তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান গল্প ১: অধ্যায় ৬: ছোট, মাঝারি আর বিশাল গাছ
সকালের বিজ্ঞান ক্লাস।
ফারজানা মরিয়ম আজ শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেন তিনটি ছবি হাতে নিয়ে।
প্রথম ছবিতে একটি ছোট্ট মরিচগাছ।
দ্বিতীয় ছবিতে একটি গোলাপগাছ।
তৃতীয় ছবিতে বিশাল একটি আমগাছ।
ছবিগুলো বোর্ডে পাশাপাশি লাগিয়ে ম্যাডাম বললেন,
“আজ তোমাদের একটি খুব সহজ প্রশ্ন।”
মেফতাহুল জান্নাত হাত তুলে বলল,
“আজও কি রহস্য?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে প্রশ্নটা নিশ্চয়ই কঠিন!”
ফারজানা মরিয়ম হেসে বললেন,
“প্রশ্নটা সহজ। তোমরা বলো, এই তিনটি গাছ কি একই রকম?”
সবাই ছবির দিকে তাকাল।
নুসরাত জাহান বলল,
“না। প্রথমটা ছোট।”
আনিশা মারজান বলল,
“দ্বিতীয়টা ঝোপের মতো।”
আবাবিল আল আলিফ বলল,
“তৃতীয়টা অনেক বড়।”
ম্যাডাম বললেন,
“ঠিক। উদ্ভিদের আকার এবং কাণ্ডের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আমরা উদ্ভিদকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করতে পারি।”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
বিরুৎ — গুল্ম — বৃক্ষ
মেফতাহুল শব্দগুলো পড়ে বলল,
“ম্যাডাম, এগুলো কি তিন ভাই?”
সবাই হেসে উঠল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“চাইলে আজ আমরা এদের তিন ভাই-বোনের মতোই চিনতে পারি। তবে প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য আলাদা।”
প্রথম বন্ধু—বিরুৎ
ম্যাডাম শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলের বাগানের এক পাশে গেলেন।
সেখানে ছিল ছোট ছোট মরিচগাছ।
“এগুলো কী?”
সাফুয়ান বলল,
“মরিচগাছ।”
“এদের আকার কেমন?”
“ছোট।”
“কাণ্ড?”
আসাদুল্লাহ আল গালিব বলল,
“সবুজ আর নরম।”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এ ধরনের ছোট উদ্ভিদ, যাদের কাণ্ড সাধারণত নরম ও সবুজ, তাদের বিরুৎ বলা হয়।”
নুসরাত বলল,
“বিরুৎ মানে ছোট গাছ?”
“সহজভাবে মনে রাখতে পারো—বিরুৎ সাধারণত ছোট আকারের এবং এদের কাণ্ড নরম ও সবুজ হয়।”
ম্যাডাম চারপাশের কয়েকটি উদ্ভিদ দেখিয়ে বললেন,
“ধান, গম, সরিষা, মরিচ, টমেটো ও ঘাস—এগুলো বিরুতের উদাহরণ।”
মেফতাহুল একটি ঘাসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঘাসও তাহলে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গুরুত্বপূর্ণ!”
“অবশ্যই,” বললেন ম্যাডাম। “ছোট হলেই কোনো উদ্ভিদ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
ধানক্ষেতের গল্প
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে একটি ধানগাছের ছবি আঁকলেন।
“তোমরা ধানগাছ দেখেছ?”
সবাই বলল,
“হ্যাঁ।”
“ধানগাছ খুব বড় গাছ?”
“না!”
“এর কাণ্ড কেমন?”
মরিয়ম আক্তার বলল,
“নরম ও সবুজ।”
“তাই ধানগাছ বিরুতের একটি উদাহরণ।”
আবু তালহা বলল,
“তাহলে ধান ছোট হলেও আমাদের খাবার দেয়!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক। উদ্ভিদের গুরুত্ব শুধু আকার দিয়ে বিচার করা যায় না।”
দ্বিতীয় বন্ধু—গুল্ম
এরপর সবাই স্কুলের বাগানের গোলাপগাছের কাছে গেল।
গোলাপগাছটি খুব বড় নয়। কিন্তু এটি ঘাসের চেয়ে বড় এবং এর গোড়ার দিক থেকেই অনেক শাখা বের হয়েছে।
ম্যাডাম বললেন,
“এবার এই গাছটি দেখো।”
আনিশা বলল,
“গোলাপ!”
“এর আকার বিরুতের চেয়ে বড় কি না?”
“হ্যাঁ।”
“বৃক্ষের মতো বিশাল?”
“না।”
“তাহলে এটি কোন শ্রেণির?”
নুসরাত বলল,
“গুল্ম!”
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“ঠিক। গুল্ম সাধারণত বিরুতের চেয়ে বড় কিন্তু বৃক্ষের চেয়ে ছোট। এদের কাণ্ড কিছুটা শক্ত হলেও খুব মোটা হয় না এবং গোড়া থেকেই শাখা-প্রশাখা বের হতে পারে।”
সাফুয়ান বলল,
“গোলাপের তো অনেকগুলো ডাল!”
“হ্যাঁ।”
ম্যাডাম আরও কয়েকটি উদাহরণ দিলেন—
“জবা, রজনীগন্ধা ও মেহেদিও গুল্মের উদাহরণ।”
মেফতাহুল জবা গাছের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে জবা হলো মাঝারি ভাই!”
“তোমার তুলনাটি মনে রাখার জন্য ব্যবহার করতে পারো,” ম্যাডাম বললেন।
তৃতীয় বন্ধু—বৃক্ষ
এরপর তারা হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের বিশাল আমগাছের নিচে এসে দাঁড়াল।
ম্যাডাম মাথা উঁচু করে বললেন,
“এবার এই গাছটির দিকে তাকাও।”
সবাই উপরের দিকে তাকাল।
অনেক উঁচুতে পাতাগুলো।
মোটা কাণ্ড।
প্রশস্ত শাখা-প্রশাখা।
আবাবিল বলল,
“এটা তো বিরুৎ নয়!”
মেফতাহুল বলল,
“গুল্মও নয়!”
আসাদুল্লাহ বলল,
“এটা বৃক্ষ।”
“ঠিক,” বললেন ফারজানা মরিয়ম।
“বৃক্ষ আকারে বড় হয়। এদের কাণ্ড সাধারণত মোটা, শক্ত ও কাষ্ঠল হয়।”
আবু তালহা কাণ্ডে হাত রেখে বলল,
“এটা তো পাথরের মতো শক্ত!”
ম্যাডাম বললেন,
“পাথর নয়। এটি কাঠ বা কাষ্ঠল কাণ্ডের অংশ।”
গাছ মাপার প্রতিযোগিতা
মেফতাহুল হঠাৎ বলল,
“ম্যাডাম, আমরা কি গাছগুলোর উচ্চতা মাপতে পারি?”
“অবশ্যই।”
শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে গেল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তবে সাবধানে। বড় গাছে ওঠা যাবে না। আমরা চোখে দেখে, তুলনা করে এবং নিরাপদভাবে পর্যবেক্ষণ করব।”
নুসরাত একটি ছোট মরিচগাছ দেখিয়ে বলল,
“এটা সবচেয়ে ছোট।”
আনিশা গোলাপগাছ দেখিয়ে বলল,
“এটা তার চেয়ে বড়।”
আবাবিল আমগাছ দেখিয়ে বলল,
“আর এটা সবার চেয়ে বড়।”
ম্যাডাম বললেন,
“এটাই হলো উদ্ভিদের আকারের একটি সহজ তুলনা।”
কাণ্ডের রহস্য
ফারজানা মরিয়ম এবার তিনটি উদ্ভিদের কাণ্ড দেখালেন।
“শুধু আকার দেখলেই কি আমরা সব সময় উদ্ভিদকে চিনতে পারব?”
আসাদুল্লাহ বলল,
“না। কাণ্ডও দেখতে হবে।”
“ঠিক।”
তিনি বললেন,
“উদ্ভিদকে বিরুৎ, গুল্ম ও বৃক্ষ হিসেবে চেনার সময় আকার এবং কাণ্ডের বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ।”
মরিয়ম বলল,
“বিরুতের কাণ্ড নরম।”
“হ্যাঁ।”
“গুল্মের কাণ্ড কিছুটা শক্ত।”
“ঠিক।”
“আর বৃক্ষের কাণ্ড শক্ত, মোটা ও কাষ্ঠল।”
“অসাধারণ!”
বিজ্ঞান গোয়েন্দা খেলা
ফারজানা মরিয়ম এবার বললেন,
“এবার তোমরা বিজ্ঞান গোয়েন্দা।”
সবাই সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“আমি একটি উদ্ভিদের বর্ণনা দেব। তোমরা বলবে সেটি বিরুৎ, গুল্ম নাকি বৃক্ষ।”
প্রথম বর্ণনা—
“ছোট আকারের উদ্ভিদ। কাণ্ড নরম ও সবুজ। উদাহরণ—মরিচ।”
সবাই চিৎকার করে বলল,
“বিরুৎ!”
দ্বিতীয় বর্ণনা—
“বিরুতের চেয়ে বড়। কাণ্ড কিছুটা শক্ত। গোড়া থেকে শাখা বের হয়। উদাহরণ—গোলাপ।”
“গুল্ম!”
তৃতীয় বর্ণনা—
“অনেক বড়। কাণ্ড মোটা, শক্ত ও কাষ্ঠল। উদাহরণ—আম।”
“বৃক্ষ!”
ফারজানা মরিয়ম হাততালি দিলেন।
“তোমরা এখন উদ্ভিদ গোয়েন্দা হওয়ার পথে!”
একটি মজার ভুল
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“এবার মেফতাহুলের পালা। তুমি একটি উদ্ভিদের নাম বলবে, বাকিরা শ্রেণি বলবে।”
মেফতাহুল চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“নারকেলগাছ!”
নুসরাত বলল,
“বৃক্ষ!”
মেফতাহুল বলল,
“ঠিক।”
তারপর সে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি?”
সবাই হেসে ফেলল।
ফারজানা মরিয়ম বললেন,
“তোমাকে আপাতত ‘শিক্ষার্থী’ শ্রেণিতেই রাখা হচ্ছে!”
মেফতাহুল বলল,
“আমি ভেবেছিলাম আমাকে গুল্ম বানানো হবে!”
তিন শ্রেণির তুলনা
ক্লাসে ফিরে ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে একটি তালিকা তৈরি করলেন।
বিরুৎ
- আকার ছোট।
- কাণ্ড সাধারণত নরম ও সবুজ।
- উদাহরণ: ধান, গম, সরিষা, মরিচ, টমেটো, ঘাস।
গুল্ম
- বিরুতের চেয়ে বড়, বৃক্ষের চেয়ে ছোট।
- কাণ্ড কিছুটা শক্ত, তবে খুব মোটা নয়।
- গোড়া থেকে শাখা-প্রশাখা বের হতে পারে।
- উদাহরণ: গোলাপ, জবা, রজনীগন্ধা, মেহেদি।
বৃক্ষ
- আকারে বড়।
- কাণ্ড মোটা, শক্ত ও কাষ্ঠল।
- উদাহরণ: আম, জাম, কাঁঠাল, বট, অশ্বত্থ।
শিক্ষার্থীরা খাতায় লিখে নিল।
শেষ মুহূর্তের চমক
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে ফারজানা মরিয়ম আবার সেই তিনটি ছবি হাতে নিলেন।
“আজ তোমরা উদ্ভিদকে আকার ও কাণ্ডের বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিনতে শিখলে।”
তিনি প্রথম ছবিটি দেখালেন।
“বিরুৎ।”
দ্বিতীয়টি।
“গুল্ম।”
তৃতীয়টি।
“বৃক্ষ।”
সবাই এখন আত্মবিশ্বাসী।
কিন্তু ম্যাডাম হঠাৎ আরেকটি ছবি বের করলেন।
ছবিতে একটি ফার্ন।
তিনি বললেন,
“এবার বলো, এই উদ্ভিদের ফুল কোথায়?”
সবাই চুপ।
মেফতাহুল বলল,
“ম্যাডাম, আপনি আবার সেই ফুলহীন গাছের রহস্যে ফিরে গেলেন!”
ফারজানা মরিয়ম রহস্যময়ভাবে হাসলেন।
“হ্যাঁ। কারণ এবার আমরা শুধু উদ্ভিদের আকার দেখে নয়, ফুল হয় কি না—সেটা দেখে উদ্ভিদকে চিনব।”
নুসরাত বলল,
“ফুল আছে আর ফুল নেই—এমন দুই ধরনের উদ্ভিদ?”
“ঠিক।”
ফারজানা মরিয়ম বোর্ডে দুটি শব্দ লিখলেন—
সুপুষ্পক উদ্ভিদ
অপুষ্পক উদ্ভিদ
শিক্ষার্থীদের চোখ আবার বড় হয়ে গেল।
নতুন রহস্যের দরজা খুলে গেল।
চলবে...
আজকের শেখা
- আকার ও কাণ্ডের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উদ্ভিদকে প্রধানত বিরুৎ, গুল্ম ও বৃক্ষ—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
- বিরুৎ সাধারণত ছোট এবং কাণ্ড নরম ও সবুজ হয়।
- ধান, গম, সরিষা, মরিচ, টমেটো ও ঘাস বিরুতের উদাহরণ।
- গুল্ম বিরুতের চেয়ে বড় কিন্তু বৃক্ষের চেয়ে ছোট।
- গোলাপ, জবা, রজনীগন্ধা ও মেহেদি গুল্মের উদাহরণ।
- বৃক্ষ সাধারণত বড় এবং এর কাণ্ড মোটা, শক্ত ও কাষ্ঠল হয়।
- আম, জাম, কাঁঠাল, বট ও অশ্বত্থ বৃক্ষের উদাহরণ।
লেখক: আশরাফ উল আসাদ