মঙ্গলবার ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ১৪ ১৪৩২, ০৮ শা'বান ১৪৪৭

জাতীয়

চট্টগ্রামের তিন নদী ও এক খালে ১৬৯ ডলফিন

 প্রকাশিত: ১২:০২, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬

চট্টগ্রামের তিন নদী ও এক খালে ১৬৯ ডলফিন

কর্ণফুলী নদীর সাইলো জেটি ঘাটের কাছে মাঝ নদীতে হঠাৎ ভেসে উঠল একটি ডলফিন; ঢেউ তুলে মুহূর্তেই আবার তলিয়ে গেল।

জেটি ঘাটের অপর পাড়ের ডাঙার চরের দিক থেকে আসছিল একটি মাঝারি আকারের নৌকা, এপারের ভেড়ানো ছিল একটি লাইটার জাহাজ। আর কোনো নৌযানের চলাচল ছিল না তখন নদীতে।

সোমবার সকালের এই দৃশ্য যে কারও মন ভালো করে দেওয়ার মতই। নদীর ঘাট শ্রমিকরাও বলছেন, শীতে কর্ণফুলীতে এমন দৃশ্য মাঝেমধ্যেই তারা দেখতে পান।

গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত এক জরিপের ফল বলছে, চট্টগ্রামের তিন নদী কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গুর মধ্যে কর্ণফুলীতে গাঙ্গেয় ডলফিনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বন বিভাগ ও ‘ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি’ (ডব্লিউসিএস) ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৪৫টি নদীর ৪ হাজার ৮৯৩ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়েছে। তাতে দেখা গেছে, দেশের নদীপথে ৮৭৯ দলের মোট ২ হাজার ৩০৭টি ডলফিনের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে।

এর মধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নদী এবং কর্ণফুলী ও সাঙ্গুকে সংযুক্তকারী মুরারী খালের ১৮০ কিলোমিটার জরিপ করে ১৬৯টি ডলফিনের সন্ধান পেয়েছে জরিপকারী দল।

কোথায় কত ডলফিন

বাংলাদেশ বন বিভাগ ২০২২ সালে ‘বাংলাদেশের গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিনের বিচরণচিত্র’ নামে একটি সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে।

সেই প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত (শীত মৌসুমে) হালদা নদীর কর্ণফুলীর সঙ্গে সংযোগের স্থান থেকে সাত্তারঘাট পর্যন্ত অংশে ৫০টি ডলফিন শনাক্ত করা হয়।

অপরদিকে কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু (কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু) অংশ থেকে হালদার মুখ পর্যন্ত অংশে মাত্র পাঁচটি ডলফিন দেখা যায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তবে জরিপকারী দলটি সাঙ্গু নদীতে কোনো ডলফিনের দেখা পায়নি।

২০২৪-২৫ সালে জরিপ পরিচালনাকারী ডব্লিউসিএস এর বাংলাদেশ প্রোগ্রামের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে উজানে প্রায় ৬৯ কিলোমিটার পর্যন্ত আমরা জরিপ করেছি। এর মধ্যে মোহনা থেকে হালদার সংযোগস্থল পর্যন্ত অংশে সবচেয়ে বেশি গাঙ্গেয় ডলফিন শনাক্ত হয়েছে।

“এর পরের অংশে অর্থাৎ হালদার মুখ থেকে উজানের দিকে মাত্র দুয়েকটি ডলফিন দেখেছি। কর্ণফুলী নদীর জরিপ করা অংশে শনাক্ত ডলফিনের সংখ্যা ৫৮টি।”

অপরদিকে হালদা নদীর মোহনা থেকে উজানে প্রায় ৩২ কিলোমিটার অংশে জরিপ করে ৫০টি ডলফিন শনাক্ত করার কথা বলেন জাহাঙ্গীর আলম।

তিনি বলেন, কর্ণফুলী নদীর মোহনা, অর্থাৎ পতেঙ্গা অংশ থেকে হালদার মোহনা পর্যন্ত অংশে ডলফিনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কর্ণফুলী নদী হালদার তুলনায় প্রশস্ত। তবে কর্ণফুলী নদীর শুধু এই অংশে এত সংখ্যক ডলফিনের উপস্থিতি বেশ ইতিবাচক।

চট্টগ্রামের আরেক নদী সাঙ্গুর ৪৯ কিলোমিটার অংশে জরিপ চালিয়ে ৪৫টি ডলফিনের সন্ধান পায় জরিপকারী দল। আর কর্ণফুলী ও সাঙ্গু এই দুই নদীর মধ্যে সংযোগকারী মুরারী খালের ৩০ কিলোমিটার অংশ জরিপ চালিয়ে ১৬টি ডলফিনের সন্ধান পায় তারা।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “তিন নদী ও একটি খালের ১৮০ কিলোমিটার অংশে জরিপ চালিয়ে মোট ১৬৯টি ডলফিন শনাক্ত করেছি আমরা। কর্ণফুলী ও হালদা সরাসরি সংযুক্ত এবং কর্ণফুলী মুরারী খালের মাধ্যমে সাঙ্গু নদীর সঙ্গেও যুক্ত। ফলে এসব ডলফিন এক নদী থেকে অন্য নদীতে চলাচল করে।”

সারা দেশে পরিচালিত এই জরিপে ডলফিনের প্রতিটি দলে সর্বনিম্ন একটি থেকে সর্বোচ্চ ১১টি পর্যন্ত ডলফিনের দেখা পান জরিপকারীরা। আর চট্টগ্রামের তিন নদীতে ডলফিনের প্রতিটি দলে গড়ে চার-পাঁচটি করে ডলফিন ছিল বলে জানান তিনি।

বেশি দেখা যায় শীতে

চট্টগ্রামের নদীগুলোতে শীতের সময়ে ডলফিন বেশি দেখতে পাওয়ার কথা বলছেন হালদা নদী রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা মো. আমিনুল ইসলাম মুন্না।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০০০ সাল বা এর পরেও শীতে হালদা নদীতে বেশ ঘন ঘন ডলফিন দেখা যেত। এখন খুব কম দেখা যায়। গত কয়েক বছর বেশিরভাগ সময় উত্তর মাদার্শার বাড়ি ঘোনা ফাঁড়ির মুখ অংশে এবং খন্দকিয়া খালের মোহনায় ডলফিনের দেখা মিলেছে।

“দু-তিন বছর আগে শীত মৌসুমে কর্ণফুলী নদীর চাক্তাই খালের মুখ অংশে ডলফিনের দেখা মিলত বেশি।”

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “শীতে নদীতে পানি কম থাকে বলে ডলফিন দৃশ্যমান বেশি হয়। তাই গণনাও করা হয় শীত মৌসুমে।”

তিনি বলেন, “২০২৪-২৫ সালে পরিচালিত জরিপটি ‘ডাবল কনকারেন্ট কাউন্ট’ পদ্ধতিতে ‘মার্ক রিকেপচার টেকনিক’ ব্যবহার করে করা হয়। নদী পথে আমাদের দুটি দল থাকত। সামনে ও পিছনে থাকা দুটি দল বাইনোকুলারের মাধ্যমে নদীতে ভেসে ওঠা ডলফিন শনাক্ত করত এবং তারপর মার্ক রিকেপচার মেথডে গণনা করা হত।”

‘বিপদ বেশি কর্ণফুলীতে’

চট্টগ্রামের তিন নদীর মধ্যে কর্ণফুলীতে ডলফিনের সংখ্যা বেশি শনাক্ত হলেও এই নদীতে বিপদও বেশি তাদের।

ডব্লিউসিএস এর বাংলাদেশ প্রোগ্রামের কান্ট্রি ডিরেক্টর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কর্ণফুলী নদী হালদার তুলনায় প্রশস্ত হলেও এখানে প্রচুর জাহাজ চলাচল করে। এছাড়া কর্ণফুলীতে জরিপের সময় আমরা বেশ ড্রেজারও দেখতে পেয়েছি। সঙ্গে যোগ হয়েছে কারেন্ট জাল ও মিহি জালের বিপদ।

“ডলফিন চোখে দেখতে পায় না। শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে পানিতে চলাচল করে। কিন্তু চিকন সুতার কারেন্ট জাল বা মিহি জালের উপস্থিতি তারা টের পায় না। একারণে জালে আটকা পড়ে মারা যায়। আর শ্বাস নেয়ার জন্য কিছু সময় পরপর ডলফিনকে ভেসে উঠতে হয়। নৌযান ও ড্রেজারে ধাক্কা খেয়েও ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে।”

হালদাতেও মাছ ধরার জাল এবং নৌযান চলাচলকে ডলফিনের জন্য বিপদের কারণ বলছেন এ গবেষক।

হালদা রক্ষার আন্দোলনকারী আমিনুল ইসলাম মুন্না বলেন, “হালদায় মাছ ধরার জালে এবং নৌযানের ধাক্কায় নিয়মিতই ডলফিন মারা পড়ছে। এ ছাড়া কর্ণফুলীতেও কয়েক বছর আগে মৃত ডলফিন পাওয়া গিয়েছিল। ডলফিন রক্ষা করতে হলে এদের প্রতিকূলতাগুলো অপসারণ করতে হবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত হালদায় ৪৭টি ডলফিনের মরদেহ পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে যুক্ত ছন্দারিয়া খালে একটি মৃত ডলফিন পাওয়া গিয়েছিল।