সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
কুরআন

হিংসা : কারণ, ধরণ, ভয়াবহতা ও প্রতিকার

ড. মো: সাইফুল ইসলাম • 26 অক্টোবর 2026, 02:37 রাত • 8 বার পঠিত
হিংসা : কারণ, ধরণ, ভয়াবহতা ও প্রতিকার

হিংসা শুধু খারাপ অভ্যাস নয়; বরং এটা হারাম, এটা কবিরা গুনাহ, এটা ঈমান ধ্বংসকারী রোগ। হিংসা মানুষকে শান্তি দেয় না; বরং নিজের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অন্যের নেয়ামত কমে না—কিন্তু নিজের ঈমান, আমল আর হৃদয়ের প্রশান্তি পুড়ে যায়। আগুনের একটি বিশেষ স্বভাব হলো—প্রথমে সে কাঠকে জ্বালায়। কাঠ সম্পূর্ণ পুড়ে গেলে আগুন তখন নিজেই জ্বলতে থাকে। ঠিক তেমনি, যে ব্যক্তি অন্যের নেয়ামত দেখে হিংসা করে—প্রথমে তার নেক আমলগুলো পুড়ে যায়। আর যখন ধীরে ধীরে তার সব নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তখন সে নিজেই ভেতর থেকে জ্বলতে শুরু করে। এভাবে নিজেকে জ্বালাতে জ্বালাতে সে একসময় কবরের গর্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ، وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ.

أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ 

হামদ ও সালাতের পর!

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ

তারা কি মানুষের প্রতি হিংসা করে, সে সব নেয়ামতের কারণে যা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তাদের দান করেছেন? [সূরা নিসা : ৫৪]

সমাজে সবচেয়ে ছড়িয়ে পড়া রোগ : হিংসা

সম্মানিত উপস্থিতি! আজকের এই বরকতময় মজলিসে আমরা এমন একটি রোগের কথা বলব, যা চোখে দেখা যায় না—কিন্তু ঘরের ভেতর, সমাজের ভেতর, এমনকি ইবাদতের ভেতরও নীরবে ছড়িয়ে পড়ে। সে রোগটির নাম হিংসা—আরবিতে হাসাদ, ইংরেজিতে Jealousy।

একটা কথা শুরুতেই পরিষ্কার করে বলি—রোগ ধরা না পড়লে চিকিৎসা হয় না। আর রোগ ধরা পড়ার প্রথম ধাপ হলো, নিজের ভেতরে রোগ আছে—এই উপলব্ধি।

হিংসা : আসলে কী?

ইমাম নববী রহ. খুব সংক্ষেপে, কিন্তু গভীরভাবে হিংসার সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেন

تَمَنِّي زَوَالِ نِعْمَةِ الْغَيْرِ

অন্যের নেয়ামত চলে যাওয়ার কামনা করাই হলো হিংসা। [শরহুল মুসলিম : ২/৩১৫]

অর্থাৎ, কারো কাছে কোনো নেয়ামত আছে—দীনদারি, ইলম, সম্পদ, সম্মান, সুস্থ শরীর, সুন্দর চরিত্র, বা ঈমানের দৃঢ়তা ইত্যাদি। এইসব দেখে যদি আমার অন্তরে অস্বস্তি আসে, আর আমি মনে মনে চাই—ওর এই নেয়ামতটা না থাকলেই ভালো হতো—এই মনোভাবের নামই হিংসা।

হিংসার ভয়ংকর দিক

আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? যার নেয়ামত যত বড়, তার ওপর হিংসাও তত বেশি হয়। এই জন্যই এক বুজুর্গ আলেম বলতেন, যার ওপর হিংসা হয় না, বুঝে নিও—তার মধ্যে বিশেষ কিছু নেই। কারণ, যিনি যত মহান—তিনিই তত বেশি হিংসার শিকার হন।

এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যাঁর ওপর হিংসা করা হয়েছে—তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ। নিজের আপন কওমও তাঁকে সহ্য করতে পারেনি—হিংসায় জ্বলেছে।

হিংসা মানে আল্লাহর বণ্টনের ওপর আপত্তি তোলা

মূলত হিংসা মানে হলো, আল্লাহর ফয়সালার ওপর অসš‘ষ্ট হওয়া। আল্লাহর বণ্টনের ওপর আপত্তি তোলা। হিংসাকারীর মনের ভেতরে যেন এই কথা লুকিয়ে থাকে—আল্লাহ ভুল করেছেন! এই নেয়ামত ওর পাওয়ার কথা ছিল না, আমার পাওয়ার কথা ছিল! (নাউযুবিল্লাহ!)

কখনো এই কথা মুখে বলে, আর কখনো শুধু হৃদয়ের গভীরে লালন করে। কিš‘ মনে রাখবেন, মনের গুনাহও আল্লাহর কাছে গুনাহ।

মাওলানা রুমি রহ. বলেন

ہست پنہاں ایں خباثت در حسد

اعتراض اندر قضائے حق رسد

حق دہد نعمت کسے از فضلِ خویش

در جگر حاسد چرایا بندہ ریش

হিংসার ভেতর লুকিয়ে আছে এই নোংরা ব্যাধি—

এটা আল্লাহর তাকদীর ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে ধরে।

আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যাকে ই”ছা নেয়ামত দেন,

কিন্তু হিংসুকের হৃদয়ে তা হয়ে ওঠে আগুনের ক্ষত।

এই কারণেই হিংসা শুধু খারাপ অভ্যাস নয়; বরং এটা হারাম, এটা কবিরা গুনাহ, এটা ঈমান ধ্বংসকারী রোগ। হিংসা মানুষকে শান্তি দেয় না; বরং নিজের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অন্যের নেয়ামত কমে না—কিš‘ নিজের ঈমান, আমল আর হৃদয়ের প্রশান্তি পুড়ে যায়।

শারীরিক রোগ

মানুষের রোগ দু’প্রকার—শারীরিক রোগ এবং রুহানি বা আত্মিক রোগ। আবার এই দু’প্রকার রোগই দু’ভাগে বিভক্ত—প্রকাশ্য ও গোপন।

শারীরিক রোগের কিছু অংশ প্রকাশ্য—যেমন সর্দি, জ্বর, ক্ষত, ফোঁড়া— এগুলো চোখে দেখা যায়, সহজে বোঝা যায়, চিকিৎসাও সহজ হয়। কিন্তু কিছু শারীরিক রোগ গোপন— যেমন রক্তের ক্যান্সার। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ রোগ ধরা পড়ে। অনেক সময় রোগী নিজেও বুঝতে পারে না, অথচ ভেতরে ভেতরে রোগ বেড়েই চলে। এ ধরনের রোগ বেশি ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী।

ঠিক একইভাবে রুহানি রোগও আছে। কিছু রুহানি রোগ প্রকাশ্য—যেমন অতিরিক্ত রাগ। মানুষ তা আচরণেই প্রকাশ করে। আর কিছু রুহানি রোগ গোপন—যেমন অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা। এগুলো মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকে। মানুষ টেরও পায় না, অথচ এই গোপন রোগ ধীরে ধীরে ঈমান, আমল ও আখলাককে ধ্বংস করে দেয়।

মুহতারাম হাজিরীন! যেমন গোপন শারীরিক রোগ চিকিৎসা না করলে মৃত্যু ডেকে আনে, তেমনি গোপন রুহানি রোগ তাওবা ও আত্মশুদ্ধি ছাড়া ছেড়ে দিলে আখিরাত ধ্বংস করে দেয়। তাই আমাদের কর্তব্য—নিজের শরীরের যেমন যত্ন নেই, তেমনি নিজের অন্তরেরও হিসাব নিই।

চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা

যেমন গোপন শারীরিক রোগ—বিশেষত ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য আমরা দেরি না করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হই, তেমনি হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার—এগুলোও গোপন রুহানি রোগ। এসব রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য আমাদের আহলুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহওয়ালাদের সান্নিধ্যে বসতে হবে। তাদের কাছে নিজেদের অবস্থা খুলে বলতে হবে এবং তাদের নির্দেশিত আমল ও নিয়ম মেনে চলতে হবে।

শরীরের রোগ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে কিছুই গোপন করি না—ব্যথা, কষ্ট, সব খুলে বলি। কারণ আমরা জানি, গোপন করলে চিকিৎসা সঠিক হবে না। ঠিক তেমনি রুহানি রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আহলুল্লাহর কাছে সত্যটা খুলে বলা জরুরি। তবেই সঠিক রুহানি চিকিৎসা সম্ভব, তবেই অন্তরের রোগ দূর হবে।

হিংসার কারণসমূহ

হিংসার প্রকৃত কারণ আল্লাহই ভালো জানেন—তিনি عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُور অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে তিনি সবিশেষ অবগত। তবে বাহ্যিকভাবে হিংসার কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—

এক. শত্রুতা ও বিদ্বেষ

বহু ক্ষেত্রে শত্রুতাই হিংসার দরজা খুলে দেয়। এতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছোট-বড়—সবাই জড়িয়ে পড়তে পারে। আজকের সমাজে আমরা দেখি, অযোগ্যতা ও অজ্ঞতার আড়ালে কিছু মানুষ যোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তিদের উন্নতি সহ্য করতে না পেরে হিংসায় জ্বলে ওঠে। এতে ক্ষতি তাদেরই হয়।

দুই. অহংকার ও আত্মগরিমা

হিংসার আরেক বড় কারণ অহংকার। ইতিহাসের প্রথম হিংসা করেছিল শয়তান—হযরত আদম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে। অহংকারের কারণে সে আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হলো। আল্লাহ তাআলা তাকে বললেন

فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ

তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি বিতাড়িত। [সূরা হিজর : ৩৪]

যার অন্তরে অহংকার, সে অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না। এটি শয়তানি পথ—একজন মুমিনের জন্য যা কখনোই শোভন নয়।

তিন. সমসাময়িকতা

নিজের সমবয়সী বা সমমর্যাদার কেউ এগিয়ে গেলে অনেকেই তা সহ্য করতে পারে না। এজন্যই বলা হয়েছে

اَلْمُعَاصَرَةُ أَصْلُ الْمُنَافَرَةِ

অর্থাৎ, একই সময়ের সমপর্যায়ের মানুষের মধ্যে রেষারেষি বা হিংসা বেশি হয়ে থাকে।

দুঃখজনকভাবে কখনো কখনো বিশেষ ওলামায়ে কেরামের মধ্যেও এ রোগ দেখা যায়।

চার. পদ-মর্যাদা ও সম্পদের মোহ

দুনিয়ার ভালোবাসা, খ্যাতি ও সম্পদের লালসা যখন অন্তর দখল করে, তখন অন্যের সম্মান ও সফলতা দেখে হিংসা জন্ম নেয়—ও যা পেল, আমি কেন পেলাম না?

ফুযায়ল ইবন ই’য়ায রহ. বলেন

مَا مِنْ أَحَدٍ أَحَبَّ الرِّئَاسَةَ إِلاَّ حَسَدَ وَبَغَى وَتَتَبَّعَ عُيُوبَ النَّاسِ وَكَرِهَ أَنْ يُذْكَرَ أَحَدٌ بِخَيْرٍ

যখন কোনো ব্যক্তি নেত...ত্বের আকাংখী হয়, তখন সে হিংসা করে, সীমালংঘন করে ও মানুষের দোষত্রুটি সন্ধান করে। তার সামনে কারো সম্পর্কে ভালো আলোচনা করা হলে সে তা অপসন্দ করে। [জামেঊ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাযলিহী : ১/৫৬৯]

হিংসা—এক ভয়ংকর আত্মিক রোগ

হিংসা এমন এক ভয়ংকর আত্মিক রোগ, যা মানুষের অন্তরকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে এ রোগ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন

إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ، فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ

হিংসা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়। [আবু দাউদ : ৪৯০৩]

হাদিসে ব্যবহৃত إِيَّاكُمْ শব্দটি আরবি ভাষায় অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয় থেকে সাবধান করার জন্য বলা হয়—যেমন সাপ, বিচ্ছু বা হিংস্র জন্তু থেকে সতর্ক করা। অর্থাৎ হিংসা এমনই এক মারাত্মক ব্যাধি, যা মানুষের ভেতরটা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।

রাসূল ﷺ আরও বোঝালেন—হিংসা নেক আমল ধ্বংস করে। নামায, রোজা, যাকাত, হজ—সব আমলের সৌন্দর্য ও বরকত হিংসার আগুনে পুড়ে যায়। যেমন আগুনে কাঠ জ্বলে গেলে তার অস্তিত্বই থাকে না, তেমনি হিংসায় আমল থাকলেও তার নূর ও কদর শেষ হয়ে যায়।

আগুনের একটি বিশেষ স্বভাব হলো—প্রথমে সে কাঠকে জ্বালায়। কাঠ সম্পূর্ণ পুড়ে গেলে আগুন তখন নিজেই জ্বলতে থাকে। ঠিক তেমনি, যে ব্যক্তি অন্যের নেয়ামত দেখে হিংসা করে—প্রথমে তার নেক আমলগুলো পুড়ে যায়। আর যখন ধীরে ধীরে তার সব নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তখন সে নিজেই ভেতর থেকে জ্বলতে শুরু করে। এভাবে নিজেকে জ্বালাতে জ্বালাতে সে একসময় কবরের গর্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

হিংসার দুনিয়াবী শাস্তি

হিংসার আরেকটি ভয়াবহ ক্ষতি হলো—হিংসুক ব্যক্তি সবসময় অশান্তিতে ভোগে। অনেক সময় সে হতাশা ও ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। হিংসুক নিজের দুঃখের চেয়ে অন্যের সুখে বেশি কষ্ট পায়, আর নিজের সুখের চেয়ে অন্যের দুঃখে বেশি আনন্দ পায়—এটাই হিংসার নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

ফকীহ আবুল লায়স সমরকন্দী রহ. বলেন, হিংসার চেয়ে ক্ষতিকর কোনো অন্যায় নেই। কারণ, হিংসুকের উপর হিংসার পাঁচটি শাস্তি আগে এসে যায়, অথচ যার প্রতি হিংসা করা হয় তার কোনো ক্ষতিই তখনো হয় না। সেই পাঁচটি শাস্তি হলো

১. غَمٌّ لا ينقَطِعُ এমন দুশ্চিন্তা, যা কখনো শেষ হয় না।

২. مصيبةٌ لا يؤجَرُ عليها এমন বিপদ, যাতে কোনো সওয়াব নেই।

৩. مَذَمَّةٌ لا يُحمَدُ بها এমন বদনাম, যাতে কোনো প্রশংসা নেই।

৪. يَسخَطُ عليه الرَّبُّ আল্লাহর অসন্তুষ্টি।

৫. تُغلَقُ عليه أبوابُ التَّوفيقِ তাওফিকের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। [তাম্বীহুল গাফিলীন : ১৭৭, ১৭৮]

হিংসা সম্পর্কে সালাফদের বাণী

হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযি. বলেন

لَا تُعَادُوا نِعَمَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ

আল্লাহ তাআলার নেয়ামতগুলোর সঙ্গে শত্রুতা করো না। 

এটা শুনে উপস্থিত এক লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন

وَمَنْ يُعَادِي نِعَمَ اللَّهِ؟

আল্লাহর নেয়ামতের সঙ্গে শত্রুতা করে কারা?

তিনি বললেন

الَّذِينَ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ

তারা—যারা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ থেকে মানুষকে যা দিয়েছেন, তার ওপর হিংসা করে। [বাহজাতুল মাজালিস, ইবনু আবদিল বার্র : ১/৪০৭]

হযরত আনাস রাযি. একবার এক ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন বললেন

هَذَا أَهْلَكَهَا وَأَهْلَكَ أَهْلَهَا الْبَغْيُ وَالْحَسَدُ؛ إِنَّ الْحَسَدَ لَيُطْفِئُ نُورَ الْحَسَنَاتِ، وَالْبَغْيَ يُصَدِّقُ ذَلِكَ أَوْ يُكَذِّبُهُ، فَإِذَا حَسَدْتُمْ فَلَا تَبْغُوا

এই জনপদ ও এর অধিবাসীদের ধ্বংস করেছে জুলুম ও হিংসা। নিশ্চয়ই হিংসা নেক আমলের নূর নিভিয়ে দেয়। আর মানুষের কর্ম বা আচরণ সেই হিংসাকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে। সুতরাং তোমরা যদি হিংসায় পড়েও যাও, তবে জুলুমে লিপ্ত হয়ো না। [বাহজাতুল মাজালিস, ইবনু আবদিল বার্র : ১/৪০৭]

হযরত মু‘আবিয়া রাযি. বলেন

كُلُّ النَّاسِ أَسْتَطِيعُ أَنْ أُرْضِيَهُ إِلَّا حَاسِدَ نِعْمَةٍ؛ فَإِنَّهُ لَا يُرْضِيهِ إِلَّا زَوَالُهَا

আমি সব মানুষকে সš‘ষ্ট করতে পারি, কিন্তু নেয়ামতের হিংসুককে নয়। কারণ তাকে সš‘ষ্ট করে শুধু ওই নেয়ামতটির ধ্বংস। [আল-ফাযিল : ১০০]

মুহাম্মাদ ইবনু সিরিন রহ. বলেন

مَا حَسَدْتُ أَحَدًا عَلَىٰ شَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا؛ لِأَنَّهُ إِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَكَيْفَ أَحْسُدُهُ عَلَى الدُّنْيَا وَهِيَ حَقِيرَةٌ فِي الْجَنَّةِ؟ وَإِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، فَكَيْفَ أَحْسُدُهُ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا وَهُوَ يَصِيرُ إِلَى النَّارِ؟

আমি কখনো দুনিয়ার কোনো বিষয়ে কাউকে হিংসা করিনি। কারণ—যদি সে জান্নাতি হয়, তবে দুনিয়ার তু”ছ জিনিসে তাকে হিংসা করব কেন? আর যদি সে জাহান্নামি হয়, তবে দুনিয়ার বিষয় নিয়ে তাকে হিংসা করাই বা কেন—যখন তার পরিণতি আগুন? [ইহয়াউ উলুমিদ্দীন : ৩/১৮৮]

হাসান বসরী রহ. বলেন

مَا رَأَيْتُ ظَالِمًا أَشْبَهَ بِمَظْلُومٍ مِنْ حَاسِدٍ؛ نَفَسٌ دَائِمٌ، وَحُزْنٌ لَازِمٌ، وَغَمٌّ لَا يَنْفَدُ

আমি হিংসুকের মতো আর কাউকে দেখিনি, যে জালিম হয়েও মজলুমের মতো জীবন কাটায়—তার দীর্ঘশ্বাস থামে না, দুঃখ লেগেই থাকে, আর দুশ্চিন্তার শেষ হয় না। [আল ইকদুল ফারীদ : ২/১৭০]

ফুযাইল ইবনু ইয়ায রহ. বলেন

الْغِبْطَةُ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْحَسَدُ مِنَ النِّفَاقِ، وَالْمُؤْمِنُ يَغْبِطُ وَلَا يَحْسُدُ، وَالْمُنَافِقُ يَحْسُدُ وَلَا يَغْبِطُ

গিবতা তথা অন্যের ভালো দেখে ভালো চাওয়া ঈমানের অংশ, আর হিংসা নিফাকের অংশ। মুমিন গিবতা করে, হিংসা করে না; আর মুনাফিক হিংসা করে, গিবতা করে না। [হিলয়াতুল আওলিয়া : ৮/৯৫]

আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক রহ. বলেন

كُلُّ الْعَدَاوَةِ قَدْ تُرْجَىٰ إِمَاتَتُهَا

إِلَّا عَدَاوَةَ مَنْ عَادَاكَ مِنْ حَسَدِ

فَإِنَّ فِي الْقَلْبِ مِنْهَا عُقْدَةً عُقِدَتْ

وَلَيْسَ يَفْتَحُهَا رَاقٍ إِلَى الْأَبَدِ

إِلَّا الْإِلَهُ، فَإِنْ يَرْحَمْ تُحَلَّ بِهِ

وَإِنْ أَبَاهُ فَلَا تَرْجُوهُ مِنْ أَحَدِ

সব শত্রুতা একদিন না একদিন শেষ হওয়ার আশা থাকে,

কিন্তু যে শত্রুতা হিংসা থেকে জন্মায়—তার নয়।

এটি অন্তরে এমন এক গিঁট বাঁধে,

যা কোনো চিকিৎসকও আজীবন খুলতে পারে না।

শুধু আল্লাহ যদি দয়া করেন তবে খুলতে পারেন,

আর তিনি যদি না চান—তবে কারো কাছেই আশা রেখো না। [ইন্টারনেট, মাউসুআ' আশ-শুআ'রা]

হিংসা এত বড় গুনাহ কেন?

হিংসা কেন এত ভয়ংকর ও মারাত্মক গুনাহ—যার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোরভাবে সতর্ক করে إِيَّاكُمْ শব্দ ব্যবহার করেছেন?

ওলামায়ে কেরাম লিখেছেন—হিংসার ভয়াবহতার দুটি মৌলিক কারণ রয়েছে।

১. الاعتراض على قدر الله আল্লাহর তাকদীরের উপর আপত্তি করা।

হিংসুক ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার তাকদীরের উপর প্রশ্ন তোলে। সে মনে মনে বলে বসে—আল্লাহ কেন তাকে এই নেয়ামত দিলেন? কেন তার তাকদীরে এই নেয়ামত লেখা হলো? অথচ বান্দা হওয়ার দাবি হলো—আল্লাহ তাআলার ফয়সালা ও তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকা। এই সন্তুষ্টিই ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২. ادعاء الاستحقاق নিজের অযোগ্য দাবি পেশ করা।

হিংসা করার মাধ্যমে হিংসুক যেন নিজের অধিকার দাবি করে বসে। সে মুখে না বললেও তার অন্তরের ভাষা এমন—এই নেয়ামত তার পাওয়ার কথা ছিল না; বরং আমার পাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—কোনো বান্দারই এই অধিকার নেই যে সে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে—কে কোন নেয়ামত পাবে। নেয়ামত বণ্টনের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ তাআলাই।

ঈর্ষা ও হিংসা-এর পার্থক্য

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝে নেওয়া জরুরি। আরবি ভাষায় দুটি শব্দ আছে—

১. غِبْطَةٌ (গিবতা) অর্থ : কারো ভালো কিছু দেখে নিজের জন্যও ওই ভালোটা কামনা করা, ঈর্ষা করা। যেমন—কারো সুন্দর পোশাক, ভালো বাড়ি, গাড়ি বা দীনী মর্যাদা দেখে এই দোয়া করা যে—আল্লাহ তাকে আরও বরকত দিন এবং আমাকেও অনুরূপ নেয়ামত দান করুন। এটি জায়েয, এতে কোনো গুনাহ নেই।

২. حَسَدٌ (হাসাদ) অর্থ : হিংসা করা। হিংসার বাস্তবতা হলো—অন্যের নেয়ামত নষ্ট হয়ে যাক, এই কামনা করা। অর্থাৎ, সে নেয়ামত আর তার কাছে না থাকুক—এই চাওয়াই হিংসা। এজন্যই হিংসা হারাম, মারাত্মক গুনাহ এবং আত্মার ধ্বংসের কারণ।

ঈর্ষার চমৎকার ঘটনা

হাফিজ ইবনু হাজর রহ. যখন হজে গেলেন, তখন তিনি নবীজির ﷺ এই হাদিসটি মনে করলেন

مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ

জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সেই উদ্দেশ্যই আল্লাহ পূরণ করেন। [ইবন মাজাহ : ৩০৬২] 

অর্থাৎ, জমজমের পানি পান করার সময় যে দোয়া করা হয়, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন।

এই বরকতময় সুযোগে হাফিজ ইবনু হাজর রহ. দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমাকে শামসুদ্দীন যাহাবি রহ.-এর মতো শক্তিশালী স্মৃতিশক্তি দান করুন। [তাবাকাতুল হুফ্ফাজ : ১/৫২২] 

অর্থাৎ, যাহাবি রহ. যেভাবে হাদিস মুখস্থ রাখতে পারতেন, আল্লাহ যেন তাকেও সেই রকম অসাধারণ হিফজের শক্তি দেন।

এটা কোনো হিংসা ছিল না। কারণ হিংসা তখন হয়, যখন কেউ চায়—অন্যের থেকে নেয়ামত চলে যাক। কিন্তু এখানে তিনি কী চাইছেন? তিনি বলছেন, হে আল্লাহ! যাহাবি রহ. পেয়েছেন, আমাকেও সেইরকম দান করে দিন।

এটা হচ্ছে ঈর্ষা—ভালো জিনিস দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া, নিজের জন্যও আল্লাহর কাছে চাওয়া। এটা কেবল জায়েয নয়; বরং সুন্দর ও প্রশংসনীয় মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

অন্যের নেয়ামত নষ্ট হোক—এই কামনা করা হারাম। আর অন্যের মতো ভালো কিছু পাওয়ার জন্য দোয়া করা—এটা ইবাদত।

দুটি প্রশংসনীয় ও ঈর্ষাযোগ্য নেয়ামত

হাদিসে পাকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন

لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ أَتَاهُ اللهُ الْقُرْآنَ، فَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَهُوَ يُنْفِقُهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ

দুটি বিষয় ছাড়া আর কোনো বিষয়ে হিংসা করা জায়েয নয়। (ওলামায়ে কেরাম ব্যাখ্যা করেছেন—এখানে হিংসা দ্বারা উদ্দেশ্য গিবতা অর্থাৎ ঈর্ষা করা।) 

একজন সেই ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআনের জ্ঞান দান করেছেন, সে রাতদিন কুরআন তিলাওয়াত করে এবং তার উপর আমল করে।

আর দ্বিতীয় ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন, আর সে সেই সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় রাতদিন খরচ করে। [সহীহ বুখারী : ৫০২৬] 

কেন এই দুই ব্যক্তি ঈর্ষার যোগ্য? কেননা, এই দুই বান্দা এমনই—যাদের দেখে ঈর্ষা করা জায়েয ও প্রশংসনীয়।

কুরআন জানা ও কুরআনের উপর আমলকারীকে দেখে একজন মুমিনের মনে এই আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত—হে আল্লাহ! আমাকেও তার মতো কুরআন জানা ও কুরআনের উপর আমলকারী বানিয়ে দিন।

অনুরূপভাবে আল্লাহর পথে দানকারী ধনী ও দানশীল ব্যক্তিকে দেখে এই কামনা করাও জায়েয—হে আল্লাহ! আমাকেও তার মতো আপনার রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করার তাওফিক দিন, আমাকেও সৃষ্টির খিদমতে নিজের মাল খরচ করার সামর্থ্য দিন।

এ ধরনের কামনাই হলো গিবতা বা ঈর্ষা, যা ঈমানের সৌন্দর্য।

ঈর্ষারও একটি সীমা আছে

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—ঈর্ষা (غبطة) ও হিংসা (حسد)-এর মাঝে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম। অনেক সময় মানুষ ঈর্ষা করতে করতে অজান্তেই হিংসার সীমায় প্রবেশ করে ফেলে, নিজেও বুঝতে পারে না।

এই কারণেই ওলামায়ে কেরাম বলেছেন—ঈর্ষারও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে ঈর্ষা ধীরে ধীরে হিংসায় পরিণত হয়।

হিংসার তিনটি স্তর

মুহাক্কিক ওলামায়ে কেরাম হিংসাকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছেন। সংক্ষেপে এর তিনটি প্রধান স্তর নিম্নরূপ—

১. হিংসার প্রথম স্তর সবচেয়ে জঘন্য ও ভয়ংকর। এই স্তরে হিংসুকের অন্তরে এই কামনা থাকে—যার প্রতি হিংসা করা হচ্ছে, তার কাছে থাকা দীনি বা দুনিয়াবি যে কোনো গুণ ও নেয়ামত, তা আমার কাছে আসুক বা না আসুক, কিন্তু যে করেই হোক তার কাছ থেকে তা নষ্ট হয়ে যাক।

এটি হিংসার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য রূপ। মুনাফিকরা এই ধরনের হিংসায় আক্রান্ত ছিল। তারা মুমিনদের ঈমানের সম্পদ ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহচর্যের নেয়ামত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কামনা করত। এই ধরনের হিংসা মুনাফিকের কাজ, মুমিনের নয়।

২. দ্বিতীয় স্তরও অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও মারাত্মক। এই স্তরে হিংসুক এই আশা করে—যার কাছে দীনি বা দুনিয়াবি নেয়ামত আছে, তা তার কাছ থেকে চলে এসে আমার কাছে চলে আসুক।

এটিও হিংসার অত্যন্ত খারাপ একটি রূপ। বদ বাতিন ইয়াহুদিরা এই ধরনের হিংসায় লিপ্ত ছিল। তারা চাইত—মুমিনদের কাছ থেকে ঈমানের নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হোক।

এই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেন

وَدَّ كَثِيرٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ

আহলে কিতাবদের অনেকেই চায়—তোমরা ঈমান আনার পর আবার কুফরের দিকে ফিরে যাও; এটি তাদের অন্তরের হিংসা, যদিও তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট হয়ে গেছে। [সূরা বাকারা : ১০৯]

আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেন

أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ

তারা কি মানুষের প্রতি হিংসা করে, সে সব নেয়ামতের কারণে যা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তাদের দান করেছেন? [সূরা নিসা : ৫৪]

এ থেকে বোঝা যায়— হিংসা সব নেয়ামতের ক্ষেত্রেই নিন্দনীয় ও হারাম। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ

আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে যে বিষয়ে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন—সে বিষয়ে তোমরা কামনা করো না। [সূরা নিসা : ৩২]

৩. হিংসার তৃতীয় স্তর হালকা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। এই স্তরে ব্যক্তির মনে এই ভাব থাকে—আমাকেও যেন এই নেয়ামত দান করা হয়; সে নেয়ামত তার কাছে থাকুক বা না থাকুক—এ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তবে এখানে পার্থক্য হলো—হিংসুকের অন্তরে কেবল জ্বালা ও কষ্ট অনুভূত হয়, কিš‘ সে কথায় বা কাজে তার প্রকাশ করে না। কাউকে ক্ষতি করে না। হিংসার ভিত্তিতে কোনো কাজও করে না।

এই স্তরের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, যদি কেউ নিজের সর্বোচ্ছ চেষ্টা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃতভাবে এই অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়ে যায়, কিন্তু তা দমন করে রাখে এবং কোনো অন্যায়ে লিপ্ত না হয়, তাহলে সে গুনাহগার হবে না। তাকে মা‘যূর তথা ক্ষমাযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হবে।

দুনিয়ার প্রথম গুনাহ

পৃথিবীর বুকে সংঘটিত সবচেয়ে প্রথম গুনাহ ছিল হত্যা, আর এই হত্যার মূল কারণও ছিল হিংসা।

কাবীল ও হাবীল—উভয়েই ছিলেন হযরত আদম আ.-এর পুত্র। দু’ভাই আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে কুরবানি পেশ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা হাবীলের কুরবানি কবুল করেন, কিন্তু কাবীলের কুরবানি কবুল করেননি।

এই বিষয়টি কাবীল সহ্য করতে পারেনি। তার অন্তরে হাবীলের প্রতি হিংসা জন্ম নেয়, যা শেষ পর্যন্ত তাকে ভাই হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধে লিপ্ত করে।

এই ঘটনাটি আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে এভাবে বর্ণনা করেছেন

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ، إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ، قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ، قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ

(হে নবী!) আপনি তাদের কাছে আদম আ.-এর দুই পুত্রের সত্য ঘটনা পাঠ করে শোনান। যখন তারা উভয়ে কুরবানি পেশ করেছিল, তখন একজনের (হাবীলের) কুরবানি কবুল করা হলো এবং অপরজনের (কাবীলের) কবুল করা হলো না। তখন সে (কাবীল) বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। অপরজন (হাবীল) বলল, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কেবল মুত্তাকীদের কাছ থেকেই কবুল করেন। [সূরা মায়িদা : ২৭]

এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম গুনাহের মূলে ছিল হিংসা।

নবীজি ﷺ ইমামুল আম্বিয়া হয়েও হিংসার শিকার হয়েছেন

রাসূলুল্লাহ ﷺ-কেও হিংসার শিকার হতে হয়েছে। ইহুদিদের রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি হিংসার মূল কারণ ছিল—তারা আশা করেছিল, শেষ নবী বনী ইসরাঈল ও বনী ইসহাকের বংশে আগমন করবেন। কিন্তু যখন নবুওয়াত বনী ইসমাঈলের বংশে দান করা হলো, তারা তা একেবারেই সহ্য করতে পারেনি।

এর ফলেই তারা নবী ﷺ-কে কষ্ট দিয়েছে। ষড়যন্ত্র করেছে। অপমান ও নির্যাতন করেছে। এমনকি তাঁর খাদ্যে বিষ পর্যন্ত মিশিয়েছে। এই বিষের প্রভাব রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অনুভব করেছেন। এসব কষ্টের মূল কারণও ছিল হিংসা।

যে যত মহান, তার হিংসুকও তত বেশি

এই কথাটি ভালোভাবে মনে রাখা দরকার—আল্লাহ তাআলা যাকে যত বেশি নেয়ামত দান করেন, তার হিংসুকের সংখ্যাও সাধারণত তত বেশি হয়।

এ কারণে আমাদের উচিত—

 অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনী থেকে বেঁচে থাকা

নেয়ামত গোপন রাখা

অহেতুক লোক দেখানো অনুষ্ঠান পরিহার করাআজ বাস্তবতা হলো—একটি বাড়ি বানালেই বড় বড় দাওয়াত, ছোটখাটো উপলক্ষেও পার্টি কালচার, শোরগোল, অপচয় ও প্রদর্শনীর ছড়াছড়ি—যা ইউরোপীয় সংস্কৃতির অনুকরণে আমাদের সমাজেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এমন পরিবেশে নজর লাগা ও হিংসার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

হযরত ইয়াকুব আ.-এর দূরদর্শী উপদেশ

কুরআনে আল্লাহ তাআলা এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা উল্লেখ করেছেন। হযরত ইয়াকুব আ. তাঁর ছেলেদের যখন মিসরের দিকে পাঠা”িছলেন—তখন তিনি শুধু খাদ্যের চিন্তা করেননি; বরং তাঁদের বদ-নজর ও হিংসুকের চোখ থেকেও বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন

يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِن بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَةٍ

হে আমার সন্তানরা! তোমরা সবাই এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না; বরং আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে প্রবেশ করো। [সূরা ইউসুফ : ৬৭]

ভাবুন একবার—একজন নবী, যিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখেন, তিনিও সতর্কতা অবলম্বন করছেন।

কারণ কী? কারণ একসাথে সুদর্শন, শক্তিশালী কয়েকজন ভাইকে দেখলে কারো হৃদয়ে হিংসা জ্বলে উঠতে পারে, আর সেই হিংসা থেকেই বদ-নজর জন্ম নিতে পারে।

হিংসামুক্ত থাকার কারণে জান্নাতের সুসংবাদ লাভ

আনাস রাযি. বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে বসে ছিলাম। তখন তিনি বললেন, ‘এখন তোমাদের সামনে জান্নাতিদের একজন আসবে।’

কিছুক্ষণ পর একজন আনসার সাহাবি এলেন। তার দাড়ি থেকে অজুর পানি টপকা”িছল, আর জুতা হাতে নিয়ে আসছিলেন।

পরের দিনও রাসূল ﷺ একই কথা বললেন, আর সেই একই ব্যক্তি আবার এলেন।

ত...তীয় দিনও ঠিক তাই ঘটল—রাসূল ﷺ বললেন, আর সেই লোকই এলেন।

এতে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি. কৌতূহলী হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এই মানুষটি এমন কী আমল করেন যে নবী ﷺ তাকে জান্নাতি বলে সাক্ষ্য দি”েছন?

তিনি কৌশলে ঐ লোকটির কাছে বললেন, ‘আমার বাবার সঙ্গে একটু মনোমালিন্য হয়েছে, তাই তিন দিন বাড়ি যেতে পারছি না। আপনি যদি আমাকে আপনার সঙ্গে থাকতে দেন...।’

লোকটি রাজি হয়ে গেলেন।

আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি. তিন রাত তার সঙ্গে থাকলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন—লোকটি রাতে বেশি নফল নামায পড়েন না। তাহাজ্জুদেও উঠেন না। তবে রাতে ঘুম ভাঙলে আল্লাহর যিকির করেন। সবসময় ভালো কথা বলেন, কারও বিরুদ্ধে কিছু বলেন না।

তিন দিন পর আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি. অবাক হয়ে বললেন, ‘আসলে আমার বাবার সঙ্গে কোনো ঝগড়া হয়নি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, আপনি এমন কী আমল করেন যার কারণে রাসূল ﷺ আপনাকে জান্নাতি বলেছেন। কিš‘ আমি তো আপনাকে খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না।’

তখন সেই সাহাবি বললেন, ‘আমি তো সেটাই করি যা তুমি দেখেছ।’

আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি. চলে যেতে লাগলে তিনি আবার ডেকে বললেন, একটা কথা আছে

مَا هُوَ إِلاَّ مَا رَأَيْتَ؛ غَيْرَ أَنِّي لا أَجِدُ فِي نَفْسِي لأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ غِشًّا، وَلا أَحْسُدُ أَحَدًا عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ

‘আমি আমার অন্তরে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ রাখি না, কারো প্রতি হিংসা করি না, আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তাতে আমি সন্তুষ্ট।’

তখন আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি. বললেন

هَذِهِ الَّتِي بَلَغَتْ بِكَ، وَهِيَ الَّتِي لا نُطِيقُ

এই গুণটাই আপনাকে ওই মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। আর এই গুণটাই আমরা ঠিকভাবে অর্জন করতে পারি না। [মুসনাদ আহমদ : ১২৭২০]

বোঝা গেল, পরিষ্কার অন্তর, হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত হৃদয়, মানুষের জন্য কল্যাণকামী মনোভাব—এই গুণগুলো আল্লাহর কাছে খুবই মূল্যবান।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হিংসা ও গোঁড়ামি থেকে রক্ষা করুন। যত রকমের আত্মিক ও শারীরিক রোগ আছে—সবগুলো থেকেই আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

হিংসার চিকিৎসা

মুহতারাম হাজিরীন! আজকের মজলিসে আমরা বুঝে নিয়েছি—হিংসা কী, এটা কত বড় রোগ এবং এর ক্ষতিগুলো কী কী। এখন আসুন, এর চিকিৎসা জেনে নিই।

১. তাকদিরের উপর সন্তুষ্ট থাকা

তাকদির মেনে নিলে হাসাদ আপনাআপনি দূর হয়ে যায়। মুমিনের প্রথম যে কথাটা মনে রাখা দরকার, তা হলো—আমি যখন কারও প্রতি হিংসা করি, তখন আসলে (নাউযুবিল্লাহ) আমি আল্লাহর তাকদিরের উপর আপত্তি করি। কিন্তু আমার আপত্তি করলে কি তাকদির বদলে যাবে? কখনোই না। বরং এতে ক্ষতি হবে কেবল আমারই।

কারণ আল্লাহ তাআলা যা কিছু নির্ধারণ করেন, তা আগেই তাকদিরে লেখা হয়ে গেছে। নবীজি ﷺ বলেছেন

رُفِعَتِ الأَقْلَامُ، وَجَفَّتِ الصُّحُفُ

তাকদির লেখার কলম তুলে নেওয়া হয়েছে, আর তাকদিরের লিখিত কাগজ শুকিয়ে গেছে। [তিরমিযী : ২৫১৬]

অর্থাৎ—এখন আর কিছু বদলানোর সুযোগ নেই। কার কী রিজিক, কার কী মর্যাদা, কার কী নসিব—সব আগেই নির্ধারিত। তাই হিংসা করে তাকদির বদলানো যাবে না, কিন্তু নিজের ঈমান, আমল ও অন্তরের শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে। মুমিনের আসল পরিচয় হলো—তাকদিরের উপর সš‘ষ্ট থাকা। যে ব্যক্তি আল্লাহর ফয়সালার উপর খুশি থাকে, সে কখনো হিংসুক হতে পারে না।

نہ تو ہجر ہی اچھا ، نہ وصال اچھا

یار جس حال میں رکھے وہی حال اچھا

না বিচ্ছেদ ভালো, না মিলনই ভালো—

প্রিয় যিনি যেমন রাখেন, সেই অবস্থাই ভালো।

২. দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব মনে রাখা

হিংসা থেকে বাঁচার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো—সবসময় মনে রাখা যে দুনিয়ার সব নিয়ামতই ক্ষণস্থায়ী। এগুলো খুব অল্প সময়ের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন

وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ

আখিরাতই উত্তম এবং চিরস্থায়ী। [সূরা আ’লা : ১৭]

অতএব, আমি যদি হিংসা করার বদলে নেক আমলে মশগুল থাকি, তাহলে আখিরাতে এমন নিয়ামত পাবো—যা কখনো শেষ হবে না। কারূনের ঘটনা আমাদের সামনে বড় উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা তাকে প্রচুর দুনিয়াবি সম্পদ দিয়েছিলেন। মানুষ তাকে দেখে আফসোস করে বলত

يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ

হায়! আমাদেরও যদি কারূনের মতো সম্পদ হতো! [সূরা কাসাস : ৭৯]

কিন্তু নেককার লোকেরা তখন বলেছিল

ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ

আল্লাহর দেওয়া সওয়াবই উত্তম। [সূরা কাসাস : ৮০]

কারণ সেটাই চিরস্থায়ী। আর দুনিয়ার সম্পদ? এটা তো কয়েক দিনের আলো, তারপরই অন্ধকার রাত।

দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব বুঝতে একটি সহজ উদাহরণ নিন। ধরুন, আমরা একটি বাসে সফর করছি। একটি সিট খালি ছিল, কিন্তু আমাদের আগে কেউ এসে বসে গেছে। আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তখন আমরা মনে মনে বলি—আর একটু দাঁড়ালেই তো নামতে হবে, বেশি দূর না। ঠিক তেমনি, দুনিয়াও একটা সাময়িক সফর। এখানে যদি কিছু সুযোগ-সুবিধা না-ও পাই—তাতে কী এমন বড় ক্ষতি হয়ে গেলচ

৩. মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা

হিংসার একটি কার্যকর চিকিৎসা হলো—মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। হযরত আবুদ্দারদা রাযি. বলেন

مَنْ أَكْثَرَ مِنْ ذِكْرِ الْمَوْتِ قَلَّ حَسَدُهُ وَقَلَّ فَرَحُهُ

যে ব্যক্তি মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করে, তার হিংসা কমে যায় এবং দুনিয়ার আনন্দ তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। [মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা : ৮/১৬৮]

ধরুন—দুই আপন ভাই। হিংসার কারণে পরস্পরের শত্রু। এক ভাই আরেক ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলা জজ কোর্ট, হাই কোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছে। এখন প্রশ্ন—রাতের বেলা যদি একজন ভাবে, ‘আমি আর কয়দিন বাঁচবো?’ পরদিন সকালে কি দু’জনের আচরণ আগের মতো থাকবে?

স্পষ্ট—না। কারণ মৃত্যুচিন্তা মানুষকে বাস্তববাদী করে তোলে। তখন অহংকার নরম হয়, হিংসার তীব্রতা কমে যায়।

সুতরাং বোঝা গেল, হিংসার একটি বাস্তব ও কার্যকর চিকিৎসা হলো মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা।

৪. দুনিয়াবি বিষয়ে নিজের চেয়ে নিচের দিকে তাকানো

হিংসা থেকে বাঁচার আরেকটি কার্যকর উপায় হলো—দুনিয়ার বিষয়ে সবসময় নিজের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদের দিকে তাকানো। এতে কৃতজ্ঞতা জন্মায় আর হিংসা দূর হয়।

যেমন—কারও ঘর যদি কাঁচা হয়, আর আমার ঘর যদি পাকা হয়—আমি আল্লাহর শোকর আদায় করব।

যদি কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ দেখি—সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেব যে তিনি আমাকে সু¯’ দেহ দিয়েছেন। এই সময় বড় বড় বাড়ি, গাড়ি, ধনীদের দিকে তাকাবো না। নইলে মনে কষ্ট আসবে—আমার তো এসব নেই! আর এখান থেকে মনে জন্ম নিবে হিংসা।

৫. যার প্রতি হিংসা হয়, তার জন্য দোয়া করা

হিংসা দূর করার একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর চিকিৎসা হলো—যার প্রতি হিংসা হয়, তার জন্য আড়ালে দোয়া করা। মানুষের সামনে তার ভালো দিকগুলো মনে না চাইলেও বলা। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, উপকার করা। সালামে আগে বাড়িয়ে দেওয়া। এটা আমাদের সালাফ ও বুজুর্গদের পরীক্ষিত আমল। ইনশাআল্লাহ, এতে করে হৃদয় থেকে হিংসা দূর হয়ে যাবে।

৬. মুআওয়িযাতাইন পড়ার আমল

নিয়মিত সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ার অভ্যাস করুন। বিশেষ করে সূরা ফালাকে আল্লাহর কাছে হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হিংসা থেকে রক্ষা করুন। হিংসুক হওয়া থেকেও রক্ষা করুন আর হিংসার শিকার হওয়া থেকেও হেফাজত করুন। যে কথাগুলো বলা হলো—সেগুলোর ওপর আমল করার তাওফিক আল্লাহ আমাদের সবাইকে দান করুন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।

وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين

#মুসলিম বাংলা