তারুণ্যের নীরব ক্ষয় ও আত্মরক্ষার পথ
তারুণ্য, জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময়, স্বপ্নময় ও সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে মানুষ নিজের পরিচয় খোঁজে, স্বপ্ন গড়ে, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের অর্থ বুঝতে শেখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই কোমল সময়টিই অনেকের জীবনে বিষাক্ত সম্পর্কের ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সম্পর্ক, যা হওয়ার কথা ছিল আশ্রয় ও প্রশান্তির উত্স-সেটিই কখনো কখনো হয়ে ওঠে কষ্ট, ক্লান্তি ও আত্মক্ষয়ের কারণ।
অনেক সম্পর্ক শুরু হয় স্নেহ, আন্তরিকতা ও উষ্ণতা দিয়ে; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে যায়-ভালোবাসার জায়গায় আসে অবজ্ঞা, হাসির বদলে দখল নেয় উদ্বেগ, আর সাহচর্য রূপ নেয় শত্রুতায়। এভাবেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে ভেতর থেকে নিঃশেষ হতে থাকে।
বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা, যারা স্বভাবতই বেশি সংবেদনশীল, তারা এই ধরনের সম্পর্কের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর সেই দিন জালিম ব্যক্তি আফসোসে নিজের হাত কামড়াবে এবং বলবে, ‘হায়! যদি আমি রাসুলের পথ অনুসরণ করতাম! হায় আমার আফসোস! যদি আমি অমুককে বন্ধু না বানাতাম! সে তো আমাকে পথভ্রষ্ট করেছিল, যখন আমার কাছে উপদেশ পৌঁছেছিল।’ আর শয়তান তো মানুষের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতক।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২৭-২৯
বিষাক্ত সম্পর্কের লক্ষণগুলো অনেক সময় সূক্ষ্ম হলেও প্রভাব গভীর। এমন সম্পর্কে একজনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে উপহাস করা হয়, তার ছোট অর্জনগুলোকে তুচ্ছ করা হয়, তার আত্মমর্যাদাকে ক্রমাগত খাটো করা হয়। কখনো তাকে এমনভাবে অনুভব করানো হয় যেন তার মূল্য শুধু সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অনেক ক্ষেত্রে এই সম্পর্কগুলো আবেগ ও আর্থিক বিষয়টি একজন মানুষকে নিঃশেষ করে ফেলে, সে দিয়ে যায়, কিন্তু ফিরে পায় না কিছুই। উপরন্তু, তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অন্যের সমস্যা ও প্রত্যাশার বোঝা, আর নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে করতে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা (সত্কর্মশীলরা) ছাড়া।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৬৭)
এ ধরনের সম্পর্কের প্রভাব শুধু বাহ্যিক নয়; এটি মানুষের ভেতরটাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অকারণে উদ্বেগ, মনোযোগের অভাব, উদ্যম ও স্বপ্ন দেখার শক্তি কমে যাওয়া, ঘুমের ব্যাঘাত, মেজাজের অস্থিরতা, এসব হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। এভাবে একসময় মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, সামাজিকতা কমে যায়, আর একাকিত্ব তাকে গ্রাস করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষকে দুর্বল করেই সৃষ্টি করা হয়েছে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৮)
এই দুর্বলতা কোনো ত্রুটি নয়; বরং এটি মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, যা তাকে সমর্থন, সহানুভূতি ও সঠিক সঙ্গের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তাই ইসলাম সঙ্গ নির্বাচনের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কিয়ামতের দিন সঙ্গীর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, সে সম্পর্কে কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে, সেদিন অনেকেই আফসোস করবে ভুল সঙ্গ বেছে নেওয়ার জন্য।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘একজন ভালো সঙ্গী ও একজন মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ হলো-কস্তুরী বহনকারী ব্যক্তি এবং কামারের হাপর ফুঁকনেওয়ালা ব্যক্তির মতো।’ (বুখারি, হাদিস: ২১০১)
অর্থ্যাত্ ভালো সঙ্গী সেই ব্যক্তির মতো, যার কাছ থেকে সুগন্ধ পাওয়া যায়; আর খারাপ সঙ্গী সেই ব্যক্তির মতো, যার সংস্পর্শে এসে মানুষ অস্বস্তিতে পড়ে।
তাই একজন সচেতন তরুণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মূল্য বুঝতে শেখা। প্রতিটি সম্পর্কের পর নিজেকে জিজ্ঞেস করা, এই সম্পর্ক কি আমাকে শান্তি দিচ্ছে, নাকি আমাকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে? নিজের জন্য সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা এবং তা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি ধৈর্যসহকারে তাদের সঙ্গেই থাকো, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকে।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ২৮)
অতএব, ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের নামে কোনো ক্ষতিকর আচরণ মেনে নেওয়া কখনোই উচিত নয়। বরং এমন মানুষের সঙ্গ বেছে নিতে হবে, যারা ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে, ইতিবাচকতা ছড়ায় এবং মহান স্রষ্টার স্মরণ করিয়ে দেয়। কেননা, জীবনের প্রতিটি মানুষ আমাদের জন্য নয়। যে সম্পর্ক আমাদের গড়ে তোলার বদলে ভেঙে দেয়, শক্তি দেওয়ার বদলে নিঃশেষ করে, তা যতই সুন্দর দেখাক না কেন, তা সুস্থসম্পর্ক নয়। নিজের মর্যাদা, মানসিক শান্তি ও আত্মিক বিকাশের জন্য কখনো কখনো দূরে সরে যাওয়াই সবচেয়ে সাহসী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।