সরকারি দল সংস্কারের সঙ্গে প্রতারণা করেছে: নাহিদ
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে সরকারি দল বিএনপি ‘সংস্কারের সঙ্গে প্রতারণা’ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "একটি ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে, সংবিধানের দোহাই দেওয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে তারা শপথ নেননি।
“আমরা মনে করি, এটি সংস্কারের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। এটি নতুন বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা সে আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে এবং যে গণরায় এসেছে গণভোটে, সেই গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।"
বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ বলেন, "আমরা আশা করব, তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে শপথ নেবেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই জাতীয় সংসদের কোনো মূল্যই নাই।"
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে সংবিধান পরিবর্তন করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নিশ্চিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন নাহিদ।
তিনি বলেন, "তা না হলে বাংলাদেশ আসলে আগের বাংলাদেশই থাকবে। সেই স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামতে থাকবে, সেইআওয়ামী শেখ হাসিনার বাংলাদেশই কিন্তু আসলে থাকবে। জাস্ট অন্য মানুষরা এই দেশটাকে, এই রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে চালাবে। আমরা নিশ্চয় সেটা চাই না।"
চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা এবং সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি করে দেয়, তা কাজে লাগাতে ২০২৪ সালের শেষে এই সনদ করার দাবি তুলেছিলেন জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে।
এনসিপি ঐকমত্যের সংলাপে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত সনদ সইয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি ‘স্পষ্ট’ না হওয়ার যুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করে দলটি।
এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।এরপর গত ১৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সময় দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়।
ওই আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে এই আদেশ জারির পর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ীদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জিতে সংবিধান সংশোধন করার মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। অন্যদিকে গণভোটে জয়ী হয় ‘হ্যাঁ’ ভোট।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানালে নাটকীয়তা তৈরি হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ তাদের দলের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে এবং কোনো এরকম ফর্ম—এটা সংবিধানে নেই।
“এই ফর্মটি তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। এই রকম তখন একটা ফর্ম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে বিধায় আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত আমরা এসেছি।”
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি প্রথমে বলে, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নিলে তারা কোনো শপথই নেবে না। তবে পরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তারা দুটো শপথই নেয়।
তার আগের দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে এনসিপি।
'৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী মন্ত্রী নিজেদের স্বার্থরক্ষা করবেন'
বিগত উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব পালন করা নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘আঞ্চলিক বৈষম্য করে’ মন্ত্রিসভায় তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হয়নি এবং এ মন্ত্রিসভা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি’।
নতুন মন্ত্রীদের গড় বয়স যে ৬০ বছর, সে বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমরা যে তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশের কথা ভেবেছি, তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশের কথা বলেছি, জুলাইয়ে যে তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে; আমরা তার প্রতিফলন এই মন্ত্রিসভায় দেখতে পাইনি।
"সবচেয়ে অ্যালার্মিং যে বিষয়টা, এই মন্ত্রিসভায় প্রায় ৬২ শতাংশ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ব্যবসায়ী। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হওয়াটা অপরাধ নয় কিন্তু এটা প্রতিনিধিত্বমূলক হওয়া উচিত, রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ থাকা উচিত। কিন্তু যখন আপনি ৬২ শতাংশ অর্ধেকেরও বেশি ব্যবসায়ীদেরকে মন্ত্রিত্বে দিবেন, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তারা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।"
কোন মন্ত্রীর নাম না নিয়ে নাহিদ বলেন, "সবচেয়ে বড় বাজেটের মন্ত্রণালয়ে এমন একজনকে দেওয়া হল, যিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং হত্যা মামলার আসামি।… শুধুমাত্র আর্থিক, ব্যবসায়িক এবং দুর্নীতির কারণেই তাকে সে মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছে।"
'ঋণের সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা কবে ফেরত দেবে সরকারি দল?'
টিআইবির বরাতে নাহিদ বলেন, বিএনপির এমপিদের ৬২ শতাংশ ‘ঋণখেলাপি’ ও তাদের ‘১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা’ ঋণ রয়েছে।
"প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলছেন, কিন্তু তার নিজের মন্ত্রিসভা এবং তার নিজের যে সংসদ সদস্য, তাদের যে ঋণগ্রস্ত অবস্থা, সেই ঋণ তারা কবে পরিশোধ করবে? বাংলাদেশের মানুষ সেটা জানতে চায়, বাংলাদেশের জনগণ সেটা জানতে চায়।"