জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপতির সই করা এই অধ্যাদেশ জারি করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অধ্যাদেশে বলা হয়, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে, যা পরবর্তীকালে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আত্মরক্ষাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
যেহেতু উপরি-উক্ত প্রতিরোধকর্মে এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী গণঅভ্যুত্থানকারীদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৬ অনুযায়ী সুরক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন, এবং যেহেতু সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় রয়েছে ও রাষ্ট্রপতির নিকট তা সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে— সেহেতু সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করেন।
এই অধ্যাদেশ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে এবং অবিলম্বে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে এটি ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে বলবৎ হয়েছে বলে গণ্য হবে।
মামলা প্রত্যাহার ও নতুন মামলা দায়ের বারিত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা উপধারা (২)-এর বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে এবং ধারা ৫-এর বিধান সাপেক্ষে, এ সম্পর্কিত নতুন কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের আইনত বারিত থাকবে।
যেক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক এই মর্মে প্রত্যয়ন করা হয় যে, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে দায়ের করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকারনিযুক্ত কোনো আইনজীবী উক্ত প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন দাখিল করবেন। আবেদন দাখিলের পর আদালত উক্ত মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করবে না, তা প্রত্যাহারকৃত বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতো খালাসপ্রাপ্ত হবেন।
কতিপয় কার্য সংক্রান্ত অভিযোগ ও তদন্ত
কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন উক্ত অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫ সনের ৬২ নম্বর অধ্যাদেশ)-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, যেক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সেই ক্ষেত্রে কমিশন উক্ত প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে বর্তমানে বা পূর্বে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করবে না।
তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে গ্রহণ করার প্রয়োজন হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে কমিশনের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করবেন। এই উপধারায় ‘প্রতিষ্ঠান’ বা ‘বাহিনী’ বলতে বাংলাদেশের কোনো আইন দ্বারা বা আইনের অধীন প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে।
যেক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, সেক্ষেত্রে কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। পরবর্তীতে আদালত উক্ত প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
আর যেক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, সেক্ষেত্রে কমিশন উপযুক্ত মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কার্য সম্পর্কে কোনো আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না।
বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা
সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।