ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও "জামানত" প্রতারণা
ছেলেটি অনার্স পাস করে দুই বছর ধরে চাকরি খুঁজছিল। বাবা গ্রামে, মা প্রতি সপ্তাহে ফোনে জিজ্ঞেস করেন — "কিছু হলো, বাবা?"
তারপর ফেসবুকে বিজ্ঞাপনটা পেল। বেতন ২২ হাজার, অফিস ঢাকায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা যেকোনো বিষয়ে স্নাতক। ইন্টারভিউ হলো — দশ মিনিট, দুটো সাধারণ প্রশ্ন। তারপর বলা হলো, "আপনি সিলেক্টেড। শুধু কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী ১৫ হাজার টাকা সিকিউরিটি জমা দিতে হবে, তিন মাস পর বেতনের সাথে ফেরত।"
মা গয়না বন্ধক রাখলেন।
দুই সপ্তাহ পর অফিসে গিয়ে ছেলেটি দেখল, তালা ঝুলছে। ফোন বন্ধ। ফেসবুক পেজ ডিলিট।
সবচেয়ে কষ্টের কথাটা এই নয় যে টাকাটা গেল। সবচেয়ে কষ্টের কথা — ছেলেটি বাড়িতে বলতে পারেনি। সে আরও ছয় মাস ঢাকায় থেকে গেল, মাকে বলল অফিস ভালো চলছে।
লজ্জাই এই অপরাধটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ
অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ — কুরআনের স্পষ্ট নিষেধ
আল্লাহ বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।"
— সূরা নিসা, ৪:২৯
আয়াতে শর্ত দুটি — অন্যায় পথ নয়, এবং পারস্পরিক সম্মতি।
এখানে একটা কথা খেয়াল করার মতো: প্রতারক বলবে, "সে তো নিজেই টাকা দিয়েছে, জোর করিনি।" কিন্তু মিথ্যার ভিত্তিতে পাওয়া সম্মতি শরিয়তে সম্মতিই নয়। কেউ যদি জানত সে ভুয়া, তবে কখনোই দিত না। ফকিহগণ এটিকে বলেছেন সম্মতির ত্রুটি — অর্থাৎ প্রতারণা লেনদেনটিকে মূল থেকেই বাতিল করে দেয়।
আরও: "তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, এবং জেনেশুনে পাপ পথে মানুষের সম্পদের একটি অংশ খাওয়ার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না" (সূরা বাকারা, ২:১৮৮)।
"যে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়"
রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন বাজারে খাদ্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন ভেতরটা ভেজা। জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? বিক্রেতা বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। তিনি বললেন:
"তুমি এটা উপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পায়? যে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
— মুসলিম ১০২
সেদিনের ঘটনাটি ছিল কেবল ভেজা গম লুকানো নিয়ে। আজ যে ভুয়া অফিস সাজিয়ে, নকল নিয়োগপত্র ছাপিয়ে, ভুয়া ইন্টারভিউ নিয়ে একজন বেকার তরুণের শেষ সঞ্চয়টা নিয়ে নেওয়া হয় — সেটি কোন স্তরের ধোঁকা?
মুনাফিকের চিহ্ন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি — কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে (বুখারি ৩৩, মুসলিম ৫৯)।
এই প্রতারণায় তিনটিই একসাথে ঘটে। বিজ্ঞাপনটি মিথ্যা, "তিন মাস পর ফেরত দেব" ওয়াদাভঙ্গ, আর জামানতের টাকাটি ছিল আমানত — যা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিশ্বাসঘাতকের পতাকা
"কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য একটি পতাকা উঁচু করা হবে, আর বলা হবে — এটি অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার পতাকা।"
— বুখারি ৩১৮৮, মুসলিম ১৭৩৫
যে দুনিয়াতে নাম-ঠিকানা বদলে, পেজ মুছে, অফিস সরিয়ে গা ঢাকা দেয় — সেদিন তার নাম ঘোষণা করে দেওয়া হবে।
দেউলিয়ার হিসাব
রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা জানো দেউলিয়া কে? সাহাবিগণ বললেন, যার টাকা নেই। তিনি বললেন:
"আমার উম্মতের দেউলিয়া সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে — কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ খেয়েছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে... তখন তার নেকি একজন একজন করে তাদের দিয়ে দেওয়া হবে।"
— মুসলিম ২৫৮১
যে প্রতারক নিয়মিত নামাজ পড়ে অথচ পঞ্চাশজন বেকার তরুণের টাকা মেরে দিয়েছে — তার সেই নামাজগুলো সেদিন ওই পঞ্চাশজনের হাতে চলে যাবে।
মজলুমের দোয়া
"মজলুমের দোয়াকে ভয় করো, কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।"
— বুখারি ১৪৯৬, মুসলিম ১৯
যে মা গয়না বিক্রি করেছিলেন, তিনি হয়তো থানায় যাননি। কিন্তু তাঁর কান্না কোথাও পৌঁছেছে।
শৃঙ্খলের প্রতিটি হাত দায়ী
এটি বিশেষভাবে বলা দরকার, কারণ এই প্রতারণা একা করা যায় না।
সুদের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু গ্রহীতা-দাতা নয়, লেখক ও দুই সাক্ষীকেও অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন "তারা সবাই সমান" (মুসলিম ১৫৯৮)।
একই নীতিতে — যে ভুয়া অফিসে চেয়ার সাজিয়ে বসে থাকে, যে "ইন্টারভিউ" নেয়, যে ফোন ধরে, যে ভুয়া নিয়োগপত্র ছাপে, যে বিজ্ঞাপন বুস্ট করে, যে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বিকাশ নম্বর ভাড়া দেয় — এরা কেউই "শুধু চাকরি করছি" বলে দায় এড়াতে পারে না।
আর: "সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে নয়" (সূরা মায়েদা, ৫:২)।
আর একটি দিক যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই
শ্রমিকের হক নিয়ে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।
আল্লাহ কুদসি হাদিসে বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ তিনি নিজে হবেন — তাদের একজন হলো, "যে কোনো ব্যক্তিকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করল, তার কাছ থেকে পুরো কাজ আদায় করল, অথচ তার মজুরি দিল না" (বুখারি ২২২৭)।
এবং: "শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও" (ইবনে মাজাহ ২৪৪৩)।
এদেশে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে যারা টাকা নেয় না, কিন্তু "ট্রেনিং পিরিয়ড" বা "প্রবেশন" বলে তিন মাস বিনা বেতনে কাজ করিয়ে বিদায় করে দেয়। কৌশলটা আলাদা, অপরাধটা একই — বরং এখানে শ্রমটাও চুরি হচ্ছে।
একটি সান্ত্বনার কথা
যিনি প্রতারিত হয়েছেন, তাঁর জন্য: "যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ নষ্ট করার নিয়তে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন" (বুখারি ২৩৮৭)। আপনার হক আল্লাহর কাছে লেখা আছে — দুনিয়ায় ফেরত না পেলেও।
আর মনে রাখবেন, প্রতারিত হওয়া বোকামির প্রমাণ নয়। এরা পেশাদার, সংগঠিত, এবং তাদের একমাত্র কাজই মানুষকে বিশ্বাস করানো। রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত বলেছেন — "মুমিন সরল ও ভদ্র, আর পাপাচারী ধূর্ত ও নীচ" (আবু দাউদ ৪৭৯০)। সরলতা দোষ নয়, ধূর্ততাই অপরাধ।
তবে সাথে এটাও সত্য — "মুমিন এক গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না" (বুখারি ৬১৩৩, মুসলিম ২৯৯৮)। সতর্ক হওয়া ঈমানেরই দাবি।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ
এই প্রতারণা কেন এদেশে এত সহজে চলে
১. বেকারত্বের চাপ। এদেশে লাখো তরুণ বছরের পর বছর চাকরি খুঁজছেন। যে মানুষটি দুই বছর ধরে হতাশ, তার সামনে "নিশ্চিত চাকরি" এলে যাচাই করার মানসিক শক্তি থাকে না। প্রতারকরা টাকা বিক্রি করে না, তারা আশা বিক্রি করে।
২. পরিবারের প্রত্যাশা। গ্রাম থেকে পড়তে আসা ছেলেটির ওপর পুরো পরিবারের চোখ। "কিছু একটা করতে হবে" — এই চাপই তাড়াহুড়ো করায়।
৩. ঘুষে চাকরি হওয়াটা আমরা স্বাভাবিক মনে করি। এটাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যে সমাজে "টাকা ছাড়া চাকরি হয় না" ধারণাটি বদ্ধমূল, সেখানে টাকা চাওয়াটা সন্দেহজনক মনে হয় না — বরং স্বাভাবিক মনে হয়। প্রতারকরা ঠিক এই বিশ্বাসটাকেই পুঁজি করে।
৪. লজ্জা। প্রতারিত হয়ে বেশিরভাগ মানুষ চুপ থাকেন — পরিবার জানবে, লোকে হাসবে। এই নীরবতাই পরের শিকারকে অরক্ষিত রাখে।
৫. অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়া সস্তা। কয়েকশো টাকায় হাজার মানুষের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছে যায়।
যেসব রূপে এটি আসে
"সিকিউরিটি মানি" / "জামানত" / "রিফান্ডেবল ডিপোজিট" — সবচেয়ে সাধারণ
রেজিস্ট্রেশন ফি, প্রসেসিং ফি, ফাইল চার্জ, আইডি কার্ড ফি
ইউনিফর্ম, ট্রেনিং কিট বা মালামাল কিনতে বাধ্য করা
মেডিকেল টেস্টের নামে নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়া
"টাকা লাগবে না, শুধু ২ জন লোক আনতে হবে" — এটি ছদ্মবেশী এমএলএম
"বাসায় বসে ডেটা এন্ট্রি / টাইপিং, দিনে ১৫০০ টাকা" — প্রায় সবসময়ই ভুয়া
ইউটিউব ভিডিও দেখে বা লাইক দিয়ে আয় — প্রথমে ছোট অঙ্ক দেয় বিশ্বাস অর্জনের জন্য, তারপর বড় "ইনভেস্ট" চায়
বিদেশে চাকরির ভুয়া অফার — সবচেয়ে বড় ক্ষতি এখানেই, কারণ অঙ্ক লাখ টাকায়
ভুয়া নিয়োগ পরীক্ষা ও "প্রশ্ন পাইয়ে দেওয়ার" প্রতিশ্রুতি — এখানে ভুক্তভোগীও অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তাই অভিযোগও করতে পারেন না
বিপদের লক্ষণ — যেগুলো দেখলেই থামুন
🚩 চাকরির জন্য কোনো টাকা চাওয়া হচ্ছে। যেকোনো নামে — এটাই সবচেয়ে বড় সংকেত। বৈধ প্রতিষ্ঠান প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেয় না।
🚩 যোগ্যতার শর্ত অস্বাভাবিক সহজ, অথচ বেতন আকর্ষণীয়
🚩 ইন্টারভিউ ৫-১০ মিনিটে শেষ, কাজ নিয়ে কোনো গভীর প্রশ্ন নেই, এবং সঙ্গে সঙ্গেই "সিলেক্টেড"
🚩 তাড়াহুড়ো — "আজকের মধ্যে না দিলে পোস্ট চলে যাবে"
🚩 অফিসের ঠিকানা অস্পষ্ট, ল্যান্ডলাইন নেই, শুধু মোবাইল নম্বর
🚩 কোম্পানির ওয়েবসাইট নেই, বা থাকলেও কয়েক মাস আগের তৈরি, ঠিকানা-ফোন ভুয়া
🚩 টাকা কোম্পানির অ্যাকাউন্টে নয়, ব্যক্তির বিকাশ/নগদ নম্বরে চাওয়া হচ্ছে
🚩 রসিদ দিতে চায় না, বা রসিদে প্রতিষ্ঠানের নাম-সিল নেই
🚩 নিয়োগপত্রে বেতন কাঠামো, পদবি বা শর্ত স্পষ্ট নেই
🚩 অফিসে গিয়ে দেখলেন — চেয়ার-টেবিল আছে, কাজ নেই, বা শুধু নতুন প্রার্থীদের ভিড়
ক্ষতিটা টাকার চেয়েও বড়
ধার ও সুদের চক্র — অনেকে ধার করে জামানত দেন, তারপর সেই ঋণ শোধ করতে আরেক ঋণ
পরিবারের সম্পদ — গয়না, গরু, জমি বিক্রি
মানসিক অবস্থা — অপরাধবোধ, আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাওয়া, পরিবারের মুখোমুখি হতে না পারা
সময় — তিন-চার মাস নষ্ট, যেটা প্রকৃত চাকরির চেষ্টায় লাগতে পারত
বিশ্বাস নষ্ট হওয়া — এরপর প্রকৃত সুযোগ এলেও মানুষ সন্দেহ করে
করণীয়
চাকরিপ্রার্থীর জন্য
১. একটাই নিয়ম মনে রাখুন — চাকরির জন্য টাকা দেবেন না।
জামানত, রেজিস্ট্রেশন, প্রসেসিং, ট্রেনিং — কোনো নামেই নয়। এই একটি নিয়ম মানলে এদেশের অধিকাংশ চাকরি-প্রতারণা থেকে বাঁচা যায়।
২. প্রতিষ্ঠান যাচাই করুন।
কোম্পানির নাম গুগলে সার্চ করুন, সাথে "প্রতারণা" বা "scam" শব্দটি যোগ করে দেখুন
ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না জিজ্ঞেস করুন; নিবন্ধিত কোম্পানি হলে RJSC-এর ওয়েবসাইটে নাম যাচাই করা যায়
ওয়েবসাইট, লিংকডইন, পুরনো কর্মীদের খোঁজ নিন
অফিসে দিনের বেলা নিজে যান — চেয়ার-টেবিল আছে কিন্তু কাজ নেই, এমন অফিস চেনা যায়
৩. কখনো একা ইন্টারভিউতে যাবেন না — বিশেষত অচেনা ঠিকানায়, বিশেষত নারী প্রার্থীরা। কাউকে সাথে নিন, অন্তত ঠিকানাটা কাউকে জানিয়ে যান।
৪. পরিবারের বড় কারও সাথে পরামর্শ করুন টাকা দেওয়ার আগে। তাড়াহুড়োই প্রতারকের প্রধান অস্ত্র — এক রাত সময় নিলেই বেশিরভাগ ফাঁদ ভেঙে যায়।
৫. সবকিছু লিখিত রাখুন। যদি কোনো কারণে টাকা দিতেই হয় (দিতে নিষেধ করছি), তবে প্রতিষ্ঠানের প্যাডে সিলসহ রসিদ নিন, এবং কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দিন, কারও ব্যক্তিগত নম্বরে নয়।
৬. নিয়োগপত্র ভালো করে পড়ুন — পদবি, বেতন, শর্ত, স্বাক্ষরকারীর নাম ও পদ স্পষ্ট আছে কি না।
৭. বিদেশের চাকরির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা। রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স BMET/প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়-এর তালিকায় যাচাই করুন, চাকরির চুক্তিপত্র হাতে নিন, এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল-এর মাধ্যমে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না দেখুন।
(সরকারি সেবা ও যাচাইয়ের পদ্ধতি সময়ে সময়ে বদলায় — বর্তমান তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নিন।)
৮. দালালকে "সুবিধা" ভাববেন না। যিনি নিয়ম এড়িয়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি নিয়ম মেনেও কিছু করতে পারেন না — কারণ তাঁর ব্যবসাটাই নিয়ম না থাকার ওপর দাঁড়ানো।
প্রতারিত হয়ে গেলে
১. সময়ই সবচেয়ে জরুরি। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে টাকা আটকানোর সম্ভাবনা থাকে।
২. সব প্রমাণ সংরক্ষণ করুন — বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনশট, চ্যাট, ট্রানজেকশন আইডি, রসিদ, নিয়োগপত্র, ফোন নম্বর, অফিসের ঠিকানা ও ছবি।
৩. থানায় জিডি বা মামলা করুন। প্রতারণা দণ্ডবিধিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অনলাইনে হলে সাইবার ইউনিটেও জানান।
৪. মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠিয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সেবার হেল্পলাইনে সঙ্গে সঙ্গে জানান (বিকাশ ১৬২৪৭, নগদ ১৬১৬৭)। জরুরি অবস্থায় ৯৯৯।
৫. একা ভুক্তভোগী কমই থাকেন। অন্য প্রার্থীদের খুঁজে বের করুন — যৌথ অভিযোগ অনেক বেশি কার্যকর, এবং একা লজ্জাটাও তখন থাকে না।
৬. চুপ থাকবেন না। আপনার নীরবতাই পরের ছেলেটিকে একই ফাঁদে ফেলবে। ভুক্তভোগীর নাম না দিয়েও এলাকায়, ক্যাম্পাসে ও অনলাইনে সতর্ক করা যায়।
৭. আর যদি ভেতরে ভেঙে পড়েন — এটা স্বাভাবিক, এবং এটা আপনার ব্যর্থতা নয়। পরিবারের কাউকে বা বিশ্বস্ত বন্ধুকে জানান। টাকা আবার আসবে, মানুষটা আসবে না।
পরিবার ও সমাজের জন্য
১. সন্তান প্রতারিত হলে প্রথম কথাটা যেন "তোকে আগেই বলেছিলাম" না হয়। এই এক বাক্যেই সে ভবিষ্যতে আর কিছু বলবে না।
২. সন্তানের ওপর "কিছু একটা করো" চাপ কমান। তাড়াহুড়োই ফাঁদে ফেলে।
৩. পরিচিত কেউ চাকরির নামে টাকা চাইলে অন্যদের সতর্ক করুন — নীরবতা প্রতারককে সুরক্ষা দেয়।
৪. "টাকা দিয়ে চাকরি" সংস্কৃতিকে বৈধতা দেবেন না। যিনি নিজে ঘুষ দিয়ে চাকরি নেন, তিনি এই বাজারটাকেই টিকিয়ে রাখেন — এবং সেই একই বাজারে তাঁর সন্তান প্রতারিত হয়।
৫. মসজিদ, ক্যাম্পাস ও এলাকার গ্রুপে সতর্কতা ছড়ান। জুমার আগে দুই মিনিটের একটা ঘোষণা একটা পাড়ার সব তরুণকে বাঁচাতে পারে।
নিয়োগকর্তাদের প্রতি
যাঁরা প্রতিষ্ঠান চালান, তাঁদের জন্য কয়েকটি কথা — কারণ এই সংকটের একটা অংশ আপনাদের হাতেও:
প্রার্থীর কাছ থেকে কোনো অবস্থাতেই টাকা নেবেন না, "রিফান্ডেবল" বলেও নয়
বিনা বেতনে "ট্রায়াল" বা দীর্ঘ "ট্রেনিং পিরিয়ড" নয় — কাজ করালে মজুরি দিতে হবে, এটা শরিয়ত ও আইন দুটোরই দাবি
প্রত্যাখ্যাত প্রার্থীকেও জানিয়ে দিন — মাসের পর মাস অপেক্ষা করানো এক ধরনের নিষ্ঠুরতা
বিজ্ঞাপনে বেতন ও শর্ত স্পষ্ট লিখুন — অস্পষ্টতাই প্রতারকদের আড়াল দেয়
মনে রাখবেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নবুয়তের আগেই মক্কায় পরিচিত ছিলেন আল-আমিন নামে। ব্যবসায় সততাই ছিল তাঁর পরিচয়।
শেষ কথা
একজন বেকার তরুণের কাছে চাকরির খবরটা শুধু আয়ের খবর নয়। ওটা তার বাবার সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর খবর, মাকে ফোনে "হ্যাঁ, হয়ে গেছে" বলার খবর।
যে মানুষটি এই আশাটাকে টাকা বানায়, সে শুধু চুরি করে না — সে একটা পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তটাকে ব্যবহার করে।
আর মনে রাখা দরকার, এই টাকা কখনোই বরকতময় হয় না। "আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না" (মুসলিম ১০১৫)। যে ঘরে হারামের টাকা ঢোকে, সে ঘরের দোয়াও আটকে যায়।
আর যাঁরা চাকরি খুঁজছেন — একটি বাক্য মুখস্থ করে ফেলুন: "চাকরির জন্য টাকা চাইলে সেটা চাকরি নয়, ফাঁদ।"
দেরিতে হলেও হালাল রিজিক আসবে। "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি" (সূরা তালাক, ৬৫:২-৩)।
আপনার পরিচিত কেউ কি চাকরির নামে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন? কমেন্টে ঘটনাটা লিখুন — নাম ছাড়াই। একজনের অভিজ্ঞতা দশজনকে বাঁচাতে পারে।
আর এই পোস্টটা শেয়ার করুন সেই তরুণের কাছে, যিনি এখন চাকরি খুঁজছেন।
#ভুয়াচাকরি #জামানতপ্রতারণা #চাকরিরনামেপ্রতারণা #বেকারত্ব #সামাজিকসচেতনতা