মঙ্গলবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ফাল্গুন ১২ ১৪৩২, ০৭ রমজান ১৪৪৭

জাতীয়

সংসদে সভাপতিত্ব করবেন কে? বিএনপির ভাবনায় চার নাম

 প্রকাশিত: ১১:১৪, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সংসদে সভাপতিত্ব করবেন কে? বিএনপির ভাবনায় চার নাম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ বসছে; কিন্তু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এই অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন?

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে বিএনপি তাদের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার কথা ভাবছে। আইনজ্ঞরাও বলছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে সভাপতিত্বের দায়িত্ব দেওয়া যায়। এমন নজির দেশের সংসদের ইতিহাসে রয়েছে।

সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে প্রথম দিনের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

তারা বলেছেন, একাধিকবার নির্বাচিত কয়েকজন সদস্যের নাম ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একজনকে প্রথম দিনের বৈঠকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

বিএনপির ওই নেতারা বলছেন, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, জয়নুল আবদিন ফারুক ও হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তাদের মধ্যে হাফিজ উদ্দিন ও কায়কোবাদ মন্ত্রিসভার সদস্য।

এর আগে হাফিজ উদ্দিন জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ভোলা থেকে ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদে নির্বাচিত হন। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। এরপর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং এই দলের টিকেটে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ পর্যন্ত টানা তিন সংসদে নির্বাচিত হন। তিনি খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন।

কায়কোবাদ জাতীয় পার্টি থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ সংসদের আগে সর্বশেষ ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে জয় পান তিনি।

খন্দকার মোশাররফ কুমিল্লা থেকে বিএনপির টিকেটে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে। এরপর চার সংসদ নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। বিএনপি সরকারে একাধিকবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

জয়নুল আবদিন ফারুক নোয়াখালী থেকে পঞ্চম সংসদ থেকে নবম সংসদ পর্যন্ত টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য হয়েছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হয়। আদালতের নির্দেশে দুটি আসনের ফল ঘোষণা হয়নি এবং একটি আসনে ভোট স্থগিত রয়েছে।

ঘোষিত ফলাফলে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। তাদের মিত্ররা পেয়েছে তিনটি আসন। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয় পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে বিজয়ী হয়েছেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। এর আগে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হন।

তাদের অনুপস্থিতিতে গেল ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

সেদিনই সংসদ নেতা নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে প্রধানমন্ত্রী করে নতুন সরকার কাজ শুরু করেছে। তবে এখনো স্পিকার, উপনেতা ও চিফ হুইপ নির্ধারণ করেনি ক্ষমতাসীন দল।

সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। সেই সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠক বসছে।

রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির আহ্বানে নির্ধারিত দিনে সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেদিনই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।

সংবিধান অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।

ওইদিনই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সংসদের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে প্রবেশ করবে আইনসভা।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি সংসদে সভাপতিত্ব করতে পারবেন।

কার্যপ্রণালী বিধিতে সদস্যদের শপথ বিষয়ে বলা হয়েছে, “(১) সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফায় বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে, সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনের পূর্বে সংসদে নির্বাচিত প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে প্রদত্ত সংসদ-সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ফরমে বিদায়ী স্পিকারের এবং তার অনুপস্থিতিতে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকারের এবং উভয়ের অনুপস্থিতিতে বিদায়ী স্পিকার মনোনীত ব্যক্তির সম্মুখে এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকলে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনা ও সংসদে সভাপতিত্ব করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তির সম্মুখে শপথ গ্রহণ করবেন বা ঘোষণা করবেন এবং তাতে স্বাক্ষর করবেন।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম দিনের বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে এই সাংবিধানিক শূন্যতার অবসান হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের কী মত

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় প্রথম অধিবেশন পরিচালনা নিয়ে আইনি প্রশ্নও সামনে আসছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলছেন, স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কে অধিবেশন পরিচালনা করবেন, সে বিষয়ে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে এখানে এক ধরনের ‘আইনি শূন্যতা’ তৈরি হয়েছে।

এখন সমাধান কীভাবে হবে সেই প্রশ্নে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংসদ বসলে সদস্যরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে সভাপতিত্বের দায়িত্ব দিতে পারেন “

১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদের সময়ও এরকম পরিস্থিতিতে একজন সদস্যকে দিয়ে অধিবেশন পরিচালনার নজির রয়েছে, সে কথা বলেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে’ একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য স্পিকার নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত সংসদে সভাপতিত্ব করতে পারেন।

তার ভাষায়, “জ্যেষ্ঠ হলে সমঝোতা সহজ হয়, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।”

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার নির্বাচন করে পরিস্থিতির সমাধান করতে হবে।

“আগের সংসদের স্পিকার নেই, ডেপুটি স্পিকারও নেই। বসার জন্য এটিই একমাত্র অপশন।”

এই আইনজীবীর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্ধারিত দিনে বসে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে পারে।

প্রথম দিন কী হবে সংসদে

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের কার্যসূচি আগের সংসদগুলোর নজির অনুসারেই সাজানো হচ্ছে।

সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির আহ্বানে অধিবেশন শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যে ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকায় বৈঠকের শুরুতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত একজন সদস্য অথবা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে কোনো জ্যেষ্ঠ সদস্য সভাপতিত্ব করতে পারেন।

প্রথম দিনের বৈঠকে সাধারণত স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সরকারপক্ষ একজন প্রার্থী মনোনয়ন দেয় এবং তা কণ্ঠভোট বা ভোটাভুটির মাধ্যমে গৃহীত হয়। স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সভাপতির আসনে বসেন।

এরপর ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদের আলোচনার প্রেক্ষিতে এবার বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হতে পারেন।

প্রথম দিনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের নামও মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি প্রয়াত সংসদ সদস্য বা বিশিষ্ট নাগরিকদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা সংসদের একটি প্রচলিত প্রথা।

সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন। ভাষণের খসড়া আগেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরবর্তী কার্যদিবসে সেই ভাষণের ওপর আলোচনা চলে।

অতীত সংসদগুলোর প্রথম দিনের কার্যসূচি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অষ্টম, নবম, দশম ও একাদশ সংসদে একই ধারায় প্রথমে সভাপতিত্বের ব্যবস্থা, এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছে। দ্বাদশ সংসদের ক্ষেত্রেও প্রথম দিনেই স্পিকার নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছিল।