পোল্যান্ডে সাংবিধানিক আদালতের প্রধানকে অপসারণ ঘিরে উত্তেজনা, দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন
পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতিকে সাময়িক বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এ ঘটনাকে ঘিরে ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থী সরকার ও জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার রাজধানী ওয়ারশতে সাংবিধানিক আদালতের সামনে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
এদিকে, পরিস্থিতির কারণে আফ্রিকা সফর বাতিল করে মাঝ আকাশ থেকেই রাজধানী ওয়ারশতে ফিরে আসেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি।
শুক্রবার সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি বোগদান সুইয়েজকোভস্কিকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্তের প্রতিবাদে আদালতের সামনে বিক্ষোভ করেন বিরোধী ডানপন্থী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (পিআইএস) সমর্থকেরা। আদালতের প্রবেশপথে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
আদালতের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স অ্যাকাউন্টে এ ঘটনাকে ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের বিরুদ্ধে ‘টাস্ক বিশ্বাসঘাতক’ স্লোগান দেন।
একপর্যায়ে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে আদালত চত্বরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, আদালত ভবন এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আদালতের সামনে বিক্ষোভরত টমাস জালেস্কি এএফপিকে বলেন, ‘টাস্ক আমাদের সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত করছেন।’
প্রধানমন্ত্রী টাস্কের সরকার কয়েক সপ্তাহ ধরেই সাংবিধানিক আদালতের বিচারকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব বিচারক ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা পিআইএস সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
ওই আদালত বিভিন্ন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আইনের চেয়ে পোল্যান্ডের জাতীয় আইনকে প্রাধান্য দিয়ে রায় দিয়েছেন। এ কারণে ইইউ অভিযোগ করে আসছে, দেশটির সর্বোচ্চ আদালত তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল।
মাঝ আকাশে নাটকীয় পরিস্থিতি
ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী টাস্ক ২০২৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ব্রাসেলসের সঙ্গে বিরোধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ডানপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত দেশটির প্রেসিডেন্ট নাওরোকি সাংবিধানিক আদালতে টাস্ক সরকারের মনোনীত বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিয়েছেন।
পোল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিআইএস নেতা ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি প্রেসিডেন্ট নাভরোকিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি সেনেগালে সরকারি সফরে যাওয়ার পথে মাঝ আকাশ থেকেই সফর বাতিল করে বিমানকে ওয়ারশতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজধানীতে ফিরে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হওয়া আদালতপ্রধান সুইয়েজকোভস্কি এবং আদালতের প্রথম প্রধান বিচারপতি জবিগনিয়েভ কাপিনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ পাওয়েল শেফেরনাকার শনিবার ভোরে জানান, এরপর নাভরোকি আদালতের প্রথম প্রধান বিচারপতি জবিগনিয়েভ কাপিনস্কিকে সঙ্গে নিয়ে সাংবিধানিক আদালত ভবনে প্রবেশ করেন।
স্থানীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, আদালত ভবনে ঢোকার সময় প্রেসিডেন্টকে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
আদালতের নেতৃত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান
বিচারপতি আন্না করভিন-পিওত্রোভস্কি সুইয়েজকোভস্কিকে সাময়িক বরখাস্তের ঘোষণা দেন। তার ভাষ্য, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এ পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
এদিকে, বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ালদেমার জুরেক সাংবাদিকদের জানান, তিনি সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি বোগদান সুইয়েজকোভস্কি এবং তার ডেপুটি বার্তলোমেই সোখানস্কির আইনি দায়মুক্তি প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এই আদালত যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে হবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী টাস্ক তার সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিআইএসের নেতৃত্বাধীন সরকারের দীর্ঘদিনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের পর এ প্রক্রিয়া কঠিন এবং কখনো কখনো বেদনাদায়ক। এ জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর বিকল্প কোনো পথ নেই।’
শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবিধানিক আদালতের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে, আদালতের এক্স অ্যাকাউন্টে আবারও এ ঘটনাকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করা হয় এবং দাবি করা হয়, সুইয়েজকোভস্কি এখনো তার পদে বহাল রয়েছেন।
একই সঙ্গে অ্যাকাউন্টে বলা হয়েছে, করভিন-পিওত্রোভস্কি অন্তর্বর্তী প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিতে পারেন না, কারণ প্রেসিডেন্ট তাকে শপথবাক্য পাঠ করাননি।
এ পরিস্থিতিতে করভিন-পিওত্রোভস্কি বলেন, ‘আধুনিক ইউরোপে সাংবিধানিক আদালত ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। এমন আদালত নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতার সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।’