যে নামাজে হৃদয়ে প্রশান্তি মেলে
নামাজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম এবং ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হাদিসে নামাজকে মুসলমান ও অবিশ্বাসীর মাঝে পার্থক্যকারী বলা হয়েছে। নামাজ শুধু মুসলমানের পরিচয় নির্ণায়ক বিষয়ই নয়, বরং তার আছে সুগভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। নামাজ মুমিনের আত্মিক প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের মাধ্যম। তবে শর্ত হলো তার নামাজ হবে সজীব ও সপ্রাণ।
নামাজে মুমিনের প্রশান্ত
নামাজে আছে মুমিন হুদয়ের প্রশান্তি। কেননা নামাজের মাধ্যমে, বিশেষত সেজদারত অবস্থায় মুমিন আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। এজন্য মহানবী (সা.) বলতেন, ‘নামাজে রাখা হয়েছে আমার চোখের প্রশান্ত।' (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩৯৩৯)
অন্য হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলতেন, ‘হে বেলাল! নামাজ কায়েম কোরো, আমরা এর মাধ্যমে প্রশান্ত লাভ করতে পারব।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৮৫)
হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, মুমিন নামাজে প্রবেশের মাধ্যমে প্রশান্ত পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের মাধ্যমে প্রশান্ত পেতেন। কেননা নামাজে আল্লাহর নিবিড় নৈকট্য আছে। (মিরআতুল মাফাতিহ : ৪/২৫৫)
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেন, ‘নামাজ আল্লাহপ্রেমীদের চোখের প্রশান্ত, একত্ববাদে বিশ্বাসীদের অন্তরের স্বাদ, সাদিকিনদের জন্য পরীক্ষা, আল্লাহসাধকদের অবস্থার পরিমাপক। নামাজ বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি নিজেই নামাজের দিকে তাদেরকে পথ দেখিয়েছেন, তাদেরকে নামাজ শিখিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি তাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং তাদেরকে সম্মানিত করেছেন।' (জওকুস সালাত, পৃষ্ঠা ৯)
যে নামাজে হুদয়ের প্রশান্ত
কিছু বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে নামাজ সজীব ও সপ্রাণ হয়ে ওঠে। ফলে মুমিন এর মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্ত লাভ করতে পারে। যেমন-
১. খুশু বিশিষ্ট নামাজ : খুশু নামাজসহ সব ইবাদতের প্রাণ। পবিত্র কোরআনে নামাজে খুশু অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘মুমিনরা সফল, যারা তাদের নামাজে বিনয়ী।' (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ১-২)
আলেমরা বলেন, খুশু হলো সম্মিলিতভাবে চারটি জিনিসের নাম। তা হলো একাগ্রতা, বিনয়, নম্রতা ও ধীরস্থিরতা।
২. ইখলাসপূর্ণ নামাজ : মুমিন নামাজে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ নিয়ত ও পূর্ণ ইখলাসের সঙ্গে নামাজ পড়লে প্রশান্ত খুঁজে পাবে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্র হয়ে একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করতে এবং নামাজ কায়েম করতে, জাকাত দিতে। এটাই সঠিক দ্বীন।' (সুরা বাইয়িনাহ, আয়াত : ৫)
৩. আলস্যহীন নামাজ : অমনোযোগ, আলস্য ও উদাসীনতার সঙ্গে নামাজ আদায় করলে সে নামাজ অন্তরের প্রশান্ত হতে পারে না, বরং তা অন্তরের অস্থিরতা বৃদ্ধি করে। এজন্য আল্লাহ বলেছেন, ‘সুতরাং দুর্ভোগ সেই নামাজ আদায়কারীদের, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন এবং যারা তা লোক দেখানোর জন্য আদায় করে।' (সুরা মাউন, আয়াত : ৪-৬)
৪. শেষ নামাজ মনে করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে মৃত্যুকে স্মরণ করতে বলেছেন এবং প্রত্যেক নামাজকে জীবনের শেষ নামাজ জ্ঞান করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা এর মাধ্যমে ব্যক্তি অন্তর থেকে পার্থিব চিন্তা দূর করা সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন তুমি শেষ নামাজ (জ্ঞান করে তা) আদায় করবে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৭১)
৫. আল্লাহর স্মরণ বিশিষ্ট নামাজ : যে নামাজ আল্লাহর স্মরণ বিহীন নামাজ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়, তার দ্বারা মুমিনের অন্তরে কোনো প্রশান্তিও আসে না। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘সুতরাং তুমি আমার ইবাদত কোরো এবং আমার স্মরণে নামাজ আদায় কোরো।' (সুরা তাহা, আয়াত : ১৪)
৬. নবীজি (সা.)-এর অনুসরণে নামাজ : মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ ছাড়া কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা তিনিই বিশুদ্ধতার মাপকাঠি। নামাজও তার ব্যতিক্রম নয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় কোরো, যেভাবে নামাজে নামাজ আদায় করতে দেখো।' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০০৮)
৭. ধ্যান বিশিষ্ট নামাজ : মুরাকাবা বা ধ্যানের মাধ্যমে নামাজ মুমিনের জন্য ‘মিরাজ' (আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম) হয়ে ওঠে। এজন্য মহানবী (সা.) নামাজে মুরাকাবা বা ধ্যানের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার চেহারাকে নামাজরত বান্দার চেহারার দিকে নিবিষ্ট রাখেন যতক্ষণ না বান্দা অমনোযোগী হয়।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৬৩)
৮. পরিবাটি ব্যক্তির নামাজ : পবিত্রতা নামাজের পূর্ব শর্ত। তবে নামাজের জন্য শুধু অজু-গোসলই যথেষ্ট নয়, বরং বান্দা নিজের সাধ্য মতো পরিপাটি হয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে।' (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)
আল্লাহ সবাইকে সজীব ও সপ্রাণ নামাজ আদায়ের তাওফিক দিন। আমিন।