তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প: শব্দের অদৃশ্য শক্তি
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ৫: শক্তি
অধ্যায় ৫: শব্দের অদৃশ্য শক্তি
আশরাফ উল আসাদ
সেদিন সকালে ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই টেবিলের ওপর একটি ছোট্ট ঘণ্টা রাখলেন।
নুসরাত জাহান সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ম্যাডাম, আজ কি স্কুলে ঘণ্টা বাজানোর ক্লাস হবে?”
সবাই হেসে উঠল।
ম্যাডাম মুচকি হেসে বললেন, “আজ আমরা এমন একটি শক্তির গল্প শিখব, যাকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তোমরা প্রতিদিন শুনতে পাও।”
আনিশা মারজান অবাক হয়ে বলল, “চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শোনা যায়?”
“ঠিক তাই,” বললেন ফারজানা ম্যাডাম।
মেফতাহুল জান্নাত বলল, “তাহলে সেটা কি ভূতের শব্দ?”
আবাবিল আল আলিফ বলল, “আবার শুরু করল!”
পুরো ক্লাস হেসে উঠল।
ঘণ্টার রহস্য
ফারজানা ম্যাডাম ঘণ্টাটি হাতে নিয়ে বললেন, “শোনো।”
তিনি ঘণ্টায় হালকা করে আঘাত করলেন।
টিং... টিং... টিং...
মরিয়ম আক্তার বলল, “আমি শব্দ শুনতে পাচ্ছি!”
ম্যাডাম প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু শব্দটা কোথা থেকে এল?”
সাফুয়ান বলল, “ঘণ্টা থেকে!”
“খুব ভালো। কিন্তু ঘণ্টায় আঘাত করার পর কী হলো?”
সবাই একটু চুপ করে গেল।
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল, “ঘণ্টা কেঁপেছে!”
ম্যাডাম বললেন, “দারুণ! কোনো বস্তু কাঁপলে শব্দ তৈরি হতে পারে। এই শব্দ আমাদের কানে পৌঁছালে আমরা তা শুনতে পাই।”
আবু তালহা নিজের গলা ছুঁয়ে বলল, “তাহলে আমি কথা বলার সময়ও আমার গলা কাঁপে?”
“হ্যাঁ,” বললেন ম্যাডাম। “তোমাদের কথা, গান, পাখির ডাক, ঘণ্টার শব্দ—সবই শব্দের উদাহরণ।”
শব্দ কি শক্তি?
ফারজানা ম্যাডাম বোর্ডে বড় করে লিখলেন—
শব্দ শক্তি।
নুসরাত জাহান জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, শব্দকে শক্তি বলা হয় কেন?”
ম্যাডাম বললেন, “শব্দ তৈরি হওয়া এবং ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে শক্তির সম্পর্ক আছে। তাই শব্দও শক্তির একটি রূপ।”
তিনি বললেন, “তোমরা যখন কথা বলো, গান গাও, হাততালি দাও, ঘণ্টা বাজাও বা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাও, তখন শব্দ তৈরি হয়।”
মেফতাহুল বলল, “তাহলে আমাদের ক্লাসেও অনেক শক্তি আছে!”
ম্যাডাম হাসলেন, “হ্যাঁ, তবে পরীক্ষার সময় বেশি শব্দ করলে সেই শক্তি কিন্তু ম্যাডামের ধৈর্য কমিয়ে দিতে পারে!”
সবাই আবার হেসে উঠল।
হাততালির পরীক্ষা
ম্যাডাম বললেন, “চলো, এবার একটি ছোট্ট পরীক্ষা করি।”
তিনি সবাইকে দুই হাত সামনে আনতে বললেন।
“একবার জোরে হাততালি দাও।”
ঠাস!
পুরো শ্রেণিকক্ষ শব্দে ভরে গেল।
“এবার হাত দুটো আলতো করে মিলাও।”
টুপ!
শব্দ অনেক কম হলো।
সাফুয়ান বলল, “জোরে হাততালি দিলে বেশি শব্দ হয়!”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক বলেছ। হাতের নড়াচড়ার কারণে শব্দ তৈরি হয়।”
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল, “তাহলে হাততালিও শব্দ শক্তির একটা উদাহরণ!”
“একদম ঠিক।”
পাখির গান
টিফিনের সময় সবাই স্কুলের মাঠে গেল।
একটি গাছের ডালে বসে একটি পাখি ডাকছিল।
চিঁ চিঁ... চিঁ চিঁ...
মরিয়ম আক্তার বলল, “ম্যাডাম, পাখিটাও তো শব্দ তৈরি করছে!”
“অবশ্যই,” বললেন ফারজানা ম্যাডাম।
নুসরাত বলল, “আমরা শুনতে পাচ্ছি কারণ পাখির ডাক আমাদের কানে পৌঁছাচ্ছে।”
ম্যাডাম বললেন, “খুব ভালো। শব্দ আমাদের চারপাশের অনেক ঘটনা সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।”
পাখি কোথায় আছে তা অনেক সময় দেখা না গেলেও তার ডাক শুনে আমরা বুঝতে পারি যে কাছাকাছি কোনো পাখি আছে।
শব্দের নানা উৎস
ফারজানা ম্যাডাম সবাইকে চারপাশের শব্দ শুনতে বললেন।
কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কেউ শুনল গাড়ির হর্ন।
কেউ শুনল মানুষের কথা।
কেউ শুনল পাখির ডাক।
দূরে কোথাও স্কুলের ঘণ্টা বাজল।
একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে গান শোনা গেল।
ম্যাডাম বললেন, “দেখলে? আমাদের চারপাশে শব্দের কত উৎস!”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
মানুষের কথা — গান — পাখির ডাক — ঘণ্টা — হর্ন — বাদ্যযন্ত্র
“এসব থেকেই আমরা নানা ধরনের শব্দ শুনতে পাই।”
শব্দ না থাকলে কী হতো?
আনিশা মারজান হঠাৎ বলল, “ম্যাডাম, পৃথিবীতে যদি কোনো শব্দই না থাকত?”
ফারজানা ম্যাডাম একটু থেমে বললেন, “তাহলে পৃথিবী অনেক অদ্ভুত নীরব হয়ে যেত।”
আবাবিল বলল, “মা আমাকে ডাকলেও শুনতে পেতাম না!”
আবু তালহা বলল, “স্কুলের ঘণ্টাও শুনতাম না!”
সাফুয়ান বলল, “গাড়ির হর্নও শুনতাম না।”
ম্যাডাম বললেন, “ঠিক তাই। শব্দ আমাদের যোগাযোগ ও আশপাশের অনেক ঘটনা বুঝতে সাহায্য করে।”
শব্দের ভালো ব্যবহার
ফারজানা ম্যাডাম এবার একটু গম্ভীর হলেন।
“তবে সব শব্দ আমাদের জন্য আরামদায়ক নয়। খুব জোরে শব্দ হলে কানে অস্বস্তি হতে পারে।”
মেফতাহুল বলল, “যেমন খুব জোরে হর্ন?”
“হ্যাঁ। খুব জোরে গান বা মাইকও বিরক্তিকর হতে পারে।”
নুসরাত বলল, “তাহলে আমাদের শব্দ করার সময় অন্যদের কথাও ভাবতে হবে।”
“অবশ্যই,” বললেন ম্যাডাম। “আনন্দ করার সময়ও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন অন্যের অসুবিধা না হয়।”
শব্দ গোয়েন্দা অভিযান
পরের দিন ফারজানা ম্যাডাম ক্লাসে একটি মজার খেলা চালু করলেন।
তিনি বললেন, “আজ তোমরা সবাই হবে শব্দ গোয়েন্দা!”
সবাই উত্তেজিত।
প্রত্যেকে নিজের চারপাশে শোনা শব্দের তালিকা করবে।
নুসরাত লিখল—পাখির ডাক।
আনিশা লিখল—মানুষের কথা।
মেফতাহুল লিখল—ঘণ্টার শব্দ।
আবাবিল লিখল—গাড়ির হর্ন।
সাফুয়ান লিখল—ফ্যানের শব্দ।
আসাদুল্লাহ আল গালিব লিখল—দরজা খোলার শব্দ।
আবু তালহা লিখল—হাততালির শব্দ।
মরিয়ম আক্তার লিখল—গানের শব্দ।
ম্যাডাম বললেন, “চমৎকার! তোমরা বুঝতে পেরেছ যে শব্দ আমাদের চারপাশে সব সময় রয়েছে।”
একটি ছোট্ট প্রশ্ন
ফারজানা ম্যাডাম শেষবারের মতো ঘণ্টাটি হাতে নিলেন।
তিনি ঘণ্টায় আঘাত করলেন।
টিং...
শব্দ ধীরে ধীরে কমে গেল।
ম্যাডাম বললেন, “শুরুতে শব্দ বেশি শোনা গেল, তারপর ধীরে ধীরে কমে গেল। কেন?”
সবাই চিন্তা করতে লাগল।
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল, “হয়তো ঘণ্টার কাঁপুনি ধীরে ধীরে কমে গেছে!”
ম্যাডাম হাসলেন।
“একদম ঠিক। কোনো কিছু কাঁপলে শব্দ তৈরি হতে পারে, আর কাঁপুনি থেমে গেলে শব্দও থেমে যায়।”
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ম্যাডাম জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ আমরা জানলাম শব্দ শক্তির একটি রূপ। কিন্তু এখন ভাবো—সূর্য যদি না থাকত, তাহলে পৃথিবীতে আলো ও তাপ কোথা থেকে আসত?”
সবাই চুপ।
নুসরাত ধীরে ধীরে বলল, “সূর্য কি তাহলে শুধু আলোই দেয় না?”
ফারজানা ম্যাডাম রহস্যময় হাসি দিয়ে বললেন, “পরের অধ্যায়ে তোমরাই খুঁজে বের করবে—কেন সূর্যকে শক্তির মহারাজা বলা হয়!”
চলবে...
অধ্যায়ের শেষে ১০টি MCQ
১. শক্তির একটি রূপ কোনটি?
ক) শব্দ শক্তি
খ) কাগজ
গ) পাথর
ঘ) মাটি
উত্তর: ক) শব্দ শক্তি
২. শব্দ কীভাবে তৈরি হতে পারে?
ক) কোনো বস্তু কাঁপলে
খ) কোনো বস্তু না নড়লে
গ) অন্ধকার হলে
ঘ) পানি জমলে
উত্তর: ক) কোনো বস্তু কাঁপলে
৩. নিচের কোনটি শব্দের উৎস?
ক) ঘণ্টা
খ) বই
গ) খাতা
ঘ) পেন্সিল
উত্তর: ক) ঘণ্টা
৪. পাখির ডাক কীসের উদাহরণ?
ক) শব্দ
খ) আলো
গ) তাপ
ঘ) বিদ্যুৎ
উত্তর: ক) শব্দ
৫. আমরা শব্দ কী দিয়ে শুনি?
ক) চোখ
খ) কান
গ) নাক
ঘ) হাত
উত্তর: খ) কান
৬. নিচের কোনটি মানুষের তৈরি শব্দের উদাহরণ?
ক) মানুষের কথা
খ) পাখির ডাক
গ) বজ্রপাতের শব্দ
ঘ) ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক
উত্তর: ক) মানুষের কথা
৭. খুব জোরে শব্দ হলে কী হতে পারে?
ক) কানে অস্বস্তি হতে পারে
খ) অন্ধকার হয়ে যায়
গ) পানি বরফ হয়ে যায়
ঘ) সূর্য নিভে যায়
উত্তর: ক) কানে অস্বস্তি হতে পারে
৮. হাততালি দিলে কী তৈরি হয়?
ক) শব্দ
খ) বরফ
গ) মাটি
ঘ) আলো
উত্তর: ক) শব্দ
৯. নিচের কোনটি শব্দের একটি ব্যবহার?
ক) যোগাযোগ
খ) কাপড় শুকানো
গ) খাবার রান্না
ঘ) ঘর গরম করা
উত্তর: ক) যোগাযোগ
১০. ঘণ্টায় আঘাত করার পর শব্দ ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার একটি কারণ কী?
ক) ঘণ্টার কাঁপুনি কমে যায়
খ) আলো কমে যায়
গ) বাতাস বন্ধ হয়ে যায়
ঘ) সূর্য ডুবে যায়
উত্তর: ক) ঘণ্টার কাঁপুনি কমে যায়