‘ভাই আমাকে মাফ করে দে’: ধোঁয়ায় মৃত্যুর আগে আদি
‘ভাই আমাকে মাফ করে দে।’
ভবনে আগুন লাগার পর নিচে নামতে না পেরে ফোনে বন্ধুকে এ কথা বলেছিলেন নিহত মুনতাসিন সোলায়মান আদি।
বৃহস্পতিবার সকালে কে বি আর্কেড প্লাজা নামে চট্টগ্রামের যে বহুতল শপিং মলে আগুন লেগেছিল, সেখানে ‘ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে’ মারা যাওয়া আদি ফোনে এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন তার বন্ধু ও দোকান মালিক মো. আসিফ।
আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে ওই মার্কেটে মারা যান ২৭ বছর বয়সি মুনতাসির সোলায়মান আদি ও মো. ইউনূস (৫২) নামে দুই জন। ধোঁয়ায় মামুন নামের আরেকজন আহত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে আদি ওই বিপণিবিতানের নিচ তলায় মিলানো সুজ নামে একটি দোকানে চাকরি করতেন; আর ইউনূস ছিলেন পাকিজা টেইলারিংয়ের দর্জি।
আদির বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার চরকানাই এলাকায়; আর ইউনূসের বাড়ি একই উপজেলার শান্তির হাটে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে নগরীর নগরীর লালদিঘী-আন্দরকিল্লা সড়কে টেরিবাজারের বক্সির বিটের বিপরীতে কে বি অর্কিড প্লাজা নামে ১২তলা ওই ভবনের চতুর্থ তলায় একটি দোকানে আগুন লাগে।
পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখান থেকে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া তিনজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। তাদের মধ্যে দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
১২ তলা বহুতল এ ভবনের পঞ্চম তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দোকান ও কারখানা। ষষ্ঠ তলায় মসজিদ এবং তার উপরে আবাসিক।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালে নেওয়া আহত তিন জনের শরীরে বাহ্যিক কোনো ক্ষতি হয়নি। ধোঁয়ায় তাদের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে।
“হাসপাতালে আনার আগেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত একজনকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।”
এদিকে দুজনের মৃত্যুর খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান নিহতদের স্বজন ও সহকর্মীরা।
নিহত আদির স্বজনরা জানান, প্রতিবছর রোজার সময় তিনি তার বন্ধুর দোকানে কাজ করেন। এবারও শবে বরাতের পর দোকানে কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
মিলানো সু’র মালিক মো. আসিফ জানান, নিহত আদি তার বন্ধু।
হাসপাতালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সকাল ১০টার দিকে আদি ফোন করে নিচে নামতে না পারার কথা জানান।
“সকাল ৯টার দিকে আদি নিচের দোকান থেকে উপরে মসজিদে গিয়েছিলেন নামাজ পড়তে। আগুন লাগার কারণে সে নামতে পারেনি,” বলেন আসিফ।
তিনি কান্না করতে করতে বলতে থাকেন, “আমার ভাই আমাকে ১০টায় ফোন করেছে। আমাকে বলছে ‘ভাই আমাকে মাফ করে দে…’। আমি তাকে বলেছি, তুই মসজিদের শেষ কোণায় গিয়ে মুখে পানি মার, আমি মানুষ উঠাচ্ছি।”
আসিফের অভিযোগ, আদির মসজিদে আটকে থাকার কথাটি তিনি ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা চারতলার উপরে আর উঠেননি।
“আগুন লেগেছে চার তলায়, আমি তাদের (ফায়ার সার্ভিস) বলেছি ছয় তলায় মানুষ আছে। তারা বলেছে কেউ নাই, আমরা দেখেছি। তারা বলছে আপনি উঠেন… আমি পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে আর পারি নাই। আমার বন্ধু গিয়ে বলেছে, সেখানে জুতা আছে। কিন্তু তারা কেউ উঠেনি। এর আরও আধা ঘণ্টা পর তারা সেখান থেকে তাকে বের করে আনেন।”
নিহত ইউনুসের সহকর্মী রূপক রুদ্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, মার্কেটের চতুর্থ তলায় তাদের শো-রুম এবং চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় দুটি কারখানা আছে।
ভোর পর্যন্ত পাশাপাশি মেশিনে বসে কাজ করেছিলেন জানিয়ে রুদ্র বলেন, “পঞ্চম তলার কারখানায় ভোর সোয়া ৪টার দিকে আমরা কয়েকজন বাসায় চলে যায়। আর ইউনূস প্রতিদিনের মত সেহেরি খেয়ে কারখানায় ঘুমিয়ে পড়েন। সেখানে ধোঁয়ায় আটকে পড়ে আর নিচে নামতে পারেননি তিনি।”
ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আগুনে অর্কিড প্লাজার চতুর্থ তলার টেইলারিং শপ, কাপড়ের দোকানসহ মোট সাতটি দোকান পুড়ে গেছে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি।
ওই বহুতল ভবনের বিভিন্ন তলায় তৈরি পোশাক, টেইলারিং শপ, কাপড়সহ বিভিন্ন দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ভবনের পঞ্চম তলা থেকে দুজন এবং ষষ্ঠতলা থেকে একজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।