি বলে উল্লেখ করে। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই দুই দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন-তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। (আবু দাউদ)
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে ঈদ যেভাবে আসত, তার কিছু উল্লেখযোগ্য দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরামের প্রধান কাজ ছিল তাকবিরের মাধ্যমে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা। সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম রাস্তাঘাটে ও ঈদগাহে যাওয়ার পথে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করে ঈদের আনন্দ প্রকাশ করতেন।
ঈদের দিনের প্রধান আমল ছিল জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা। রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ঈদগাহে সমবেত হতেন। এটি কেবল একটি ইবাদত ছিল না, বরং ছিল মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য মিলনমেলা।
বর্তমান সময়ের ‘ঈদ মোবারক’ বলার চেয়ে সাহাবায়ে কেরামের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ভাষা ছিল আরও অর্থবহ। তারা একে অপরকে দেখে বলতেন- ‘তাকব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করে নিন। এই দোয়ার মাধ্যমে তারা একে অপরের কল্যাণ কামনা করতেন।
সুন্নত অনুসরণে সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন সকালে মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। এটি ছিল দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একটি প্রতীকী উদযাপন।
ইসলামে বৈধ বিনোদনের সুযোগ রয়েছে, যা সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে স্পষ্ট। ঈদের দিনে তারা বর্শা ও ঢালের খেলা কিংবা তীরন্দাজি উপভোগ করতেন। এমনকি কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, সাহাবারা নিজেদের মধ্যে তরমুজ ছুড়ে মেরে আনন্দ করতেন। তবে এসবের মূল লক্ষ্য ছিল সুস্থ বিনোদন, যা শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করত না।
ঈদের খুশি কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন না সাহাবারা। রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছিলেন যেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো ওই দিন অভুক্ত না থাকে। নামাজের আগেই তারা এই দান সম্পন্ন করতেন যেন দরিদ্ররাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে।
ঈদের দিনে পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে সাহাবায়ে কেরাম বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। কারণ, আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখলে রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি পায় বলে হাদিসে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
বস্তুত, সাহাবায়ে কেরামের ঈদ উদযাপন ছিল ইবাদত ও আনন্দের এক অপূর্ব সমন্বয়। আধুনিক সময়েও তাদের এই আদর্শ অনুসরণ করলে ঈদ হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি অর্থবহ ও কল্যাণকর।