বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

প্রকল্পের ১৯৫০০ কোটি টাকা তেল আমদানিতে, বিপিসির দাবি কাজে প্রভাব পড়বে না

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 30 সেপ্টেম্বর 2026, 08:11 সকাল • 5 বার পঠিত
প্রকল্পের ১৯৫০০ কোটি টাকা তেল আমদানিতে, বিপিসির দাবি কাজে প্রভাব পড়বে না

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকটের মধ্যেও জ্বালানি তেল আমদানি চালিয়ে নিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বা ইআরএল-২সহ বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাবে রাখা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম বৈঠকে মঙ্গলবার উপস্থাপনের জন্য তৈরি বিপিসির কার্যপত্রে জ্বালানি তেল কেনায় এই টাকা ব্যবহারের তথ্য দেওয়া হয়। কার্যপত্রে বলা হয়, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ রাখতে মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইআরএল-২ সহ বিভিন্ন প্রকল্প খাত থেকে এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে গত সাত মাস জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে বিপিসি।

এমন পরিস্থিতিতে যেসব প্রকল্পের হিসাব থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজে এর প্রভাব পড়বে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে বিপিসি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলছেন, এই অর্থ বিপিসির নিজস্ব। বিভিন্ন প্রকল্পে কখন কত টাকা প্রয়োজন হবে, সেই হিসাব করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এতে প্রকল্পগুলোর কাজে কোনো প্রভাব পড়বে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাবে রাখা অর্থ বিপিসিরই। প্রকল্পগুলোতে চলতি ও আগামী অর্থবছরে কখন কত টাকা লাগবে, সেই প্রয়োজন বিবেচনা করে অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে অর্থ নেওয়া হয়নি।”

লোকসানের মধ্যেও জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রাখা এখন বিপিসির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বর্ণনা করে তিনি দাবি করেন, প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনের সময় অর্থের ব্যবস্থা করা হবে।

ছয় মাসে লোকসান ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা

বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই মাসের তেলের মূল্যের সমপরিমাণ ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ভর্তুকি মূল্যে তেল বিক্রির কারণে বিপিসির চলতি মূলধন কমে গেছে।

সংস্থাটির হিসাবে, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এই লোকসানের বড় অংশ ডিজেল থেকে এসেছে তথ্য দিয়ে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ডিজেল। কার্যপত্র তৈরির সময়কার আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ডলারের বিনিময় হার ধরে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা পড়ছিল। তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল লিটারে ১১৫ টাকায়।”

বিপিসির কার্যপত্র অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৮৬ ডলার। মার্চে তা বেড়ে ১৮৬ দশমিক ৫৯ ডলার হয়। এপ্রিলে ডিজেলের সর্বোচ্চ দাম ব্যারেল প্রতি ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে উঠেছিল। সেপ্টেম্বরে কার্যপত্র তৈরির সময় পর্যন্ত গড় দাম ছিল ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলার।

সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের যে দামে খরচ উঠে আসে, সেই পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি মূল্য হতে হবে ১১০ ডলার। ফলে বর্তমান মূল্যেও বিপিসির লোকসান হচ্ছে।

পাঁচ মাস দাম বাড়ায়নি সরকার

দেশে ২০২৪ সালের মার্চে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে প্রতি মাসে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছিল। বিপিসির কার্যপত্রে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বাড়লেও জনস্বার্থে প্রায় পাঁচ মাস স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি অনুযায়ী দেশে দাম বাড়ানো হয়নি।

এর মধ্যে ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। পরে ১ জুন কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা করা হয়। ডিজেল রাখা হয় ১১৫ টাকায়। সবশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এখন ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিপিসি কার্যপত্রে বলেছে, লোকসান কমানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি কমাতে সর্বশেষ দাম বাড়ানো হয়েছে।

তবে পাচারের পরিমাণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে কি না প্রশ্নে রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, বিপিসি সুনির্দিষ্টভাবে পাচারের পরিমাণ চিহ্নিত করতে পারেনি।

দুই দেশের জ্বালানি তেলের দামের ব্যবধানের কারণে পাচারের ঝুঁকি ছিল এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়ার কথা জানান তিনি। সেই ঝুঁকিও দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে তথ্য দেন বিপিসি চেয়ারম্যান।


দাম বাড়তেই সংকট কাটল কীভাবে, জানতে চায় কমিটি

এদিকে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে জ্বালানি সংকট সৃষ্টির কারণ নিয়ে মঙ্গলবারের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সংকটের সময় এবং পরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা একই থাকার পরও শুধু দাম বাড়ানোর ফলে কীভাবে সংকটের অবসান হয়েছে, সে বিষয়ে বিপিসির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি।

যদিও বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “এটি কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। মূলত বিপিসি ও এর কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, বর্তমান প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”

বৈঠকে দেশের বর্তমান জ্বালানি চাহিদা, সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় প্রস্তুতির বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী বৈঠকে দিতে বিপিসিকে সুপারিশ করা হয়। জনগণের জন্য জ্বালানির দাম সহনীয় রাখতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশও করেছে কমিটি।

মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে নেওয়ার পরিকল্পনা

বর্তমানে বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর ৬৪টি ডিপো ও স্থাপনায় ১৬ লাখ ২৭৩ টন জ্বালানি তেল মজুদের সক্ষমতা রয়েছে। বিপিসির হিসাবে, এই সক্ষমতায় পণ্য ভেদে ৪০ থেকে ৪৫ দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব। এই মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও কার্যপত্রে বলা হয়েছে।

এ জন্য কত বিনিয়োগ লাগবে প্রশ্নে রফিকুল ইসলাম বলেন, “মোট বিনিয়োগের অঙ্ক এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। বিপিসি কেন্দ্রীয়ভাবে সব অবকাঠামো নির্মাণ করবে না। আওতাধীন কোম্পানিগুলো নিজেদের বাজেটে মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে। সব কোম্পানির পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তা পরে নির্ধারণ করা হবে।”

এ বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে সংসদীয় কমিটিকেও তথ্য দেওয়া হবে বলে জানান বিপিসি চেয়ারম্যান।