রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

সাক্ষীকে উদ্দেশ্য করে পলক বললেন, ‘ভয় পাইছে’

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 11 অক্টোবর 2026, 11:19 দুপুর • 4 বার পঠিত
সাক্ষীকে উদ্দেশ্য করে পলক বললেন, ‘ভয় পাইছে’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) উপপরিচালক মাহদী আহমেদ। সাক্ষ্য দেওয়ার একপর্যায়ে পলক তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে।

’ এ সময় ট্রাইব্যুনাল পলককে কথা কম বলতে বলেন।রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মাহদী আহমেদ জবানবন্দি দেন।

মামলার আসামি সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক। পলক এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

পলকের পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী লিটন আহমেদ। জয় পলাতক থাকায় তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।সাক্ষ্যের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি

জবানবন্দির একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ আসে। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে এনটিএমসির তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে থ্রি-জি ও ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।

এ বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে আপত্তি জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টি আলোচনার প্রসঙ্গে এলেও মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। তাই ওই অংশ বাদ দেওয়ার আবেদন জানান তাঁরা। সাক্ষীও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে সম্মতি দেন।

এ সময় সাক্ষীর উদ্দেশে পলক বলেন, ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে।’ তখন ট্রাইব্যুনাল তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘একটু বসতে পারেন। কথা কম বলেন দয়া করে।’

পরে অনুমতি নিয়ে পলক বলেন, ‘আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি চাই। প্রসিকিউটর মহোদয় সাক্ষীকে প্রশ্ন করে জবানবন্দি নিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে এটা বাদ দিতে হলে হোস্টাইল করতে হবে।’

এ পর্যায়ে সাক্ষী মাহদী আহমেদ বলেন, সারাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এনটিএমসির নির্দেশনায় বন্ধ করা হয়েছিল—এমন বক্তব্য আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। তবে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে তিনি জানেন না। ২৮ জুলাইয়ের বৈঠকের মাধ্যমে ইন্টারনেট চালুর বিষয়টি জানতে পেরেছেন বলে জানান তিনি।

জয় ও পলকের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জয় ও পলকের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলোতে আন্দোলন দমনে উসকানি, ইন্টারনেট ও যোগাযোগসেবা বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগ; আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সেগুলোর বিচার চলছে।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়ের নির্দেশনা ও অনুমোদনে পলক ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনটি পোস্ট দেন। এসব পোস্টের ভাষা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে উসকানি সৃষ্টি করেছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। এর পর ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও জয়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে পলক আন্দোলন দমনে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমানো এবং পরে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার উদ্যোগ নেন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এর ফলে আন্দোলনকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং তাঁদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও দমন অভিযান চালানো সহজ হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তে জয়ের ভূমিকা ছিল এবং পলক তা বাস্তবায়ন করেন। এ বিষয়ে ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই সালমান এফ রহমানের সঙ্গে পলকের কথোপকথনের প্রসঙ্গও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন অ্যাপ বন্ধ রাখার তালিকা এবং প্রধানমন্ত্রীর সংকেত অনুযায়ী সেগুলো চালু বা বন্ধ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ উল্লেখ করেছে।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই সন্ধ্যা থেকে ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ বাস্তবায়নে বিটিআরসি ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পদক্ষেপ নেন। পরে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেবা বন্ধ করা হয়। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা আড়াল করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও ও হাতিরঝিল এলাকায় গঙ্গাচরণ রাজবংশী ও রাসেল মিয়াসহ ২৬ জনকে গুলি করে হত্যা এবং বহু মানুষকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় আসামিদের নির্দেশ, জ্ঞাতসার বা সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন রাজধানীর উত্তরা এলাকায় শিশু জাবির ইব্রাহিমসহ ৩২ জনকে গুলি করে হত্যা এবং বহু মানুষকে আহত করার ঘটনায় জয় ও পলকের নির্দেশ, জ্ঞাতসার বা সহায়তার ভূমিকা ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি প্রতিহত করা এবং আন্দোলন দমনের কর্মকাণ্ড আড়াল করার উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়েছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সারাদেশে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এসব ঘটনায় জয় ও পলকের দায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি এ মামলায় জয় ও পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়।