তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প : পানির রাজ্যের মেরুদণ্ডীরা
তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ২: প্রাণী পরিচিতি
অধ্যায় ৫: পানির রাজ্যের মেরুদণ্ডীরা
সকালের বিজ্ঞান ক্লাস।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নিজেদের আসনে বসে আছে। কিন্তু আজ কারও মন বইয়ের পাতায় নেই।
কারণ ফারজানা মরিয়ম ম্যাডাম ঘোষণা করেছিলেন,
“আজকের বিজ্ঞান ক্লাস হবে শ্রেণিকক্ষের বাইরে।”
মেফতাহুল জান্নাত সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল,
“ম্যাডাম, আমরা কি মাঠে যাব?”
“হয়তো।”
“পুকুরে?”
ম্যাডাম একটু রহস্যময়ভাবে বললেন,
“আজ তোমাদের নিয়ে যাব পানির রাজ্যে।”
মেফতাহুলের চোখ চকচক করে উঠল।
“সেখানে কি রাজা আছে?”
সাফুয়ান বলল,
“মাছই তো পানির রাজা!”
ফারজানা মরিয়ম হাসলেন।
“আজ তোমরাই খুঁজে বের করবে পানির রাজ্যে কারা বাস করে এবং তারা কীভাবে বেঁচে থাকে।”
পুকুরের ধারে অভিযান
কিছুক্ষণ পর সবাই স্কুলের পুকুরের পাশে এসে দাঁড়াল।
পুকুরের পানিতে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে।
পানির নিচে ছোট-বড় কয়েকটি মাছ ছুটে বেড়াচ্ছে।
নুসরাত জাহান চিৎকার করে বলল,
“ওই দেখুন! মাছ!”
আনিশা মারজান বলল,
“একটা নয়, অনেকগুলো!”
আবাবিল আল আলিফ পানির দিকে ঝুঁকে বলল,
“ওরা এত দ্রুত সাঁতার কাটছে কীভাবে?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এই প্রশ্নের উত্তরই আজকের আমাদের প্রথম রহস্য।”
তিনি বোর্ডের বদলে এবার একটি ছোট নোটবুকে লিখলেন—
মাছ
তার নিচে লিখলেন—
মেরুদণ্ডী প্রাণী
মাছ কি মেরুদণ্ডী?
আসাদুল্লাহ আল গালিব জিজ্ঞেস করল,
“ম্যাডাম, মাছ কি সত্যিই মেরুদণ্ডী?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু মাছের মেরুদণ্ড তো আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই না।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক। মাছের দেহের ভেতরে মেরুদণ্ড রয়েছে। তাই মাছ মেরুদণ্ডী প্রাণী।”
মরিয়ম আক্তার বলল,
“তাহলে মাছ অমেরুদণ্ডী নয়?”
“না। মাছ মেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি প্রধান দল।”
মাছের দেহের নকশা
ম্যাডাম মাছের একটি ছবি বের করলেন।
ছবিতে মাছের দেহের বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করা হলো।
তিনি বললেন,
“মাছের দেহ পানিতে চলাফেরার উপযোগী। এর দেহ সাধারণত লম্বাটে ও মসৃণ ধরনের হয়।”
সাফুয়ান বলল,
“তাই বুঝি মাছ সহজে পানির মধ্যে চলে?”
“হ্যাঁ। দেহের গঠন তাকে পানিতে চলতে সাহায্য করে।”
ম্যাডাম ছবিতে দেখিয়ে বললেন,
“মাছের পাখনাগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
পাখনার কাজ
আবু তালহা বলল,
“মাছের পাখনা আমরা আগের অধ্যায়ে শিখেছিলাম।”
“ঠিক।”
“পাখনা দিয়ে মাছ সাঁতার কাটে।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“পাখনা মাছকে সাঁতার কাটতে, দিক পরিবর্তন করতে এবং পানিতে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।”
মেফতাহুল বলল,
“তাহলে পাখনা মাছের স্টিয়ারিং!”
ম্যাডাম হাসলেন।
“তুলনাটা বেশ ভালো। পাখনা মাছের চলাফেরায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
মাছের আঁশ
নুসরাত মাছটির ছবি ভালো করে দেখছিল।
“ম্যাডাম, মাছের গায়ে ছোট ছোট দাগের মতো কী?”
“ওগুলো আঁশ।”
আনিশা বলল,
“সব মাছের কি একই রকম আঁশ?”
“সব মাছের দেহের আবরণ এক রকম নয়। তবে অনেক মাছের দেহ আঁশে আবৃত থাকে।”
ম্যাডাম বললেন,
“আঁশ মাছের দেহকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।”
মরিয়ম বলল,
“তাহলে মাছের শরীরের বাইরের অংশও তার জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত।”
“ঠিক।”
পানিতে শ্বাস নেওয়ার রহস্য
হঠাৎ আবাবিল প্রশ্ন করল,
“ম্যাডাম, একটা কথা বুঝতে পারছি না।”
“কী?”
“আমরা বাতাস থেকে শ্বাস নিই। কিন্তু মাছ তো পানির মধ্যে থাকে। মাছ কীভাবে শ্বাস নেয়?”
সবাই চুপ হয়ে গেল।
ফারজানা মরিয়ম হাসলেন।
“এই তো আজকের সবচেয়ে বড় রহস্য!”
মেফতাহুল বলল,
“মাছ কি পানির বোতল নিয়ে ঘোরে?”
সবাই হেসে ফেলল।
ম্যাডাম বললেন,
“না। মাছের রয়েছে বিশেষ অঙ্গ—ফুলকা।”
ফুলকার কাজ
ফারজানা মরিয়ম একটি মাছের ছবিতে ফুলকার অবস্থান দেখালেন।
“মাছ ফুলকার সাহায্যে পানিতে থাকা দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে শ্বাসকার্য চালায়।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“মানে মাছ পানির মধ্যে থেকেও অক্সিজেন পায়?”
“হ্যাঁ।”
নুসরাত বলল,
“প্রকৃতি সত্যিই আশ্চর্য!”
ম্যাডাম বললেন,
“প্রতিটি প্রাণীর দেহ তার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ উদাহরণ।”
একটি ছোট পর্যবেক্ষণ
ফারজানা মরিয়ম শিক্ষার্থীদের বললেন,
“এখন সবাই পুকুরের মাছের চলন পর্যবেক্ষণ করো।”
সবাই চুপ করে পানির দিকে তাকাল।
একটি মাছ সামনে গেল।
তারপর হঠাৎ ডানদিকে ঘুরল।
তারপর আবার নিচের দিকে গেল।
সাফুয়ান বলল,
“ও দিক পরিবর্তন করছে!”
আনিশা বলল,
“পাখনা ব্যবহার করছে।”
ম্যাডাম বললেন,
“ঠিক। মাছের বিভিন্ন পাখনা তার চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।”
মাছ কি শুধু রুই?
মেফতাহুল জিজ্ঞেস করল,
“মাছ মানেই কি রুই?”
“না।”
ম্যাডাম কয়েকটি ছবির কার্ড বের করলেন।
রুই।
ইলিশ।
কাতলা।
পাঙ্গাশ।
তিনি বললেন,
“পৃথিবীতে অসংখ্য ধরনের মাছ রয়েছে।”
আবু তালহা বলল,
“ইলিশও মেরুদণ্ডী?”
“হ্যাঁ।”
“রুই?”
“হ্যাঁ।”
“সব মাছ?”
ম্যাডাম বললেন,
“মাছ হলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি বড় দল।”
মাছ কোথায় থাকে?
মরিয়ম জিজ্ঞেস করল,
“মাছ কি শুধু পুকুরে থাকে?”
“না।”
“তাহলে কোথায়?”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“অনেক মাছ নদী, খাল, বিল, হ্রদ ও সমুদ্রে বাস করে।”
নুসরাত বলল,
“অর্থাৎ সব মাছের বাসস্থান পানি।”
“মাছ জলজ প্রাণী। তবে বিভিন্ন মাছ বিভিন্ন ধরনের জলীয় পরিবেশে বাস করে।”
স্থল আর জল
ম্যাডাম বললেন,
“তোমরা যদি একটি মাছকে দীর্ঘ সময় ডাঙায় রাখো, কী হবে?”
সাফুয়ান বলল,
“মাছ বাঁচতে পারবে না।”
“কেন?”
আবাবিল বলল,
“মাছ পানির পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য উপযোগী।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক। মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস ও চলাফেরা পানির পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।”
মাছের শরীরের গোপন অস্ত্র
ফারজানা মরিয়ম এবার বোর্ডে লিখলেন—
মাছের সাফল্যের তিন রহস্য
১. পাখনা
২. ফুলকা
৩. দেহের গঠন
ম্যাডাম বললেন,
“পাখনা মাছকে চলতে সাহায্য করে।”
“ফুলকা শ্বাসকার্যে সাহায্য করে।”
“আর দেহের গঠন পানিতে চলাচলের উপযোগী।”
মেফতাহুল বলল,
“মাছ যেন পানির জন্য তৈরি করা বিশেষ যান!”
ম্যাডাম বললেন,
“বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, মাছের দেহ পানিতে জীবনযাপনের জন্য উপযোগী।”
মাছের সঙ্গে ব্যাঙের পার্থক্য
আনিশা হঠাৎ বলল,
“ম্যাডাম, ব্যাঙও তো পানিতে থাকে। তাহলে ব্যাঙও কি মাছ?”
সবাই একটু চমকে গেল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“না। ব্যাঙ মাছ নয়।”
“কেন?”
“ব্যাঙ মেরুদণ্ডী প্রাণী হলেও এটি উভচর প্রাণী। তার জীবনযাপনের ধরন মাছের চেয়ে আলাদা।”
মরিয়ম বলল,
“তাহলে মেরুদণ্ডী হওয়া মানেই মাছ হওয়া নয়।”
“একদম ঠিক।”
পাঁচটি দরজা
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে আবার লিখলেন—
মাছ
উভচর
সরীসৃপ
পাখি
স্তন্যপায়ী
তিনি বললেন,
“এগুলো হলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের পাঁচটি প্রধান দল।”
নুসরাত বলল,
“আজ আমরা প্রথম দরজা—মাছ—সম্পর্কে জানলাম।”
“ঠিক।”
মেফতাহুল বলল,
“পরের দরজায় ব্যাঙ আছে?”
ম্যাডাম হাসলেন।
“হ্যাঁ। পরের অধ্যায়ে আমরা যাব এমন এক প্রাণীর জগতে, যে জীবনের এক পর্যায়ে পানিতে থাকে এবং পরে ডাঙায়ও থাকতে পারে।”
আবাবিল বলল,
“ব্যাঙ!”
“ঠিক।”
মাছের প্রতি দায়িত্ব
পুকুর থেকে ফেরার আগে ফারজানা মরিয়ম সবাইকে বললেন,
“একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখবে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বাঁচার জন্য পরিষ্কার পানির প্রয়োজন।”
আসাদুল্লাহ বলল,
“তাহলে পানিতে ময়লা ফেলা উচিত নয়।”
“কখনোই নয়।”
নুসরাত বলল,
“প্লাস্টিকও পানিতে ফেলা উচিত নয়।”
“ঠিক।”
সাফুয়ান বলল,
“কারণ এতে জলজ প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।”
বিজ্ঞান নোটবুকে আজকের শিক্ষা
শ্রেণিকক্ষে ফিরে সবাই তাদের প্রাণী পর্যবেক্ষণ নোটবুক খুলল।
নুসরাত লিখল—
প্রাণী: মাছ
দল: মেরুদণ্ডী
বাসস্থান: পানি
চলন: সাঁতার
বিশেষ অঙ্গ: পাখনা ও ফুলকা
আনিশা লিখল—
মাছ পানিতে বাস করে এবং পাখনার সাহায্যে সাঁতার কাটে।
আবাবিল লিখল—
মাছ ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য চালায়।
মেফতাহুল লিখল—
মাছের পাখনা = পানির স্টিয়ারিং!
ফারজানা মরিয়ম তার খাতা দেখে বললেন,
“তোমার বিজ্ঞান আর হাস্যরস—দুটোই বেশ ভালো চলছে।”
পরের অভিযানের ডাক
ক্লাসের শেষে ফারজানা মরিয়ম একটি ব্যাঙের ছবি বোর্ডে লাগালেন।
সবাই একসঙ্গে বলল,
“ব্যাঙ!”
ম্যাডাম বললেন,
“ব্যাঙের জীবনে রয়েছে এক অসাধারণ পরিবর্তনের গল্প। ছোট অবস্থায় সে পানিতে থাকে, আর বড় হলে ডাঙাতেও চলাফেরা করতে পারে।”
মেফতাহুল বলল,
“মানে ব্যাঙের দুইটা বাড়ি?”
ম্যাডাম বললেন,
“এক অর্থে তুমি তা বলতে পারো।”
নুসরাত বলল,
“তাহলে পরের অধ্যায়ের নাম কী?”
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে লিখলেন—
ব্যাঙের দুই জগৎ
তারপর বললেন,
“পরের অধ্যায়ে আমরা জানব উভচর প্রাণী সম্পর্কে।”
শিক্ষার্থীরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসল।
আজ তারা পানির রাজ্যে মাছের রহস্য জেনেছে।
কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় রহস্য—
একটি প্রাণী কীভাবে জল ও স্থল—দুই জগতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে?
উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যাঙের জীবনে।
চলবে...
📝 অধ্যায় ৫: MCQ
১. মাছ কোন ধরনের প্রাণী?
ক) অমেরুদণ্ডী
খ) মেরুদণ্ডী
গ) কীটপতঙ্গ
ঘ) সরীসৃপ
২. মাছ কোন অঙ্গের সাহায্যে শ্বাসকার্য চালায়?
ক) ফুসফুস
খ) নাক
গ) ফুলকা
ঘ) পাখনা
৩. মাছের পাখনার প্রধান কাজ কী?
ক) খাদ্য তৈরি করা
খ) সাঁতার ও চলাফেরায় সাহায্য করা
গ) গন্ধ নেওয়া
ঘ) শব্দ শোনা
৪. নিচের কোনটি মাছের উদাহরণ?
ক) রুই
খ) ব্যাঙ
গ) সাপ
ঘ) দোয়েল
৫. মাছের দেহ সাধারণত কোন পরিবেশে জীবনযাপনের উপযোগী?
ক) মরুভূমি
খ) পানি
গ) শুকনো পাহাড়
ঘ) বরফের ওপর
উত্তরমালা:
১. খ | ২. গ | ৩. খ | ৪. ক | ৫. খ
লেখক: আশরাফ উল আসাদ