স্মৃতি ও স্মরণে সিরিয়ান হজ কাফেলা
সিরিয়ার হজ কাফেলা দামেশকের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ইতিহাসেরই সাক্ষ্য প্রদান করে। ইতিহাসের পরম্পরায় সোনালি সময়ের স্মৃতি হিসেবে তা এখনো টিকে আছে, যা দামেশকবাসীর ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং হাজিদের প্রবেশদ্বার হিসেবে শহরের ঐতিহাসিক ভূমিকারও প্রতিফলন। ইতিহাস গবেষক নাজলা আল খাদরার মতে, ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে সিরিয়া থেকে প্রথম হজ কাফেলা মক্কা-মদিনায় গমন করেছিল। সে কাফেলায় তিন শ হাজি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
ধীরে ধীরে দামেশক মুসলিম বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত হাজিদের মিলনস্থলে পরিণত হয়। বিশেষত উমাইয়া আমলে, যখন দামেশক ইসলামী খেলাফতের রাজধানী ছিল। এই আফ্রিকা ও এশিয়ার হাজিরা দামেশকে যাত্রা বিরতি দিতেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় পাথেয় সংগ্রহ করতেন। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, উমাইয়া যুগে পারস্য, মধ্যএশিয়া, ইরাক, বলকান ও ভারতীয় উপমহাদেশের হাজিরা দামেশকে এসে থামতেন। হজযাত্রীরা হজের কয়েক মাস আগ থেকে এখানে সমবেত হতে শুরু করতেন। তাদের আগমন কেন্দ্র করে দামেশকের বাজার ও রাস্তাঘাটগুলো জেগে উঠত। দামেশকের সাধারণ মানুষ হাজিদের সেবা ও সহযোগিতা করতেন, আবার তাদের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে অর্থও উপার্জন করতেন।
সিরিয়ান হজ কাফেলার একটি স্মরণীয় দিক ছিল সিরিয়ান মাহমাল। মাহমাল হলো অত্যন্ত সুসজ্জিত একটি পালকি, যা উটের পিঠে বহন করা হতো। মাহমালে সাধারণ কাবাঘরের গিলাফ, মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর জন্য উপহার পাঠানো হতো। পালকির ভেতরের উপহার সামগ্রি ঢেকে রাখা হতো সুসজ্জিত পর্দা দ্বারা। পর্দায় কোরআনের আয়াত ও শাসকদের নাম অঙ্কিত থাকত। ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান জহিরুদ্দিন বাইবার্স মাহমালের সূচনা করেন। মাহমালের যাত্রা শুরু হতো কায়রো থেকে তা সিরিয়ার দামেশক হয়ে হিজাজের পথে এগিয়ে যেত। মাহমাল দামেশকে পৌঁছালে স্থানীয় মুসলিমরা তাকে শুভেচ্ছা বার্তা, মোমবাতি, সুগন্ধি, ধর্মীয় সংগীতের মাধ্যমে স্বাগত জানাত। মাহমালের আগমন উপলক্ষে বড় জমায়েত হতো। এরপর তা দামেশক শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো প্রদক্ষিণ করত এবং দামেশকের দক্ষিণ দিক দিয়ে বিদায় গ্রহণ করত।
প্রাচীনকালে হজযাত্রা ছিল দীর্ঘ ও কষ্টকর। দামেশক থেকে মক্কায় পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন সময় প্রয়োজন হতো। কাফেলা মরুভূমির প্রতিকূল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করত। তাদের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রহরী ও সেবাকর্মী নিযুক্ত করা হতো। হাজিরা যখন হজ শেষে ফিরে আসতেন তখনও দামেশকজুড়ে উত্সবের আমেজ বিরাজ করত। আনুষ্ঠানিকভাবে হাজিদের স্বাগত জানানো হতো। সমবেত মানুষ হজ কাফেলাকে সঙ্গীত ও উপহারের মাধ্যমে অভিনন্দন জানাত। এই শহর সাজানো হতো। হাজিরা সমবেত মানুষের জন্য হেজাজ থেকে ঐতিহ্যবাহী উপহার নিয়ে আসতেন।
আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ছোঁয়ায় হজযাত্রার চিত্র পাল্টে যায়। হজযাত্রার আধুনিকায়নের সূচনা হয়েছিল উসমানীয় আমলে তৈরি হিজাজ রেলওয়ের মাধ্যমে। বিংশ শতাব্দীতে তা উন্নত হতে হতে উড়োজাহাজে রূপান্তরিত হয়েছে। রূপান্তর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেলেও দামেশকের মানুষ ঐতিহাসিক হজ কাফেলা ও হাজিদের সমাগমের স্মৃতি কখনো ভুলে যায়নি। তারা নানাভাবেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্মরণ করে থাকে।