দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়
কুরআন মাজীদ আল্লাহ তা'আলার কালাম। এ কালাম অত্যন্ত বরকতপূর্ণ। সমগ্র কুরআন তো বটেই, এর একেকটি সূরাই অশেষ কল্যাণময়। এক হাদীছে সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াতের ফযীলত বলা হয়েছে যে, তা মুখস্থ রাখলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। আল্লাহু আকবার! এটা কত বড় ফযীলত, তা কি অনুমান করা সম্ভব? দাজ্জালের ফিতনা সর্বকালের সবচে' ভয়ংকর। নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا بَيْنَ خَلْقِ آدَمَ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ خَلْقٌ أَكْبَرُ مِنَ الدَّجَّال
'আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় ভয়ংকর কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেননি। (সহীহ মুসলিম: ২৯৪৬)
দাজ্জাল এতটা ভয়ংকর হওয়া সত্ত্বেও মাত্র দশটি আয়াত মুখস্থ রাখার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে তার ফিতনা থেকে রক্ষা করবেন। অর্থাৎ দাজ্জাল তার ভয়ংকর দাপট ও হাজারও ভেলকি দেখিয়েও তার ঈমান হরণ করতে পারবে না। সে তার মহা বিভ্রান্তিকর কাণ্ডকারখানা দ্বারাও তাকে ঈমান থেকে টলাতে সক্ষম হবে না।
এক হাদীছে তো সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করার কথা বলা হয়েছে। অপরদিকে হযরত আবূদ দারদা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ قَرَأَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ آخِرِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ.
যে ব্যক্তি সূরা কাহফের শেষের দশ আয়াত পড়বে, তাকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করা হবে। (সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮৬)
উভয় বর্ণনার মধ্যে কোনও বৈপরিত্য নেই। কেননা একই ফযীলত সূরাটির প্রথমাংশ ও শেষাংশ উভয়ের মধ্যেই থাকা অসম্ভব কিছু নয়। কাজেই সূরাটির প্রথম দশ আয়াত পড়ার দ্বারা যেমন দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, তেমনি শেষের দশ আয়াত দ্বারাও একই উপকার লাভ হবে।
অপর এক হাদীছে সূরাটির প্রথম তিন আয়াতের বেলায়ও অভিন্ন ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবূদ দারদা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ قَرَأَ ثَلَاثَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ
যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম তিন আয়াত পড়বে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। (জামে' তিরমিযী: ২৮৮৬)
এটা বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অপরিসীম রহমতেরই প্রকাশ। তিনি অতি সহজ সহজ আমলের অসিলায়ও বান্দাকে অকল্পনীয় কল্যাণ দান করে থাকেন।
দাজ্জালের ফিতনা থেকে আত্মরক্ষার জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ শিক্ষা দিয়েছেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَعَذَابِ الْقَبْرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি জাহান্নামের আযাব ও কবরের আযাব থেকে। আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি মাসীহুদ দাজ্জালের ফিতনা থেকে এবং আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি জীবন ও মরণের পরীক্ষা থেকে। (সহীহ বুখারী: ৮৩২)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যেভাবে কুরআনের কোনও সূরা শেখাতেন, তেমনিভাবে এ দু'আটিও শিক্ষা দিতেন।
দাজ্জালের আবির্ভাব সম্পর্কিত কিছু হাদীছ
দাজ্জাল কিয়ামতের সর্ববৃহৎ আলামতসমূহের একটি। একদম শেষ যমানায় তার আত্মপ্রকাশ ঘটবে। তার ফিতনা সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর হওয়ার কারণে সমস্ত নবী-রাসূল আপন আপন উম্মতকে তার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী হওয়ায় অধিকতর স্পষ্টভাবে তার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাকে চেনার আলামতসমূহও বলে দিয়েছেন।
দাজ্জাল কোথা হতে আত্মপ্রকাশ করবে, সে সম্পর্কে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
الدَّجَّالُ يَخْرُجُ مِنْ أَرْضِ بِالْمَشْرِقِ يُقَالُ لَهَا : خَرَاسَانُ.
দাজ্জাল বের হবে পূর্বাঞ্চলীয় এক ভূমি থেকে, যার নাম খুরাসান। (জামে' তিরমিযী: ২২৩৭)
হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি, বর্ণিত হাদীছে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
يَخْرُجُ الدَّجَّالُ مِنْ يَهُودِيَّةِ أَصْبَهَانَ، وَمَعَهُ سَبْعُونَ أَلْفًا مِنَ الْيَهُودِ.
দাজ্জাল বের হবে ইস্পাহানের ইহুদী সম্প্রদায় থেকে। তার সঙ্গে থাকবে সত্তর হাজার ইহুদী। (তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৯৩০; মুসনাদুল বাযযার: ৬৪১৬; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৩৬৩৯; হাকিম, আল মুসতাদরাক ৮৬১১)
এ হাদীছদু'টির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। কেননা ইস্পাহান ইরানের খোরাসান অঞ্চলেরই অন্তর্গত একটি জায়গার নাম।
উল্লেখ্য, এটা হবে তার প্রথম প্রকাশ। তখন তার ফিতনা খুব বেশি বিস্তার লাভ করবে না। সে এখান থেকে বিপুলসংখ্যক অনুগামী নিয়ে শামের দিকে চলে যাবে। হযরত নাউওয়াস ইবন সাম'আন রাযি, বর্ণিত এক হাদীছে আছে- يَخْرُجُ مِنْ خلَّةٍ بَيْنَ الشَّامِ وَالْعِرَاق (সে শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী এক ফাঁকা স্থান থেকে বের হবে)। خلَّة অর্থ শূন্যস্থান, পথ। পার্বত্য এলাকায় সাধারণত উপত্যকা দিয়ে চলাফেরা করা হয়। এ হাদীছে সম্ভবত কোনও এক উপত্যকার কথা বলা হয়েছে। দাজ্জাল হয়তো তার চূড়ান্ত আবির্ভাবকালে শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী কোনও উপত্যকাকে ঘাঁটি বানাবে। সেখান থেকেই সে চারদিকে ফিতনা-ফাসাদ বিস্তার করে বেড়াবে।
দাজ্জালের প্রকাশ কখন হবে, সে সম্পর্কে এক দীর্ঘ হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- মুসলিমগণ এমন একটি নগরে অভিযান চালাবে, যার এক প্রান্ত সাগরে, অন্য প্রান্ত স্থলে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সে নগরে বিজয় দান করবেন। তারা সেখানে গনীমত লাভ করবে। তারা গনীমতের সম্পদ বণ্টনে রত থাকবে, এ অবস্থায় হঠাৎ করে তাদের কাছে চিৎকার পৌছাবে যে, দাজ্জাল বের হয়ে পড়েছে। তখন তারা সবকিছু ফেলে রেখে ফিরে আসবে। (সহীহ মুসলিম : ২৯২০)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদীর্ঘ এক হাদীছে দাজ্জালের বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করেছেন। হযরত নাউওয়াস ইবন সামআন রাযি. থেকে বর্ণিত সে হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সকাল বেলা দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি সে আলোচনায় কখনও স্বর নিচু করলেন এবং কখনও উঁচু করলেন। এমনকি আমরা মনে করলাম সে হয়তো সামনের খেজুর বাগানের ভেতরেই আছে। ক্ষণিক পরে আমরা যখন তাঁর কাছে আসলাম, তখন তিনি আমাদের উপর ভয়ের ছাপ দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কী হয়েছে? আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আজ সকালে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তাতে নিজ আওয়াজ নিচু করলেন এবং উঁচু করলেন। এমনকি আমরা মনে করলাম, সে হয়তো খেজুর বাগানের ভেতরেই আছে। তিনি বললেন, তোমাদের সম্পর্কে দাজ্জাল নয়; বরং অন্য কিছু আমার কাছে বেশি ভয়ের কারণ। যদি সে আমার জীবদ্দশায় বের হয়, তবে আমি তোমাদের পক্ষে তাকে প্রতিরোধ করব। আর যদি সে এমন সময় বের হয়, যখন আমি তোমাদের মধ্যে থাকব না, তবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করবে। অবশ্য প্রত্যেক মুসলিমের উপর আল্লাহ তা'আলাই আমার স্থলাভিষিক্ত হবেন। সে হবে কোঁকড়ানো চুলের এক যুবক। তার একটি চোখ হবে ভাসমান। আমি যেন তাকে আব্দুল উযযা ইবন কাতানের সাথে তুলনা করছি।
তোমাদের মধ্যে যে-কেউ তাকে পাবে, সে যেন তার উপর সূরা কাহফের শুরুর আয়াতগুলো পাঠ করে। সে শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী এক স্থান থেকে বের হবে। তারপর সে ডানে-বামে ফিতনা বিস্তার করবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অবিচল থেকো। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পৃথিবীতে তার অবস্থান কতকাল হবে? তিনি বললেন, চল্লিশ দিন। তার একদিন হবে এক বছরের সমান। একদিন এক মাসের সমান। একদিন এক সপ্তাহের সমান অন্য সব দিন হবে তোমাদের সাধারণ দিনগুলোর মতো।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে দিনটি এক বছরের সমান হবে, সে দিনে কি আমাদের এক দিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, না, তোমরা সে দিনের জন্য নামাযের ওয়াক্তসমূহ পরিমাপ করে নেবে। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পৃথিবীতে তার গতি হবে কেমন? তিনি বললেন, বাতাস তাড়িত বৃষ্টির মতো।
সে একদল লোকের কাছে আসবে এবং তাদেরকে দাওয়াত দেবে। তার তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তার ডাকে সাড়া দেবে। তখন সে আকাশকে হুকুম দিলে আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে। ভূমিকে হুকুম দেবে। ভূমি ফসল উৎপন্ন করবে। তাদের পশুপাল সন্ধ্যাবেলা তাদের কাছে এমনভাবে ফিরে আসবে যে, তাদের কুঁজগুলো আগের তুলনায় বেশি লম্বা হবে এবং ওলান হবে (দুধে) অধিকতর পরিপূর্ণ আর কোমর হবে অধিকতর চওড়া।
তারপর সে অপর একদল লোকের কাছে আসবে। তাদেরকেও দাওয়াত দেবে, কিন্তু তারা তার কথা প্রত্যাখ্যান করবে। তখন সে তাদের কাছ থেকে ফিরে যাবে। তখন তারা এমন অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়বে যে, তাদের হাতে তাদের সম্পদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সে এক পতিত ভূমির উপর দিয়ে যাবে আর বলবে, তুমি তোমার অভ্যন্তরে যা-কিছু সম্পদ আছে তা বের করে দাও। ফলে সে ভূমির ধনভাণ্ডারসমূহ তার অনুগামী হবে, যেমন মৌমাছিরা তাদের নেতার অনুগমন করে থাকে।
তারপর সে এক পরিপূর্ণ যুবককে দাওয়াত দেবে। সে তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করবে। ফলে যুবকটি দু'টুকরো হয়ে দু'দিকে ছিটকে পড়বে- তিরের লক্ষ্যবস্তু সমান দূরত্বে। তারপর সে যুবকটিকে ডাক দেবে। ফলে সে তার দিকে ঝলমল চেহারায় হাসতে হাসতে এগিয়ে আসবে। ঠিক এ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা মাসীহ ইবন মারয়ামকে পাঠাবেন। তিনি দামেশকের পূবদিকে সাদা মিনারার কাছে নেমে আসবেন। তাঁর পরিধানে থাকবে দু'টি জাফরানি কাপড়। তাঁর দুই হাত থাকবে দুই ফিরিশতার ডানায়। যখন তিনি মাথা নিচু করবেন, তখন মাথা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরবে। আর যখন মাথা উঁচু করবেন, তখন মুক্তার দানার মতো পানি নেমে আসবে। যে কাফেরেরই গায়ে তাঁর নিঃশ্বাস লাগবে, তার অবশ্যই মৃত্যু ঘটবে। তাঁর নিঃশ্বাস পৌঁছবে দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করবেন। বাবুল লুদ্দ নামক স্থানে তাকে পেয়ে যাবেন। সেখানে তাকে হত্যা করবেন। (সহীহ মুসলিম: ২৮৩৭)
এ হাদীছটি দ্বারা আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারি। যেমন সে হবে এক সুঠামদেহী যুবক। একটি চোখ চামড়া দিয়ে ঢাকা থাকবে। অন্য চোখ থাকবে আঙুরের দানার মতো ভাসমান। পৃথিবীর চারদিকে সে ফিতনা বিস্তার করবে। সর্বমোট ৪০ দিন সে থাকবে। তার প্রথম দিন এক বছর, দ্বিতীয় দিন এক মাস ও তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। তার হুকুমে বৃষ্টি বর্ষিত হবে ও প্রচুর ফল-ফসল জন্মাবে। তার নির্দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। সে মৃত মানুষকে জীবিত পর্যন্ত করে দেখাবে। এ সম্পর্কে এক দীর্ঘ হাদীছে আছে-
وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يَقُولَ لأَعْرَابِيٍّ أَرَأَيْتَ إِنْ بَعَثْتُ لَكَ أَبَاكَ وَأُمَّكَ أَتَشْهَدُ أَنِّي رَبُّكَ فَيَقُولُ نَعَمْ . فَيَتَمَثَّلُ لَهُ شَيْطَانَانِ فِي صُورَةِ أَبِيهِ وَأُمِّهِ فَيَقُولاَنِ يَا بُنَىَّ اتَّبِعْهُ فَإِنَّهُ رَبُّكَ .দাজ্জালের একটা ফিতনা হবে এরকম যে, সে এক বেদুঈনকে বলবে, আমি যদি তোমার পিতা-মাতাকে কবর থেকে জীবিত করে উঠাই, তবে কি তুমি স্বীকার করবে যে, আমি তোমার রব্ব? সে বলবে, হাঁ। তখন দু'টি শয়তান (দুষ্ট জিন) তার সামনে তার পিতামাতার আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করবে। তারা বলবে, ওহে বাছা। তুমি এর অনুসরণ করো। কেননা সে তোমার রব্ব। (সুনানে ইবন মাজাহ: ৪০৭৭)
দাজ্জাল নিজেকে রব্ব বলে দাবি করবে। তার হাতে অলৌকিক অনেক ঘটনা দেখে মূর্খ শ্রেণির লোক তার উপর ঈমান আনবে। তারা সত্যিকারের রব্ব আর এ মিথ্যাবাদী রব্বের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না। প্রকৃত মুমিনগণ যাতে পার্থক্য করতে পারে, সে লক্ষ্যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু নিদর্শন বলে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا بُعِثَ نَبِيٌّ إِلَّا أَنْذَرَ أُمَّتَهُ الأَعْوَرَ الكَذَّابَ، أَلاَ إِنَّهُ أَعْوَرُ، وَإِنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ، وَإِنَّ بَيْنَ عَيْنَيْهِ مَكْتُوبٌ كَافِرٌ»
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা এমন কোনও নবী পাঠাননি, যিনি তাঁর উম্মতকে মহা মিথ্যুক কানা দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেননি। শোনো! সে হবে কানা। আর তোমাদের প্রতিপালক কানা নন। দাজ্জালের দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে কাফের। (সহীহ বুখারী: ৭১৩১)
'কাফের' লেখাটা প্রকৃত মুমিন দেখতে পাবে। এমনকি নিরক্ষর মুমিনও আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে তা পড়তে সক্ষম হবে। কানা হওয়াটা এবং কাফের লেখা থাকাটা দাজ্জালের এমনই অকাট্য আলামত, যা দেখার পর কোনও মুমিন ব্যক্তি দাজ্জালের কোনওরূপ ভেলকিবাজিতে বিভ্রান্ত হবে না। সর্বাবস্থায় তার ঈমান থাকবে অটুট। এরূপ এক মুমিন সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানান-
وَإِنَّ مِنْ فِتْنَتِهِ أَنْ يُسَلَّطَ عَلَى نَفْسٍ وَاحِدَةٍ، فَيَقْتُلَهَا، وَيَنْشُرَهَا بِالْمِنْشَارِ، حَتَّى يُلْقَى شقتين، ثُمَّ يَقُولَ: انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي هَذَا، فَإِنِّي أَبْعَثُهُ الْآنَ، ثُمَّ يَزْعُمُ أَنَّ لَهُ رَبًّا غَيْرِي، فَيَبْعَثهُ اللهُ، وَيَقُولُ لَهُ الْخَبِيثُ مَنْ رَبُّكَ ؟ فَيَقُولُ رَبِّيَ اللَّهُ، وَأَنْتَ عَدُوٌّ اللَّهِ، أنتَ الدَّجَّالُ، وَاللهِ مَا كُنْتُ بَعْدُ أَشَدَّ بَصِيرَةً بِكَ مِنِّي الْيَوْمَ، قَالَ أَبُو الْحَسَنِ الطَّنَافِسِيُّ: فَحَدَّثَنَا الْمُحَارِبِيُّ قَالَ: حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللهِ بْنُ الْوَلِيدِ الْوَصَّافِيُّ، عَنْ عَطِيَّةَ. عَنْ أَبِي سَعِيدٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ذَلِكَ الرَّجُلُ أَرْفَعُ أُمَّتِي دَرَجَةً فِي الْجَنَّةِ
'তার আরেকটা ফিতনা হবে এরকম যে, সে এক ব্যক্তির উপর নিজ ক্ষমতা আরোপ করবে। সে তাকে হত্যা করবে। করাত দিয়ে চিড়ে ফেলবে। ফলে সে দু'ভাগ হয়ে পড়ে যাবে। তারপর বলবে, তোমরা আমার এ দাসটার দিকে লক্ষ করো। আমি তাকে পুনর্জীবিত করব। তারপরও সে দাবি করবে, আমি ছাড়া তার একজন রব্ব আছে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনর্জীবিত করবেন। এ অবস্থায় খবীছ দাজ্জাল তাকে বলবে, তোমার রব্ব কে? সে বলবে, আমার রব্ব আল্লাহ আর তুমি আল্লাহর শত্রু, তুমি দাজ্জাল। আল্লাহর কসম। আজকের তুলনায় তোমার অবস্থা আমার কাছে বেশি পরিষ্কার আর কখনও ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাতে আমার উম্মতের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা উচ্চমর্যাদার অধিকারী হবে। (সুনানে ইবন মাজাহ: ৪০৭৭)
দাজ্জাল সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহের আলোকে ইমাম ইবন কাছীর রহ. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে বলেন- "মুসলিমদের কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। তার শুরুটা হবে ইস্পাহানের ইয়াহুদিয়া নামক এক জনপদ থেকে। সেখানকার সত্তর হাজার ইহুদী তাকে সমর্থন করবে। তারা হবে অস্ত্রসজ্জিত ও জুব্বা পরিহিত। তাছাড়া সত্তর হাজার তাতারিসহ খুরাসানের বহু লোক তার সহযোগী হবে। প্রথমে সে একজন নেককার লোকরূপে আত্মপ্রকাশ করবে। তারপর সে এক প্রতাপশালী রাজারূপে ক্ষমতাসীন হবে। তারপর সে নবুওয়াত দাবি করবে। শেষটায় নিজেকে রব্ব বলে ঘোষণা করবে। অজ্ঞ ও নির্বোধ জনসাধারণ তাকে মেনে নেবে। কিন্তু যেসব নেককার লোককে আল্লাহ তা'আলা হিদায়াত দান করবেন, তারা তার বিরোধিতা করবে। সে একের পর এক নগর, দুর্গ জয় করবে। জয় করতে থাকবে একের পর এক দেশ। মক্কা ও মদীনা ছাড়া কোনও দেশ তার আধিপত্যের বাইরে থাকবে না।"
দাজ্জাল যেসকল স্থানে যেতে পারবে না
পবিত্র মক্কা ও মদীনা মুনাউওয়ারায় তার প্রবেশ করার ক্ষমতা হবে না। এমনকি মদীনা মুনাউওয়ারায় যারা বাস করবে, তাদের উপর দাজ্জালের প্রভাবও পড়বে না। হযরত আবূ বাকরা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا يَدْخُلُ الْمَدِينَةَ رُعْبُ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، لَهَا يَوْمَئِذٍ سَبْعَةُ أَبْوَابٍ، عَلَى كُلِّ بَابِ مَلَكَانِ
মদীনায় দাজ্জালের ভীতিকর প্রভাব পৌঁছবে না। তখন মদীনার থাকবে সাতটি প্রবেশদ্বার। প্রত্যেক দ্বারে দু'জন ফিরিশতা নিয়োজিত থাকবে। (সহীহ বুখারী: ১৮৭৯)
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
عَلَى أَنْقَابِ الْمَدِينَةِ مَلَائِكَةٌ لَا يَدْخُلُهَا الطَّاعُوْنُ، وَلَا الدَّجَّالُ
মদীনার পথে পথে ফিরিশতা নিয়োজিত। তাতে প্লেগ ও দাজ্জাল ঢুকতে পারবে না। (সহীহ বুখারী: ১৮৮০)
দাজ্জাল মদীনা মুনাউওয়ারায় প্রবেশের চেষ্টা অবশ্যই করবে। কিন্তু ফিরিশতাগণ বাধা দেওয়ায় প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। অগত্যা সে মদীনার উপকণ্ঠে ছাউনি ফেলবে। এ সম্পর্কে হযরত আনাস রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
«يَجِيءُ الدَّجَّالُ، حَتَّى يَنْزِلَ فِي نَاحِيَةِ المَدِينَةِ، ثُمَّ تَرْجُفُ المَدِينَةُ ثَلاَثَ رَجَفَاتٍ، فَيَخْرُجُ إِلَيْهِ كُلُّ كَافِرٍ وَمُنَافِقٍ»
'দাজ্জাল এসে মদীনার উপকণ্ঠে অবস্থান গ্রহণ করবে। অতঃপর মদীনা তিন বার প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠবে। তখন এখান থেকে প্রত্যেক কাফের ও মুনাফিক বের হয়ে দাজ্জালের কাছে চলে যাবে। (সহীহ বুখারী: ৭১২৪)
এক হাদীছ দ্বারা আরও দু'টি স্থানে দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না বলে জানা যায়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
وَإِنَّهُ لَا يَقْرَبُ أَرْبَعَةَ مَسَاجِدَ : مَسْجِدَ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدَ الرَّسُولِ، وَمَسْجِدَ الْمَقْدِسِ وَالطُّورِ.
'সে চারটি মসজিদের নিকটবর্তী হতে পারবে না- মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুর রাসূল, বায়তুল মুকাদ্দাস ও তুর পাহাড়ের মসজিদ। (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৮৩)